ফরেন কমেন্ট তাই বটে।
খুব মিথ্যে কমেন্ট নয় কিন্তু। ব্রেনপ্রিন্ট থেকে সার্কিট বানিয়ে নিয়ে মেমারি ব্যাঙ্কেও গোয়েন্দাগিরি করা যায়। একটু হেসে বললেন, যে মেমারি আপনি ডিজক্লোজ করতে চান না তাও।
শেষ কথাটা ডক্টর মিত্র কীরকম যেন ফিসফিস করে বললেন। ওঁর কথা বলার ধরন এমনিতে কর্কশ। গলা নামিয়ে নরম গলায় কথা বলতে জানেন না। তাই গলার স্বর হঠাৎ খাদে নেমে আসায় অস্বাভাবিক শোনাল।
উনি কুঁজো পিঠ নিয়ে শরীরটাকে দুলিয়ে দুলিয়ে ততক্ষণে প্যানেলগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। পটাপট কয়েকটা সুইচ টিপে দিতেই ঘর অন্ধকার হয়েই মৃদু নীলাভ আলোয় আলোকিত হয়ে রইল। চারিদিকে যেন তারার আলো জ্বলতে লাগল–মাঝখানে আমি নরম কুশন মোড়া কালো। চেয়ারে বসলাম।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, আমার পানে নির্নিমেষে চেয়ে রয়েছেন বাসু মিত্র। নীলাভ অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু মনে হচ্ছে যেন দু-টুকরো নীল আগুন জ্বলছে দুই চোখে। পরক্ষণেই বুঝলাম, চোখের ভুল। নীলাভ আলোর রিফ্লেকশনে নীল আগুনের মতো জ্বলছে চশমার কাঁচ।
বললাম, আপনার টপোস্কোপ রেডি?
হ্যাঁ, রেডি, কাটা-কাটা স্বর ভেসে এল নীলাভ অন্ধকার পেরিয়ে, এখুনি দেখবেন ব্রেন ডিটেকটিভদের গোয়েন্দাগিরি–শুনতেও পাবেন।
বিরক্তি লাগছিল ডক্টর মিত্রের হেঁয়ালিতে। আমি প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। সময়ের দাম অনেক। অনেকক্ষণ ধরে বসিয়ে রাখার জন্যে বিরক্ত হইনি মালা-স্বপ্নে বিভোর ছিলাম বলে। কিন্তু এবার হলাম।
বললাম ঈষৎ উষ্ণ স্বরে, একটু তাড়াতাড়ি করুন। চেম্বারে যেতে হবে।
উত্তরে হাসির শব্দ শুনলাম। কর্কশ হাসি। কিন্তু কথাগুলো ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দিলেন যেন বিনয়ের রসে ডুবিয়ে-ডুবিয়ে।
বললেন, ডাক্তার, আপনি ভালোবাসার রং জানেন? ঊষার আলোর মতো কখনও গোলাপি। রাগলে এই রঙই কালো। ঈর্ষায় ধূসর বাদামি। কামনায় ড্রাগন-লাল।
কী বলতে চান ডক্টর? ধাঁধায় পড়লাম। কথায় বলে, কানা খোঁড়া কুঁজো–তিন চলে না উজো। এরা কখনওই সোজা পথে যায় না কুঁজো বাসু মিত্রও কোন পথে আসছেন বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকাই মঙ্গল মনে করলাম।
নীলাভ অন্ধকারের মধ্যে সেইরকম পাথরে পাথর ঘষার মতো কর্কশ স্বরে ডক্টর তখনও বলে চলেছেন–ঠিক তেমনি মানুষের মাথার মধ্যে সুর আছে–গানের সুর, আনন্দের সুর, উদ্বেগের সুর, ভালোবাসার সুর মনের ভাবতরঙ্গ যেরকম ঠিক সেইমতো ইলেকট্রিক্যাল রিদম উঠছে ব্রেনের মধ্যেও। এতদিন আপনি চার্টে আলোর নাচ দেখেছেন–এবার দেখবেন শব্দ আর রঙের মধ্যে। একটু থেমে গলা নামিয়ে বললেন খসখসে গলায়, সেই সঙ্গে চেহারা চিন্তার চেহারা!
বলার সঙ্গে-সঙ্গে খটাং করে একটা আওয়াজ হল। আমার চোখের পরদার ওপর ফেটে পড়ল একসঙ্গে বাইশটা টেলিভিশনের রক্তলাল আলোক উচ্ছ্বাস। ক্ষণেকের জন্যে অতি উজ্জ্বল রক্তাক্ত ফ্লাশে আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলাম। একই সঙ্গে কানের পরদার ওপরেও ফেটে পড়ল প্রমত্ত ঝড়ের অট্টনিনাদ। কানের টিমপ্যানিক মেমব্র্যান যেন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। সারা ঘরটাকে যেন নিমেষ মধ্যে লক্ষ করতালি বাজিয়ে উড়িয়ে ফাটিয়ে শূন্যমার্গে বিলীন করে দিতে চাইল সেই শব্দ বিস্ফোরণ।
চোখ বন্ধ করে কানে হাত চাপা দিয়ে চিৎকার করে বললাম, একী করছেন? অ্যাডজাস্ট করুন–তাড়াতাড়ি।
কর্ণবধিরকারী সেই প্রলয়ংকর শব্দ ছাপিয়ে বাসু মিত্রের জবাব শুনতে পেলাম না বটে, কিন্তু আস্তে-আস্তে ক্ষীণ হয়ে এল বাইশটা অ্যামপ্লিফায়ারের সম্মিলিত বজ্রনির্ঘোষ। চোখের পাতার ওপরেও আলোয় ঝলক স্তিমিত হয়ে আসতে চোখ খুললাম ধীরে-ধীরে।
কী দেখলাম? দেখলাম, ড্রাগন-লাল ঘোর লোহিতবর্ণ তিরোহিত হচ্ছে বাইশটা পরদার বুক থেকে। যেন বাইশটা ঘূর্ণিপাক রক্তের সাগরে মিলিয়ে যাচ্ছে আস্তে-আস্তে।
কানের কাছে শুনলাম ফিসফিসানি, কামনার রং।
চমকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, আমার ঠিক পেছনটিতে এসে দাঁড়িয়েছেন বাসু মিত্র। পিঠ বেঁকিয়ে প্রোজ্জ্বল চোখ দুটো নিবদ্ধ রেখেছেন অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো বাইশটা পরদার দিকে। বাইশটা রক্তলাল ঘূর্ণিপাকের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চশমার কাছে।
ফিসফিস করে ফের বললেন ডক্টর, দেখুন, দেখুন ভালোবাসার রং।
বজ্রগর্জন মিলিয়ে গেল। কান জুড়িয়ে গেল যেন বীণার ঝংকারে। অজানা অপার্থিব রাগরাগিনী অশ্রুতপূর্ব অর্কেস্ট্রায় বেজে চলেছে…চলেছে। পৃথিবীর কোনও ভাষা কোনও সঙ্গীতের স্বরলিপি দিয়ে অলৌকিক সেই সঙ্গীতের ব্যাখ্যা করা যায় না। পরদার বুকে সেইসঙ্গে আরম্ভ হয়েছে। গোলাপি রঙের খেলা। অজস্র গোলাপ ফুল যেন নিংড়ে রং ঢেলে দিয়েছে বাইশটা পরদায়। দেখতে দেখতে অদৃষ্টপুর্ব সেই রঙের জোয়ার বর্ণালীর ওপর দিয়ে ধেয়ে গিয়ে ভোরের রাঙা আকাশের মতো অপরূপ হয়ে উঠল। কানের ওপর সুরের খেলাও বুঝলাম মোড় নিয়েছে।
ফিসফিস করে বললেন বাসু মিত্র, প্রথমে যা দেখলেন–তা মালার ব্রেনপ্রিন্ট। গত পূর্ণিমায় গঙ্গার ঘাট থেকে ফিরে ও যখন ঘুমন্ত, তখন মেমারি ব্যাঙ্ক থেকে লুঠ করেছি চিন্তার রং কামনার রং। আর এখন যা দেখলেন তা আপনার ব্রেনপ্রিন্ট–একটু আগের ভাবনার রং। আপনি বড় রোম্যান্টিক, ডক্টর, তাই না? বড় বেশি রোম্যান্টিক।
