বাসু মিত্র সত্যই ভোলা মহেশ্বর। মালা মিত্র তার পার্বতী। উমার মতোই পরমাসুন্দরী। বয়সের তফাত বিশ বছরের। মালা শুধু রূপসি নয়–গুণবতীও। রেডিও, মিউজিক কনফারেন্স, ছায়াছবি সব মহলে সে নাইটিঙ্গেল আখ্যা পেয়েছে তার সুরেলা কণ্ঠের জন্যে। মালা মন দিয়ে গান গাইলে শুকনো আকাশে বৃষ্টি ঝরতে পারে–মোমবাতিতে আগুন লাগতে পারে।
এ-সব অবশ্য স্তাবকদের প্রশস্তি। মালা মিত্র ভ্রূক্ষেপ করে না। বাসু মিত্র নাকি তার গান শুনেই বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এখন শোনেন না। মালার সঙ্গে সব দিন দেখাও হয় না…গবেষণা কক্ষে রাত কাটান।
আমি বিলেত ফেরত ডাক্তার। ব্রেন স্পেশালিস্ট। বিলেতে থাকতেই কয়েকটা পেপারে তার প্রবন্ধ পড়েছিলাম। মানুষের মস্তিষ্ক আজও চিররহস্যে ঘেরা। তিনি সেই মস্তিষ্ক নিয়েই গবেষণা করছেন। ফিংগার প্রিন্ট আর ব্রেনপ্রিন্ট–দুটো দিয়েই নাকি ক্রিমিন্যাল ধরা যায়। ফিংগারপ্রিন্ট যেমন অপরাধীদের সনাক্ত করে–ব্রেনপ্রিন্টও তেমনি ব্রেনের গন্ডগোলের খবর দিতে পারে।
পশ্চিমের প্রেসে ডক্টর বাসু মিত্রকে নিয়ে তাই কার্টুন আর ব্যঙ্গ বেরিয়েছিল। ব্রেন ডিটেকটিভ–এই আখ্যা পেয়েছিলেন তিনি। দেশে ফেরার পর সুযোগমতো গেলাম তার বাড়ি। আলাপ করলাম। এবং দুটি জিনিস ভালো লাগল।
একটি তার টপোস্কোপি–অর্থাৎ বাইশটা টেলিভিশন সমন্বিত ব্রেন ডিটেকটিভ মেশিন। দ্বিতীয়টি মালা মিত্র।
বাসু মিত্রের বাড়ি যাওয়া বেড়ে গেল এরপর থেকে টপোস্কোপির জন্যে নয়–মালার জন্যে। মালার গান শুনতে, ওর সঙ্গে কথা বলতে। বাসু মিত্রের সঙ্গে অর্ধেকদিন দেখাই হত না। উনি গবেষণাকক্ষে বসে টপোস্কোপি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ব্রেনের ইলেকট্রিক্যাল রিকে উনি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক মেশিনের মধ্যে দিয়ে এনে ইলেকট্রন গ্যাজেটের ভেতরে চালান করে ফ্ল্যাশ আর সাউন্ডে রূপান্তর করতে পেরেছেন। এখন চাইছেন চিন্তা অর্থাৎ বায়োর্যাডিয়েশনকে যন্ত্রের মধ্যে টেনে আনতে।
আমি ব্রেন স্পেশালিস্ট বলেই বুঝেছিলাম, আবিষ্কারটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার ব্রেন তখন অন্য বিষয়ে নিমগ্ন–মালা একটু-একটু করে যেন আমাকে সম্মোহিত করে ফেলছিল। আমি বিলেতে দশবছর ছিলাম। বহু মেয়ের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু মালার মতো কেউ আমাকে এভাবে আকর্ষণ করেনি। ও যখন হাসত মনে হত যেন দুচোখে দুটো জোনাকি জ্বলছে–ওর সমস্ত রূপ জড়ো হয়েছিল আশ্চর্য সুন্দর বুদ্ধি উজ্জ্বল ওই দুটি জোনাকি চোখের মধ্যে। সে চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না–মনে হয় একজোড়া ফিল্ড বাইনাকুলার আমার মনের অন্তস্থল পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে।
মালাও দেখেছিল। মালা আমার মন বুঝেছিল। কিন্তু আমি বুঝিনি। আমিও মালাকে দুর্বারভাবে টেনেছি আমার দিকে। আমি লেডি কিলার নই। কিন্তু লোকে বলে আমি হ্যান্ডসাম, স্মার্ট, টল। তারপর ব্যাচেলর। সেইজন্যেই কি মালা ওর জোনাকি চক্ষু দিয়ে বশ করল আমাকে? না, কদাকার বাসু মিত্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটা অবলম্বনই শুধু চেয়েছিল? সে প্রশ্নের জবাব আজও পাইনি।
মন জানাজানি কিন্তু একদিনে হয়নি। আমরা দুজনেই পূর্ণবয়স্ক। অথচ যে অন্ধ আবেগ, প্রচণ্ড আকর্ষণ, অপরিসীম শূন্যতা বুকের মধ্যে বহন করতাম সারাটা দিন–তা কিশোর বয়সেই মানায়। কিন্তু প্রেম বয়স মানে না, স্থান-কাল-পাত্রের তোয়াক্কা করে না। তাই প্রেম দরিয়ায় পুরোপুরি হাবুডুবু খেয়ে গেলাম বিজ্ঞান সাধক বাসু মিত্রের রূপসি যুবতী সঙ্গীত সাধিকা স্ত্রীর সঙ্গে।
যে দিনের কথা বলছি, সেদিন ডক্টর মিত্র আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। টপোস্কোপি নাকি শেষ হয়ে এল। আমি যেন একবার এসে দেখে যাই। খবরটা মুচকি হেসে দিল মালা। গাল টিপে দিয়ে বললে, যাও, খেলাঘরে খেলা করে এসো।
মালা ডক্টর মিত্রের ল্যাবোরেটরিকে বলত খেলাঘর। আর, স্বামীদেবতাকে বলত বুড়ো খোকা। এটুকু বুঝতাম, মালা হাঁপিয়ে উঠেছে। ওর জগৎ অন্য রুক্ষ নীরস তাপসের সঙ্গে গ্রন্থিতে আবদ্ধ থাকলে তার চলে না। তাই মুক্তি চায়। গত পূর্ণিমায় গঙ্গার পাড়ে বসে আমার কাঁধে কাঁধ রেখে বিশাল চাঁদের পানে চেয়ে বলেছিল ফিসফিস করে, পারবে না আমাকে নিয়ে যেতে? অনেক দূরে…যেখানে কেবল গান আর গান…বিজ্ঞান নেই, মেশিন নেই, অঙ্ক নেই?
গাঢ় কণ্ঠে বলেছিলাম, পারব, মালা।
বাইশটা টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম সেদিনের কথা। মালা নিউমার্কেটে গেছে। ডক্টর মিত্র আমাকে বসতে বলে লাইব্রেরিতে গেছেন। আমি বসে বসে ভাবছি সেদিনের কথা। সেদিন মালা আমার অনেক কাছে এসেছিল…অনেক…অনেক কাছে।
পায়ের আওয়াজ পেলাম। ঘরে ঢুকলেন বাসু মিত্র। কুঁজো হয়ে থাকার দরুন ভদ্রলোকের চাউনির ধরনটা অদ্ভুত। তীক্ষ্ণ চোখে আমার পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর অদ্ভুতভাবে হেসে বললেন, দিবাস্বপ্ন দেখছিলেন বুঝি?
চমকে উঠলাম। পরক্ষণেই জোর করে মুখে হাসি টেনে এনে বললাম, না, না, আপনার মেশিনগুলোর কথা ভাবছিলাম।
সারি-সারি প্যানেল বসানো অদ্ভুতদর্শন টপোস্কোপির পানে উদাস চোখে তাকিয়ে রইলেন বাসু মিত্র। আবার চোখের তারায় দেখলাম সুদূরের সেই স্বপ্ন।
আবার সেইরকম বিচিত্র হেসে বললেন, হ্যাঁ, আজব মেশিন। ব্রেন ডিটেকটিভ। তাই না?
