নাগরাজন–থাকবে থাকবে মশাই। আমি তো প্রায় তিন বছর কাটিয়ে দিলাম। এখনও তো বেশ ভালো লাগছে। আপনাদের কলকাতার সেই কর্মমুখর প্রাণচাঞ্চল্য এখানে নেই বটে কিন্তু এখানকার এই নৈঃশব্দ্যই এর প্রাণ। থাকুন, ভালোবাসুন–তখন ছাড়তেই চাইবেন না।
মনীশ—(মুগ্ধভাবে) বাঃ! পুলিশে চাকরি করেও ভারি চমৎকার কবি-প্রকৃতি তো আপনার। বাংলা vocabulary তো বেশ strong করেছেন দেখছি। কী স্যার, লেখার অভ্যাস- টভ্যেস আছে নাকি?
(ট্রে হাতে ছন্দার প্রবেশ)
ছন্দা–খুব তো জমিয়ে গল্প হচ্ছে। নিন এবার কিছু খেয়ে নিন।
নাগরাজন–Very good, দিন মিসেস সরকার। Mr. Sarkar জিগ্যেস করছিলেন, আমি সাহিত্যচর্চা করি কিনা। বলছিলাম আমার তো বই পড়াই হয়ে ওঠে না, লেখা দূরে থাক।
ছন্দা–-ও হো, আপনি তো আসল ব্যাপারটাই জানেন না। আসুন পরিচয় করিয়ে দিই। Mr. Nagrajan আপনি যেমন পুলিশের কাজে গোয়েন্দাগিরি করেন, ইনি মনীশ সরকার তেমনি বাংলা পাঠক সমাজে গোয়েন্দা কাহিনি লিখে বিলক্ষণ দুর্নাম কিনেছেন সেই সাথে আমাকেও ডুবিয়েছেন। আঃ চুল টানছ কেন?
নাগরাজন–By jove, আপনি ডিটেকটিভ গল্প লেখেন নাকি?
ছন্দা–আপনি মশাই, ওর কাছে খুনের গল্পটগ্ধ করবেন না যেন। ঘুমিয়ে জেগে সবসময়ে তো খুন করে চলেছে। কোনওদিন না আমাকেই
নাগরাজন–হেসে) নাঃ আপনাদের দেখছি কস্মিনকালেও বনিবনা হবে না।
মনীশ–নতুন কী অ্যাডভেঞ্চার করলেন মশাই?
নাগরাজন–অ্যাডভেঞ্চার বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়, তবে সম্প্রতি একটা অদ্ভুত খুনের ঘটনা আমাকে বড়ই ভাবিয়ে তুলেছে।
মনীশ–তাই নাকি! কী ব্যাপারটা বলুন তো?
নাগরাজন–অবশ্য অত্যন্ত গোপনীয় ব্যাপারটা। মহীশূর রাজপরিবারের সমস্ত সম্মান নির্ভর করছে এই ব্যাপারটা সমাধানের ওপর। তবে আপনাদের বলতে বাধা নেই, কারণ আপনাদের আমি Family friend বলেই মনে করি। (একটু থেমে) ললিতা মহল দেখেছেন আপনারা?
মনীশ–কোন ললিতা মহল? গেস্ট হাউসের কথা বলছেন?
নাগরাজন–হ্যাঁ।
মনীশ–বাড়িটার কথা শুনেছি বটে। দেখা হয়ে ওঠেনি এখনও।
নাগরাজন–দেখে আসবেন একদিন। এখান থেকে মাইল চারেক দুরে মহারাজ কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার রাজবাড়ি। প্রাসাদ তোরণের সামনেই দেখবেন একটি Circle. ঠিক কেন্দ্র থেকে পরস্পর সমকোণে চলে গেছে দুটি রাস্তা। একটি রানি মহলের দিকে–নাম শুনেই বুঝতে পারছেন রানি মহল কী। আর একটা গিয়ে পৌঁছেছে এই ললিতা মহলে। মহীশুর রাজন্যবর্গের সম্মানিত অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত গেস্ট হাউস। এই ললিতা মহলেই কয়েকদিন আগে পাওয়া গেছে একটি মৃতদেহ। হৃৎপিণ্ডের মাঝখান দিয়ে কেউ ধারালো সরু একটা শলাকা চালিয়ে দেওয়ার ফলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে।
মনীশ–মৃত ব্যক্তি কে?
গরাজন–তার কথা বলতে গেলে রাজপরিবারের একটা ছোট্ট ইতিহাস বলতে হয়।
মনীশ–বলতে বাধা থাকলে বরং থাক।
নাগরাজন–না, আপনাদের বলতে কোনও বাধা নেই। প্রথমেই বলে রাখি বর্তমান মহারাজা কৃষ্ণরাজা নিঃসন্তান। এই সন্তান না হওয়ার পেছনে আছে এক করুণ অথচ Interesting কিংবদন্তী। বহু বছর আগে এ বংশের এক রাজকন্যা কুলদেবীর আরাধনায় উন্মাদিনী হয়েছিলেন। নিজেকে দেবীর চরণে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়ে দিবানিশি বিভোর হয়ে থাকতেন তাঁর পূজায়। একদিন তিনি মনস্থ করলেন তার যাবতীয় রত্নালঙ্কার দেবীকে উৎসর্গ করবেন নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়ে। সমস্ত রত্নালঙ্কার তিনি সেই উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। তখনকার মহারাজা ছিলেন তাঁর ভাই। তিনি বোনের এই সঙ্কল্পের কথা জানতে পেরে তাকে জানালেন রাজপরিবারের সমস্ত অলঙ্কার আর রত্নরাজি দেশবাসীর। তাদের অমতে এবং অজ্ঞাতসারে কোষাগারের একরতি স্বর্ণও তিনি অপব্যয় করতে পারেন না। রাজভগ্নী বোঝাবার চেষ্টা করলেন–এ অপব্যয় নয়, দেবীর কাছে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু মহারাজ তার সিদ্ধান্তে অটল। বোনের খেয়াল চরিতার্থ করতে দেশবাসীকে তিনি বঞ্চিত করতে পারেন না।
ছন্দা–Interesting গল্প তো–
নাগরাজন–সেই রাতেই নদীতীরে আবির্ভূত হল অভিমানী রাজকন্যার তপঃক্লিষ্ট দেহ। বসনাঞ্চলে তার যাবতীয় স্বর্ণালঙ্কার। সেই বিপুল ঐশ্বর্য হাতে নিয়ে তিনি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রাতের অন্ধকারে উচ্চারণ করলেন এক অভিশাপ বাণী–দেবীর চরণে অঞ্জলি সমর্পণে বাধা দেয় যে রাজবংশের মহারাজা, আজ থেকে সে রাজন্যবর্গ হবেন নিঃসন্তান। এই বলে তিনি অলঙ্কার সমেত নদীগর্ভে তলিয়ে গেলেন।
মনীশ–কী ভয়ানক! তারপর?
নাগরাজন–তারপর উত্তাল উদ্দাম হাওয়া হাহাকার রবে আছড়ে পড়ল তার ওপর নিঃশব্দ ক্রন্দন যেন। ফিরিয়ে আনতে চাইল তাঁকে। কিন্তু নদীগর্ভের আবর্ত আরও দুর্নিবার বেগে আবিল হয়ে আহ্বান জানালেন রাজকুমারীকে। মুহূর্তের মধ্যে পুঞ্জ-পুঞ্জ ফেনার মাঝে হারিয়ে গেল রাজকন্যার শুভ্র বরতনু–সেই সাথে যাবতীয় রত্নরাজি। এরপর থেকেই দেখা গেছে সিংহাসনে সমাসীন এক মহারাজার সন্তান হয়েছে–কিন্তু পরবর্তী মহারাজা থেকেছেন নিঃসন্তান। তার পরবর্তী রাজার আবার সন্তান হয়েছে। জানি না এর মধ্যে অলৌকিক ব্যাপার আছে কিনা। কিন্তু বংশানুক্রমিক ভাবে এই ব্যাপারেই পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে। বর্তমান মহারাজা নিঃসন্তান। প্রচলিত প্রথানুযায়ী তিনি পোয্য নিয়েছেন যুবরাজ চন্দ্রকেতুকে।
