ছন্দা–বাবা! দেবী তাহলে খুব জাগ্রত বলুন?
নাগরাজন–আজ্ঞে হ্যাঁ। সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। তার প্রসাদেই এ রাজ্যের আজ এত উন্নতি। কৈশোরেই এই চন্দ্রকেতুকে মহারাজ ইংলন্ডে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। Physics এ ডক্টরেট নিয়ে আট বছর পর যুবরাজ যখন স্বদেশে ফিরলেন তখন তিনি আর একা নন সঙ্গে তার স্ত্রী পেট্রিসিয়া। পেট্রিসিয়া স্পেনের মেয়ে। পড়াশুনো করতে এসেছিলেন লন্ডনে। সেখানেই তাদের পরিচয়, প্রণয় এবং পরিণয়। মহারাজা যুবরাজকে স্নেহ করতেন প্রাণের চেয়েও বেশি। তাই অন্তরে শেল হানলেও ক্ষমা করলেন তাকে। কিন্তু যুবরানির থাকার ব্যবস্থা হল মূল প্রাসাদের বাইরে– রানি মহলে। যুবরাজ আপত্তি করলেন না। এসব ঘটনা ঘটে বছর তিনেক আগে। যুবরানির প্রথম আগমনে কিছুটা চাঞ্চল্যের সূত্রপাত হয়েছিল কিন্তু কালের প্রবাহে ধীরে-ধীরে সবই স্বাভাবিক হয়ে আসে। মাসখানেক আগে যুবরানির এক বাল্যবন্ধু এলেন এখানে ভারতবর্ষ বেড়াতে। নাম এ্যান্টনি মার্সডেন।
ছন্দা–রানির লাভার নিশ্চয়।
নাগরাজন–হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এই ললিতা মহলেই উঠেছিলেন। ললিতা মহলের বিরাট লাইব্রেরিতে আছে নানারকম সংগ্রহ। সেইসব নিয়েই মেতেছিলেন। প্রায় দিন সাতেক আগে মার্সডেনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এই লাইব্রেরির মধ্যে গণেশ মূর্তির পায়ের কাছে।
মনীশ–গণেশ মূর্তি?
নাগরাজন–হ্যাঁ। যুবরাজের সংগ্রহ বাতিক আছে। নানারকম মুদ্রা থেকে শুরু করে মূর্তি ইত্যাদি সংগ্রহ করে এক ছোট আর্ট মিউজিয়ামও করেছেন ললিতা মহলে। ব্রোঞ্জের তৈরি এই বিরাট গণেশ মূর্তিটি লাইব্রেরি রুমেই রাখা হয়েছে একটি সিংহাসনের ওপর। তারই পায়ের তলায় মার্সডেনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। একটা সরু ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেউ তার হৃৎপিণ্ডটা এফেঁড়-ওফেঁড় করে দিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় মৃতদেহের মুখে কোনও ভয় বা যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র ছিল না। ছিল অপার বিস্ময়।
মনীশ–ঘরটা আপনি হত্যার পর দেখেছেন নিশ্চয়। কিছু ক্ল পাননি?
নাগরাজন–কি না। মার্সডেন মারা গেছে আগের রাত্রে পোস্টমর্টেমে এর বেশি কিছু পাওয়া যায়নি।
মনীশ–সে রাত্রে গেস্ট হাউসে কে-কে ছিল?
নাগরাজন–মার্সডেন আর নিয়মিত দারোয়ান, বয়, বাবুর্চি–এরা ছাড়া আর কেউ না।
মনীশ-যুবরাজ?
নাগরাজন–যুবরাজ সে রাত্রে রাজধানী থেকে প্রায় মাইল দশেক দূরে রিজার্ভ ফরেস্টে শিকার করতে গিয়েছিলেন। সকালে খবর পাঠানো মাত্র ফিরে আসেন।
মনীশ–তাহলে মোটের ওপর কোনও দরকারি সূত্রই আপনি পাননি–তাই না?
নাগরাজন–একেবারে না।
মনীশ–আচ্ছা, ব্যক্তিগতভাবে কারও ওপরে সন্দেহ হয় না আপনার?
নাগরাজন–সন্দেহ আর কাকে করব? যতদূর জানা গেছে, মার্সডেনের সঙ্গে এ রাজ্যে পরিচয় ছিল শুধু দুজনের–যুবরাজ ও যুবরানির। এই কদিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে শত্রুতা গড়ে ওঠাও অস্বাভাবিক। তাছাড়া ললিতা মহল থেকে উনি বাইরে বেরুতেন কদাচিৎ–বেরোলেও গন্তব্যস্থান ছিল রানিমহল। কিন্তু যুবরাজ ও যুবরানির alibi অকাট্য। একজন ছিলেন রানিমহলে। আর একজন রিজার্ভ ফরেস্টে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রমাণও পেয়েছি যথেষ্ট।
মনীশ–আশ্চর্য!
নাগরাজন–আরও আশ্চর্য হবেন যে, লাইব্রেরি ঘরের সমস্ত দরজা জানলা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রত্যেকটি স্ন্যাস উইন্ডো আর দরজা শক্তভাবে আঁটা ছিল ভেতর থেকে। সকালে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার পর তাই দেখা গেছে।
মনীশ–বন্ধ ঘরের মধ্যে মৃতদেহ পাওয়া গেলে দুটো পথে এ রহস্যের সমাধান পাওয়া যেতে পারে। এক নম্বর–মৃতব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে কিনা। দু-নম্বর–ঘরের মধ্যে কোনও গুপ্ত দরজা আছে কিনা। বিশেষ করে রাজা-মহারাজার বাড়ি যখন।
নাগরাজন–মিঃ সরকার, আমারও সেকথা মনে হয়েছিল। কিন্তু Postmortem report বলছে তীক্ষ্ণ শলাকাটা যেভাবে হৃৎপিণ্ডে বিঁধেছে, আত্মহত্যায় সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়া অস্ত্রটাই বা যাবে কোথায়? সেটাও তো অনেক খোঁজা হয়েছে। কাজেই আত্মহত্যায় প্রশ্নটা ধোপে টেকে না।
মনীশ–গুপ্ত দরজার খোঁজ করেছিলেন?
নাগরাজন–মহারাজকে আমার সন্দেহের কথা খোলাখুলি বলেছিলাম। উনি আমায় গেস্ট হাউসের পুরোনো নক্সা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে ললিতা মহলের কোথাও নেংটি ইঁদুরের জন্যেও গুপ্তপথ রাখা হয়নি।
ছন্দা–আচ্ছা, আপনি যুবরাজ বা যুবরানির সঙ্গে এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেননি? তাদের কী মত?
নাগরাজন–এটা অবশ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সন্দেহ নেই। দেখুন, আপনাদের আমার ভালো লেগেছে। এসব ব্যাপার অত্যন্ত Secret, তবু এতটা যখন আপনাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেছি, তখন সঙ্কোচের বাধা আর রাখব না। যুবরাজের সঙ্গে আমার যে আলোচনা হয়েছিল তা খুব প্রীতিকর নয়।
মনীশ–যেমন।
নাগরাজন–শুনুন তবে।
.
দ্বিতীয় দৃশ্য
(রাজঘর। যুবরাজ চন্দ্রকেতু বসে আছেন দামি চেয়ারে।
নাগরাজন দাঁড়িয়ে সামনে, পুলিশি বেশে।)
চন্দ্রকেতু–এ কেস হাতে নিয়েছেন আপনি?
নাগরাজন–Yes, your হাইনেস।
চন্দ্রকেতু–সবাইকে জেরা করেছেন?
নাগরাজন–Yes, your—
চন্দ্রকেতু–কী বলে তারা?
নাগরাজন–রাত্রে ইনি ছাড়া এখানে কেউ ছিলেন না। দরজা জানলা ভিতর থেকেই বন্ধ ছিল। কোনও চিৎকারও শোনা যায়নি।
চন্দ্রকেতু–কী মনে হয় আপনার? Suicide?
