(চন্দ্রকেতুর প্রস্থান। ঘোড়ার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে…ফ্যালফ্যাল করে নাগরাজন– দাঁড়ান মিঃ সরকার, ছুটবেন না–আমি আসছি।)
.
সপ্তদশ দৃশ্য
(মঞ্চ অন্ধকার। মোটরের শব্দ। মোটর থামার শব্দ। ধাবমান দরজায় দুমদাম ধাক্কা দেওয়ার শব্দ।)
মনীশ-নেপথ্যে) দরজা খোলো শিগগির দরজা খোলো। কে আছ ভেতরে। যেও না গণেশের কাছে। যেও না, তুমি যেই হও। গণেশের দিকে যেও না। দোহাই তোমার! Inspector, দরজা ভেঙে ফেলুন সর্বনাশ হয়ে যাবে এখুনি।
(দরজা ভেঙে ফেলার শব্দ ছন্দার অস্ফুট আর্তনাদ…মনীশের চিৎকার ছন্দা-)।
(মঞ্চ আলোকিত হল। গণেশ মূর্তির সামনে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছন্দা লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে। নিষ্প্রাণ। বুক রক্তরঞ্জিত। বেগে মঞ্চে ঢুকছে মনীশ আর নাগরাজন। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা রয়েছে একটা লম্বা লাঠি।)।
নাগরাজন–এ কি মিসেস সরকার–ওঃ হে My God_may her soul rest in peace।
(একটু চুপচাপ)
নাগরাজন–মিঃ সরকার, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করব না। দেওয়া যায় না– তা বিশ্বাস করি। কিন্তু একটু শক্ত হোন আপনি। হত্যাকারীকে ধরার এমন সুযোগ আর পাব না। এখানেই কোথাও লুকিয়েছে সে। দেখি তো গণেশ মূর্তির পিছনে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা।
মনীশ–চিৎকার করে) For Gods Sake. Dont go there. ওই লম্বা লাঠিটা হাতে নিন Inspector। ওটাকে মূর্তির মাথার মুকুটের বিচ্ছুরিত আলোয় ওপর নাড়ুন। (দেওয়ালে ঠেস দেওয়ানো লম্বা লাঠিটা তুলে নিয়ে নাগরাজন গণেশ মূর্তির মুকুটের বিচ্ছুরিত আলোয় সামনে ধরল। ঘটাং করে শব্দ হল লাঠিটা আলোয় ওপর ধরতেই, মূর্তির বুক থেকে একটা তীক্ষ্ণ ফলা বেরিয়ে এসেই আবার ঢুকে গেল। ব্লেডটার গায়ে রক্ত।)।
নাগরাজন–একি! ব্লেডের গায়ে রক্ত!
মনীশ–হ্যাঁ। আমার ছন্দার রক্ত। এইবার আপনি যুবরাজকে arrest করতে পারেন। তীক্ষ্ণধী যুবরাজের মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের নবতম আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়েছে এইভাবে। আজ আর নয় Inspector। আমি আর পারছি না।
.
অষ্টাদশ দৃশ্য
(অন্ধকার মঞ্চে শুধু স্পটলাইট ফোকাসে দেখা যাচ্ছে মনীশের প্রায়-উন্মাদ আকৃতি। কান্নাজড়ানো গলায় সে বলে যাচ্ছে…)
তার পরেও নিঃসঙ্গ একাকী জীবন বয়ে নিয়ে চলেছি আজ ২০ বছর ধরে। জানি না কবে তার সঙ্গে আবার মিলতে পারব। ছন্দা…ছন্দা…ছন্দা…জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গিনী আমার। আর কতদিন– আর কতদিন বইতে হবে আমার এ জীবন-যন্ত্রণা!
(মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। তারপরেই মঞ্চ আলোকিত হল। বসবার ঘর। মনীশ শুষ্ক উদভ্রান্ত মুখে বসে রয়েছে। নাগরাজন ঘরে ঢুকছে।)
মনীশ–আসুন Inspector, বসুন। আজ আর আপনাকে চা খাওয়াতে পারব না। কারণ, চা আমি ছেড়ে দিয়েছি। ছন্দা চা ভীষণ ভালোবাসত, ও চলে যাওয়ার পর…
নাগরাজন–এ জন্যে আমিই দায়ী মিঃ সরকার।
মনীশ–যাক গে। যুবরাজ ধরা পড়েছেন?
নাগরাজন–না।
মনীশ–কেন?
নাগরাজন–সাধারণ অপরাধীর মতো বিনা পরোয়ানায় রাজবংশের কাউকে গ্রেপ্তার করার অধিকার আমাদের নেই। পরোয়ানা নিয়ে পৌঁছতে দেরি হয়ে গিয়েছিল আমার। যুবরাজ মহলে পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পরপর দুটি ফায়ারিং-এর শব্দ শুনলাম। ঘরে ঢুকে আমরা দেখলাম দুটি প্রাণহীন দেহযুবরাজ ও যুবরানির পাশেই যুবরাজের সিক্সচেম্বার কোপ্টখানা পড়েছিল। কিন্তু মিঃ সরকার, আসল রহস্যটা তো এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেল আমাদের কাছে। মার্সডেন ও ছন্দাদেবী কী করে মারা গেলেন–তা তো বুঝলাম। কিন্তু মূর্তির মেকানিজমটা লাঠি নাড়ানোর সঙ্গে ওই লোহার ফলাটার কী যোগাযোগ–এ ব্যাপারটা তো ঠিক বুঝতে পারলাম না?
মনীশ–ফটো ইলেকট্রিক সেলের নাম শুনেছেন?
নাগরাজন–Electric eye যাকে বলে?
মনীশ–হ্যাঁ। মূর্তির মুকুটে ওইরকম একটা ইলেকট্রিক আই লাগানো আছে। সেল বিচ্ছুরিত রশ্মি কোনও কিছুতে বাধা পেলেই ভেতরের দুটি পয়েন্টে বৈদ্যুতিক প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। automatic machine। বুকের খুপরি খুলে বেরিয়ে আসে মৃত্যুদূত। সামনে দাঁড়ানো মানুষের হৃৎপিণ্ডের স্বাদ গ্রহণ করে। আলোকরশ্মির সামনে বাধাটুকু সরে গেলেই আবার circuit বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কৃপাণটিও ভিতরে ঢুকে যায় সঙ্গে-সঙ্গে।
নাগরাজন–আশ্চর্য! কী অপূর্ব মেধা যুবরাজের! কিন্তু কী নৃশংস জঘন্য তার প্রয়োগ।
মনীশ–প্রতিভার পদস্খলন!!
নাগরাজন–কিন্তু আপনি জানলেন কি করে এসব? আমাকে তো কিছুই বলেননি?
মনীশ–বলবার আর সময় পেলাম কোথায় বলুন? বলবার সময় পেলে কি আর এভাবে ছন্দাকে হারাতে হতো আমায়? পাঁচ মিনিট–শুধু পাঁচ মিনিট আগে যদি জানতে পারতাম সব কথা!! যে মুহূর্তে যুবরাজ আমার সামনে দিয়ে আপনার অফিস থেকে চলে গেলেন–সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে খুলে গেল সমস্ত রহস্যের দ্বার।
নাগরাজন–ঠিক বুঝলাম না।
মনীশ–যুবরাজ আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা লক্ষ করলাম, তার জামার আস্তিনে আর কাঁধে লেগে রয়েছে তামাটে ব্রোঞ্জ পাউডার। সঙ্গে-সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল ব্রোঞ্জের গণেশ মূর্তিটা। আর সঙ্গে-সঙ্গে মুকুটের রশ্মি আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পুলিশ জার্নালে প্রকাশিত হল Photo electric cell-এর ওপর একটি প্রবন্ধ। কী করে যে সেই মুহূর্তে আমার সে কথা মনে এল আমি নিজেই জানি না। হয়তো ছন্দার বিপদাশঙ্কাই আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে সাহায্য করেছিল। যুবরাজের কাঁধে ব্রোঞ্জ-পাউডার দেখেই মনে হল যুবরাজ নিশ্চয়ই মূর্তির গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কিছু করছিলেন। মার্সডেনের মৃতদেহও পাওয়া গিয়েছিল মূর্তির পায়ের কাছে। লক্ষ করেননি, সদ্য ব্রোঞ্জ পেন্ট করা হয়েছে গণেশকে চকচকে রাখার জন্যে? যাতে চট করে চোখ টানে সেদিকে।
