এই গেল গজানন-পুঁতিবালার ইতিবৃত্ত। দার্জিলিঙে হিপনোটিক কিলারদের বিরাট গ্যাংটার বারোটা বাজানোর পর থেকে গজাননের দক্ষিণা আর খাতির দুটোই বেড়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল সিক্রেট সোসাইটি ত্রিশূল এখন আর তাকে ব্যঙ্গার্থে নেকনজরে দেখে না, সত্যি সত্যিই নেকনজরে দেখে এবং জটিল প্রাণঘাতী কেস না হলে তাকে তলব করে না।
গজাননের সুবিধে হচ্ছে সে একাই অ্যাকশনে নেমে পড়ে। ইন্ডিয়ান আর্মির রেড ডেভিল কম্যান্ডোদের মতো। হয় কাজ শেষ করে ফরসা হয়ে যাও, নইলে মরো–এই হল তার সোজা সরল কাজের দর্শন। কারও সাহায্য চাই না। এসেছি একলা, যাইব একলা, কেউ তো সঙ্গে যাবে না জিরো জিরো গজাননের এটা একটা প্রিয় গান। আর একটা প্রিয় গান হল, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে। গজানন লেখাপড়া শেখবার চান্স পায়নি কিন্তু গুরুদেবকে বেশ শ্রদ্ধা করে।
হঠাৎ পাইপ টানা বন্ধ করল গজানন। সাদা প্রিয়দর্শিনী টেলিফোনের পাশে লাল ইলেকট্রনিক আলোটা জ্বলছে আর নিভছে।
ত্রিশূল-এর টেলিফোন এসেছে। এসব কারিগরি ত্রিশূল কর্তৃপক্ষদের। স্পেশাল এজেন্টের স্পেশাল ব্যবস্থা তারাই করে দিয়ে গেছে।
মুখ থেকে পাইপ এবং টেবিল থেকে পা দুখানা ঝট করে নামিয়ে নিয়ে রিসিভার তুলে নিল গজানন। মেরুন কালারের টি-শার্টের ওপর সাদা যন্ত্রটাকে প্রায় ঠেকিয়ে সদ্য রপ্ত করা ইয়াঙ্কি টানে বললে–ইয়া..ইয়া…দিস ইজ জিরো জিরো গজানন।
ওপার থেকে ভেসে এল রামভেটকি সুরকিওয়ালার অতীব মধুর কণ্ঠস্বর–গজানন, মাই ডিয়ার গজানন, আর ইউ ফ্রি নাই?
আই অ্যাম অলওয়েজ ফ্রি ফর দ্য কানট্রি। এ কটা কথাও লিখে লিখে প্র্যাকটিস করে নিয়েছে গজানন। দু-চারটে ইংলিশ বুকনি না ছাড়লে এ লাইনে প্রেস্টিজ থাকে না।
গজানন, মাই সুইট গজানন, এখুনি চলে আসুন; ভেরি সুইট গলায় বললে রামভেটকি সুরকিওয়ালা–যার চোদ্দো পুরুষেও রামছাগল, ভেটকি মাছ বা সুরকির ব্যবসা করেনি। গুপ্তচর পেশায় নাকি অদ্ভুত-অদ্ভুত নাম নিলে শত্রুপক্ষের গায়ে কাঁটা দেয়। রামভেটকি সুরকিওয়ালাকে এমনিতে দেখলেও অবশ্য গায়ে কাঁটা না দিয়ে যায় না।
গজাননের সঙ্গে অনতিকাল পরেই দেখা হল এহেন লোমহর্ষণকারী পুরুষটির। ছোট্ট একটা বুলেটপ্রুফ ঘরের মধ্যে বসে তাড়ি খাচ্ছিল রামভেটকি। তাড়ি খেলে নাকি হাঁপানি সেরে যায়। তাই হুইস্কি ছেড়ে তাড়ি ধরেছে অতিশয় কদাকার এবং রীতিমতো ভয়ানক এই মানুষটা। মানুষের আগের কোন এক পুরুষ গরিলা ছিল। কীভাবে জানা নেই, বিধাতার দুর্বোধ্য লীলাহেতু বহু জন্ম পারের সেই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে রামভেটকি জন্ম নিয়েছে। গুলি বিনিময়ের ফলে একটা কান হারিয়েছে। বুকেও একটা ফুটো আছে–সেই থেকেই হাঁপানির ব্যয়রাম, ডাইরেক্ট অ্যাকশনে আর নামতে পারে না। কিন্তু ডাইরেক্ট ডিসিশন নিতে তার জুড়ি নেই। ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো ছিল সে এক সময়ে। যুদ্ধের সময়ে শত্রুপক্ষের পেছনে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে নেমেছে, টেলিকমিউনিকেশন সেন্টার ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে, অপারেশনাল হেড কোয়ার্টারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, বড় ঝামেলা পাকাচ্ছিল বলে বিশেষ এক কম্যান্ডারকে খতমও করেছে। ফিরে আসার পর এমন প্রস্তাবও উঠেছিল ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডের নাম এখন থেকে ব্ল্যাক গরিলা কম্যান্ডো রাখা তোক।
কিন্তু বেসরকারি সংস্থা ত্রিশূল তাকে টেনে নিয়েছে ভারতের স্বার্থরক্ষার জন্যে। এখন রামভেটকি সুরকিওয়ালার ডিম্যান্ড দেশে-বিদেশে–আজ কলকাতায়, এক মাস পরে মস্কোয়, তার পরের মাসে হয়তো ওয়াশিংটনে।
এহেন কালান্তক যমের সামনে অকুতোভয়ে দাঁড়িয়ে বললে আমাদের জিরো জিরো গজানন, ইয়েস বস, হোয়াট অর্ডার?
গজানন, কেস সিরিয়াস। অবতার সিং খতম।
অবতার সিং…অবতার সিং!…কোন অবতার?
ননসেন্স! অবতার সিং আমাদের কান্ট্রির বেস্ট সায়েন্টিফিক ব্রেন মিলিটারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এমন গবেষণা করেছেন যে ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছে তামাম দুনিয়া।
তাই নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটু কারেন্ট খবর রাখুন, গজানন। এই যে আইসল্যান্ড সামিট ব্যর্থ হল, গর্বাচভ আর রেগান যে যাঁর দেশে ফিরে গেলেন। কারণ কী? স্টার ওয়ার্সের চাইতেও ভয়ানক যুদ্ধ পরিকল্পনা অবতার সিং মাথায় এনে ফেলেছিলেন বলে। খবরটা হাইলি সিক্রেট–তা সত্ত্বেও লীক আউট হয়ে গেছিল। ফলে আইসল্যান্ডের আইস গলল না–মাঝখান থেকে অবতার সিং এর মাথাটা গেল।
মাথাটা গেল? বসে পড়ল গজানন। রামভেটকির শেষের কথায় মাথাটা শব্দের ওপর কেন এত জোর দেওয়া হল? নিশ্চয় তার মানে আছে।
হ্যাঁ, অবতার সিং-এর ব্রেন সমেত মাথাটা উধাও হয়েছে। শুধু চোয়াল আর মাথার পেছন দিকটা গলার সঙ্গে লেগে আছে।
.
দমদম এয়ারপোর্ট থেকে হেলিকপ্টারটা কলাইকুন্ডার যেখানে এসে নামল, তার আশেপাশে ধু-ধু মাঠ! বেশ কয়েক বছর আগে এখানে এয়ারফোর্সের মহড়া দেখে গেছিল গজানন। সে এক সাঙ্ঘাতিক দৃশ্য। ভারতীয় বিমানবহর যে কী দুর্ধর্ষ, সেদিন তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছিল।
রামভেটকি আগে নামল কপ্টার থেকে। পেছন-পেছন গজানন। এই ফাঁকা মাঠে মুন্ডুহীন একটা দেহ দেখবার প্রত্যাশায় যখন ইতি-উতি তাকাচ্ছে, রামভেটকি তখন হেলিকপ্টারকে পেছনে ফেলে হেলেদুলে এগিয়ে যাচ্ছে ছোট্ট একটা টিলার দিকে। কপ্টারের বিকট আওয়াজ শোনা গেল পেছনে। সচমকে ঘাড় ফিরিয়ে গজানন দেখলে শূন্যে উড়েছে অতিকায় গঙ্গাফড়িং। একটু কাত হয়ে উড়ে যাচ্ছে যেদিক থেকে এসেছে, সেই দিকেই। দেখতে-দেখতে দিকচক্রবালে হারিয়ে গেল যন্ত্রযান।
