এটা আবার কী ব্যবস্থা? ফেরা হবে কী করে? চমক ভাঙল পেছন থেকে গরিলা বপুর সুমধুর কণ্ঠস্বরে, মাই ডিয়ার গজানন, হাঁ করে তাকিয়ে না থেকে চলে আসুন।
পেছন ফিরল গজানন। রামভেটকি টিলার কাছে পৌঁছে গেছে। এরকম উইয়ের ঢিপির মতো টিলা অজস্র রয়েছে এ অঞ্চলে। বিশেষ এই টিলাটির সঙ্গে রামভেটকির এত প্রণয় কেন বুঝল না।
তবুও পা দুটোকে টেবিল ফ্যানের মতো বনবন করে ঘুরিয়ে পৌঁছে গেল অতীতের ব্ল্যাক কম্যান্ডোর কাছে।
রামভেটকি ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। গজানন জানে ঠিক ওইরকম স্বর্গীয় হাসি হাসতে-হাসতে রামভেটকি যে-কোনও মানুষের টুটি কেটে দিতে পারে–চক্ষের নিমেষে, অথবা জামাকাপড়ের অদৃশ্য কোনও অঞ্চল থেকে ফস করে আগ্নেয়াস্ত্র টেনে বের করে বেধড়ক গুলি চালিয়ে যেতে পারে নির্ভুল নিশানায়। রামভেটকি মূর্তিমান আতঙ্ক অকারণে হয়নি।
এহেন জীবন্ত বিভীষিকাটি মিঠে হেসে বুক পকেট থেকে একটা সরু ডটপেন বের করে হেঁট হল টিলার ওপর। এক হাতে খানকয়েক নুড়ি আর কিছু মাটি সরাতেই চোখে পড়ল এক ইঞ্চি বর্গক্ষেত্রের একটা ইস্পাতের পাত। ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা ফুটো।
ডটপেনের যে জায়গা দিয়ে লেখা হয়, সেই জায়গাটা পেঁচিয়ে খুলে নিল রামভেটকি। কালির ছোট্ট টিউবটাও বেরিয়ে এল সেইসঙ্গে। এবার ডটপেন টর্চের মতো ফোকাস করল ইস্পাতের পাতটার ওপর। পেছনের ক্লিপটা ঘুরোতেই সরু রশ্মি রেখা গিয়ে পড়ল প্লেটের মাঝখানকার ফুটোয়। ক্লিপ আরও ঘোরাতেই সরু হয়ে এল রশ্মি–শেষপর্যন্ত বিন্দুর আকারে স্পর্শ করল ছোট্ট ফুটোটাকে।
সঙ্গে-সঙ্গে ভোজবাজি দেখা গেল চোখের সামনে। বেলেঘাটার মস্তান গজানন এরকম ম্যাজিক জীবনে দেখেনি সিনেমা টিনেমায় দেখার কথাটা ধর্তব্যের মধ্যে নয় বলে বাদ দেওয়া গেল।
বাঁ-দিকের কাকড় ছাওয়া ভূতল নিঃশব্দে সরে গেল পাশের দিকে। চৌকোনা ফোকর বেরিয়ে পড়েছে। সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে।
চোখ ছানাবড়া করল না গজানন। না করার জন্যে ট্রেনিং নিতে হয়েছে বিস্তর। শুধু বললে সহজ গলায়–যে ফুটোটায় রে ফেললেন, ওটা তো বৃষ্টির জলে নষ্ট হয়েও যেতে পারে।
ডটপেনের রিফিল লাগিয়ে নিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বললে রামভেটকি, মাই ডিয়ার গজানন, ওই গুপ্ত রহস্যটা আপনাকেও দেখাইনি।
মানে?
ফুটোর মুখটা ঢাকা ছিল। পায়ের চাপে অনেক আগেই ঢাকনা সরিয়েছি।
ম্প্রিং টিপে?
হ্যাঁ। কিন্তু স্প্রিং লাগানো বোতামটা কোথায় আছে, তা জানতে চাইবেন না। দেখলেন না হেলিকপ্টারটাকেও সরিয়ে দিলাম। আমাদের এই গোপন আস্তানার খবর যত কম লোকে জানে, ততই ভালো। আসুন! বলে সিঁড়িতে পা দিলে রামভেটকি।
একটু পরেই কবন্ধ দেহ দেখে শিউরে উঠল গজানন।
কলাইকুণ্ডার এই তেপান্তরের মাঠের পাতালে এরকম এলাহি কাণ্ডকারখানা কে কবে দেখেছে? গজানন আবার পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো?
দু-হাতের দুই মুঠো দিয়ে আঁকড়া চুল খামচে ধরে মাথাটাকে বেশ করে কঁকিয়ে নিল জিরো জিরো গজানন। স্পেশাল কম্যান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার সময়ে সুবেদার ছাতু সিং ওকে পইপই করে বলেছিল, বাপুহে, চুল কেটে ছোট করে নাও। কেউ যেন খামচে ধরে তুলে আছাড় না মারতে পারে।
ভীষণ রেগে গেছিল গজানন, ধরলেই হল? আমার চুল ধরবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের আছাড় খাওয়া দেখব? ধরুন না আপনি..চেষ্টা করে দেখুন।
গজাননের কটমটে চোখ আর অসুরমার্কা মুন্ডু দেখে সুবেদারের আর সে ইচ্ছে হয়নি। শুধু বলেছিল, বুঝবে ঠ্যালা।
চুল কাটব না।
হাজার হোক বাঙালি মস্তান। স্যামসনের চুলের মধ্যেই শক্তি নিহিত ছিল। বাঙালি মস্তানরাও তা বিশ্বাস করে। চুল কাটতে দেবে কেন? চুলের বাহারেই যে আসল বল।
তাই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যেতেই চুল ধরে মাথাটাকে কঁকিয়ে নিল গজানন। অন্য কারও ঘিলু হলে নিশ্চয় নড়ে যেত, কিন্তু জিরো জিরোর ঘিলু যে-সে ঘিলু নয়–নিরেট। তাই অমন প্রচণ্ড আঁকুনিতেও স্থানচ্যুত হল না।
কী দেখল গজানন? লম্বা করিডর সিঁড়ির একদম নিচের ধাপ থেকে শুরু হয়েছে। শেষ দেখা যাচ্ছে না–কেননা আলোগুলো সব নিভানো রয়েছে। সিঁড়ির মাথা থেকে দেখেছিল নিরন্ধ্র অন্ধকার বিরাজ করছে পায়ের তলায়। শেষ ধাপে পা দিতেই আপনা হতেই দপ করে জ্বলে উঠেছিল গোপন আলো–ঠিক পনেরো ফুট পর্যন্ত করিডর আলোকিত হয়েছিল সেই আলোর আভায়। রামভেটকি হনহন করে এগিয়েছে, যতই এগিয়েছে, ততই সামনের করিডর আলোকিত হয়েছে এবং পেছনের ফেলে আসা করিডর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে।
তাজ্জব হলেও চোখেমুখে তা প্রকাশ করেনি গজানন। সবই অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অতি সাবধানতা। দৈবাৎ যদি পাতাল ঘাঁটিতে কেউ প্রবেশ করে, অন্ধকারে নিশ্চয় টর্চ ফেলবে…
ফেলেওছিল গজানন। সিঁড়ির মাথা থেকেই অন্ধকারকে টিপ করে পেনসিল টর্চ ফোকাস করেছিল।
সঙ্গে-সঙ্গে অভূতপূর্ব কাণ্ড। সিঁড়িটা আচমকা লাল আলোয় ছেয়ে গেছিল। দু-পাশের দেওয়ালের গায়ে সারি-সারি ফোকর আবির্ভূত হয়েছিল এবং প্রত্যেকটা ফোকর দিয়ে একটা করে কালচে ইস্পাতের আগুন বর্ষণ করার নল বেরিয়ে এসেছিল। সবকটা নল ফেরানো টর্চ যে ধরে রয়েছে তার দিকে। অর্থাৎ গজাননের দিকে।
মেঘমন্ত্র চ্যালেঞ্জ শোনা গেছিল স্পিকারে–পাতাল পথ গমগম করে উঠেছিল সেই আওয়াজে, হু ইজ দেয়ার?
