আমি মুখ খুলতে গেলাম, কিন্তু তার আগেই হাত তুলে বাইশটা পরদার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ডক্টর বললেন, ধূমকেতু! ধূমকেতু!
সচমকে দেখলাম, রক্তবর্ণ অগ্নিগোলক পেছনে কালচে বেগুনি রঙের পুচ্ছ উড়িয়ে বনবন করে পাক দিচ্ছে বাইশটা পরদায়। ফুলঝুড়ির মতো অজস্র লাল কালো বাদামি বেগুনি রং ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে। ঘোরার পথে ঘন-ঘন প্রদীপ্ত হয়েই যেন নিস্তেজ হয়ে আসছে ধূমকেতুর মুণ্ড পরক্ষণেই জ্বলে উঠছে দ্বিগুণ তেজে। পরদা জুড়ে অতিপ্রাকৃত অনৈসর্গিক সেই আলোর খেলা পৃথিবীর কোনও বর্ণালীতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি।–ডক্টরের কথাই যদি সত্য হয়–এ রং মনের রং– চোখ কখনও দেখেনি।
আলোক তরঙ্গ কিন্তু অত্যন্ত চঞ্চল, অস্থির। ঘন-ঘন নতুন-নতুন কোণ থেকে মোচড় নিয়ে আছড়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন আওয়াজে মুখরিত হয়েছে বাইশটা অ্যামপ্লিফায়ার। জল স্থল অন্তরীক্ষ যেন একসাথে প্রলয় নাচে নেচে চলেছে। অট্ট-অট্ট হাসি হেসে লক্ষ করে তালি দিয়ে যেন জল ফুঁসছে, ঢেউ আছড়াচ্ছে, শিলাময় বিস্তীর্ণ উপকূলে হু-হুঁঙ্কারে ভেঙে পড়ছে সাইক্লোন তাড়িত দানবিক তরঙ্গ। বাড়ছে জলোচ্ছ্বাসের শব্দ–সেই সঙ্গে ফাটছে যেন কানের পরদা। তালে তাল মিলিয়ে জল যেন ঘুরছে, শূন্যে উঠছে; আকাশ যেন নীচু হয়ে চুম্বন করতে চাইছে সাগরের জলকে আকাশ আর সাগর যেন মুখে মুখ দিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে চাইছে, যেন জলস্তম্ভ রচিত হচ্ছে। ঘুরন্ত জলরাশি আর ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলিত দাপটে।
ধ্বনিময় জলনির্ঘোষ যখন রূপময় হয়ে উঠেছে মনের পরদায়, ঠিক তখনি যেন যাদুমন্ত্রবলে ক্ষীণ ক্ষীণতর ক্ষীণতম হয়ে মিলিয়ে গেল বাইশটা পরদায় ধূমকেতুর ঘূর্ণন–অপার্থিব নাচন। মিলিয়ে গেল মহাশূন্যতায়–ধূ-ধূ শূন্যতার মধ্যে বাইশটা পরদায় যেন কুয়াশার মতো অস্বচ্ছ অস্পষ্ট কৃষ্টালদানা শূন্য হতে এসে জমা হতে লাগল পরদার বুকে…যেন অগুন্তি নক্ষত্রখচিত বাইশটা ছায়াপথ লাটুর মতো বনবন করে ঘুরতে-ঘুরতে জমাট বাঁধতে লাগল মধ্যিখানে…জ্যোতির্ময় হাজারটা সুপার রামধনু যেন একযোগে পাকসাট খেয়ে গেল পরদার বুকে..তারপর অকস্মাৎ, নেহাতই আচম্বিতে, আমার মনের ঘোর সন্দেহকে প্রকট করে দিয়ে নিমেষ মধ্যে আবছা আকারে জেগে উঠল দুটি মুখ– অজস্র রঙে রঞ্জিত, আবেগে বিহ্বল, আবেশে স্নিগ্ধ শুধু দুটি মুখসৃষ্টির শুরুতে যেভাবে আদম আর ঈভ চেয়েছিল পরস্পরের পানে–একান্ত সন্নিকটে ঠিক তেমনিভাবে ওরা নিষ্পলকে চেয়ে আছে পরস্পরের পানে এবং সে মুখ আমার আর….
কানের ওপর সমুদ্রনির্ঘোষ নায়াগারূপ বজ্রনাদে ফেটে পড়ল। পৃথিবীর কোনও জানা রূপক দিয়ে ভাষা দিয়েও সেই গুরুগম্ভীর সঙ্গীতকে বোঝানো যায় না। দেহমন অবশ করা অবর্ণনীয় সেই নিনাদের বুক চিরে শোনা গেল বাসু মিত্রের পাথরে পাথর ঘষা কণ্ঠে একটি মাত্র চিরন্তন শব্দ। কানের কাছে মুখ এনে নীরস উদাস বিষণ্ণ কণ্ঠে শুধু বললেন : চুম্বন!
(বিদেশি ছায়ায়।) * দক্ষিণী বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা, ১৩৮৩)।
ব্রোঞ্জের গণেশ
প্রথম দৃশ্য
(বসবার ঘর। ছন্দা বসে আছে। মনীশ নাগরাজনকে টানতে-টানতে ঢুকছে।)
মনীশ–চন্দা, ছন্দা–দ্যাখো, কে এসেছেন। আসুন, আসুন স্যার, বসুন। ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল। ধরে না আনলে তো আর আসতেন না।
ছন্দা–কী ব্যাপার, কাকে ধরে আনলে। ও, মিঃ নাগরাজন–নমস্কার।
নাগরাজন–নমস্কার।
মনীশ–দারোগাসাহেবকে ধরে আনলাম–উনি দারোগা, সবাইকে ধরেন-টরেন। আজ আমাকেই ধরে আনতে হল ওঁকে।
ছন্দা–খুব খুশি হলাম, মিঃ নাগরাজন। ভাবতেই পারিনি গরিবের ঘরে আপনার পায়ের ধুলো পড়বে।
নাগরাজন–Please, অমন করে বলবেন না, ম্যাডাম। জানেনই তো আমাদের যা কাজ। তবে একথা বিশ্বাস করতে পারেন যে, আজ আপনাদের এখানেই আসছিলাম।
মনীশ–আপনি তো তাহলে অনেকদিন জ্বালাবেন।
নাগরাজন–জ্বালাব? মানে?
মনীশ–জ্বালাবেন বইকি। একটু আগেই আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল আপনাকে নিয়ে। ভাগ্যিস সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল–নইলে ওর হারানো হাত ঘড়িটা তো আর ফিরে পেতাম না। নতুন জায়গায় এসেছি। সঙ্গে-সঙ্গে একটা অমঙ্গল ঘটলে মন খারাপ হয়ে যেত না? উঃ, চিমটি কাটছ কেন?
নাগরাজন–সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছে আপনারা কোথাও বেরুচ্ছিলেন। আমি এসে শুভযাত্রায় বাদ সাধলাম নিশ্চয়ই। আমি বরং–
মনীশ–আরে না মশাই। রাখুন আপনার ওঠা। আপনি এলেন আর আমরা বেড়াতে বেরুব? না, না। তার চেয়ে বরং Let us celebrate your presence today. কী বল?
ছন্দা–আপনারা বসুন–আমি আসছি।
নাগরাজন–না, না, আপনি আবার কেন ব্যস্ত—
ছন্দা–আঃ, আপনি বসুন তো চুপচাপ। এ বাড়িতে আমি গিন্নি তা জানেন?
(ছন্দার প্রস্থান)
নাগরাজন–সপ্রশংসভাবে) Really she is a gem. সত্যি মশাই স্ত্রীভাগ্য আছে বটে আপনার।
মনীশ–ওকে নিয়েই তো আছি মশাই। ওর জন্যেই সব ছেড়েছি, বাপ মায়ের স্নেহ হারিয়েছি। আবার ওর মধ্যেই পেয়েছি ঘরের সমস্ত উত্তাপ উষ্ণতা। যা হারিয়েছিলাম সব পেয়েছি। জানেন ইন্সপেক্টর, ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই এ সংসারে।
নাগরাজন–শুনে খুশি হলাম। যাক, মাইশোর কেমন লাগছে বলুন?
মনীশ–প্রথম-প্রথম তো সব জায়গাই ভালো লাগে। বিশেষ করে মহীশূরের মতো সুন্দর জায়গা কার না ভালো লাগে। খুব বেড়াচ্ছি-টেড়াচ্ছি তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। তবে কতদিন এ চার্ম বজায় থাকবে তা জানি না।
