বললেন, মরার সময়ে আমি কী অনুভব করছিলাম জানেন? শুনলে বিশ্বাস করবেন না। বিস্ময়সীমাহীন বিস্ময়বোধে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম।
মাথায় চোট পাওয়ায়?
ঝুঁকে পড়লেন ফাদার। বললেন খাটো গলায়, মাথায় চোট না পাওয়ার জন্যই অবাক হয়েছিলাম।
চেয়ে রইলেন নান্দুরাম। ভাবলেন, চোট-টা নিশ্চয় তেমন জোরদার হয়নি। বললেন, কী বলতে চান?
বলতে চাই যে, লোকটা অত জোরে মুগুর নামিয়ে আনল মাথা টিপ করে, কিন্তু মুগুর থেমে গেল মাথার কাছে এসে খুলিতে ছোঁয়া পর্যন্ত লাগল না। একইভাবে আর একজন ছোরা মারল বটে, কিন্তু ছোরার ডগা আমার গা স্পর্শ করল না। ঠিক যেন খেলার ছলে খুনজখম করা। হ্যাঁ, ঠিক তাই। অসাধারণ ব্যাপারটা ঘটল ঠিক তার পরেই।
চিন্তাবিষ্ট চোখে টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্রের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফের মুখ খুললেন ফাদার, মুগুরের চোট, ছোরার কোপ–কোনওটাই গায়ে লাগল না। অথচ টের পেলাম আমার হাঁটু ভেঙে যাচ্ছে, প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। চোট খেয়েই প্রাণটা বেরিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝলাম। তবে সেটা মুগুর বা ছোরা নয়। কোনও অস্ত্র নয়, জানেন কী?
এই বলে দেখালেন টেবিলে রাখা মদ।
মদের বোতল তুলে নিলেন নান্দুরাম। গন্ধ শুঁকলেন।
বললেন, মনে হচ্ছে আপনি ধরেছেন ঠিক। ড্রাগিস্ট-এর কাজ করেছিলাম আমেরিকায় বছর খানেক। কেমিস্ট্রি পড়েছিলাম। অ্যানালিসিস না করে সঠিক বলতে পারব না, শুধু বলব, অস্বাভাবিক কোনও উপাদান রয়েছে এই মদের মধ্যে। আফ্রিকার জঙ্গলের মানুষরা একরকম আরকের খবর রাখে, যা মৃত্যুর মতো সাময়িক নিদ্রা এনে দেয়।
শান্ত গলায় বললেন ফাদার, কারেক্ট। যে কোনও কারণেই হোক, একটামির্যাকল ঘটানো হয়েছে। যা বিলকুল ধাপ্পাবাজি। অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার দৃশ্য নাটক ছাড়া কিছু নয়। ঘড়ি ধরে কাজ করা হয়েছে। সাংবাদিক ইন্দ্র পাবলিসিটির বাহবা পেতে-পেতে মাথা খারাপ করে ফেলেছেন বলেই মনে হয় আমার। তবে শুধু এই কারণে এতদূর উনি যেতে পারবেন বলে মনে হয় না আমার। একবার আমাকে জাল শার্লক হোমস হিসাবে ওয়ার্ল্ড পাবলিসিটি দিয়েছেন। আবার
বলেই থেমে গেলেন। যেন দম আটকে এল। টলতে টলতে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।
ব্যাকুল গলায় বললেন নান্দুরাম, যাচ্ছেন কোথায়?
প্রার্থনা করতে।
হঠাৎ এই সময়ে?
সমাধানটা ঈশ্বর আমার মাথায় খেলিয়ে দিলেন বলে। যাই–
দাঁড়ান। সমাধানটা কী?
ওই যে বলছিলাম, জাল শার্লক হোমসের কথা। শার্লক হোমস আর সাংবাদিক ইন্দ্র– এই নাম দুটো পাশাপাশি মাথায় আসতেই পরমপিতা সত্যের ঝলক ঘটালেন মগজের মধ্যে। উঃ। কী বোকা আমি।
বলুন। আমাকে বলে যান।
আমাকে শার্লক হোমসের কায়দায় মরিয়ে বাঁচিয়ে তোলার গল্পের কথা মনে পড়ছে? আইডিয়াটা সাংবাদিক ইন্দ্র মাথায় এনেছিলেন তখনই। মরে বেঁচে উঠব আমি শার্লক হোমসের মতো। আরক মিশোনো মদ খাওয়ানো হয়েছিল ঘড়ি ধরে–মড়ার বেঁচে ওঠার সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল ঘড়ি ধরে। কী বুঝলেন?
মাথা নাড়তে নাড়তে নান্দুরাম বললেন, হ্যাঁ, এবার বুঝছি।
মিরাকলের খবর বোমা ফাটাত গোটা দুনিয়ায়। তারপরেই মিরাকল-এর জালিয়াতি ধরিয়ে দেওয়া হত। প্রমাণ করে ছাড়ত, ষড়যন্ত্রে রয়েছি খোদ আমি–ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডল। আর-এক দফা পাবলিসিটি অভিযানে জগৎ ছেয়ে যেত–খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছে যেতেন সাংবাদিক ইন্দ্র।
সোজা চোখে তাকালেন নান্দুরাম, আর কটা নরপশু আছে এই ষড়যন্ত্রে?
আলভারেজ তো বটেই, ভুয়োমির্যাকল প্রমাণ করতে পারলে তার পোয়াবারো।
আর?
রঞ্জুলাল। ওঁর ভাড়ামি আর ভণ্ডামি অনেক আগেই আঁচ করেছিলাম। ওঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের কাটা ছিলাম আমি।
এতগুলো বাজে লোকের সঙ্গে এখানে থাকতে চান? চলুন আমার সঙ্গে আমেরিকায়।
তৎক্ষণাৎ মদের বোতলের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন ফাদার ঘনশ্যাম, তাহলে এক গেলাস খাই?
(বিদেশি ছায়ায়)
* স্বস্তিকা পত্রিকায় প্রকাশিত (পূজা সংখ্যা, ১৪০৩)
ব্রেন ডিটেকটিভ
বাইশটা টেলিভিশন আমার সামনে অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো রয়েছে। রাডারও বলা চলে। এদের কাজই নাকি তাই। বায়োর্যাডিয়েশন অর্থাৎ চিন্তাকে লুফে নিয়ে ফুটিয়ে তোলা পরদার বুকে। দেখানো রঙের খেলা। সেই সঙ্গে উত্তাল সঙ্গীত।
ঘরটা বেশ বড়ই। ডক্টর বাসু মিত্রের গবেষণা কক্ষ। ঘরভরতি মেশিনের সব মেশিন আমি নিজেও চিনি না। যদিও আমি ডাক্তার, ইলেকট্রো-এনকেফালোগ্রাফি চার্টটা চিনতে পারছি। কিন্তু তার পাশে যেসব কিম্ভুতকিমাকার মেশিন পরিপাটিভাবে সাজানো, তাতে শয়ে-শয়ে রেডিও টিউব দেখতে পাচ্ছি। শয়ে-শয়ে প্যানেলও রয়েছে ঘরময়। দেখেশুনে হঠাৎ মনে হবে বেশ কয়েকজন সুদক্ষ অপারেটর দরকার এসব মেশিন চালানোর জন্যে।
কিন্তু মনে হওয়াটা যে মিথ্যে, তা একদিন কাজের সময়ে ঘরে ঢুকলেই বোঝা যাবে। টাকমাথা প্রৌঢ় ডক্টর বাসু মিত্র একাই অপারেট করেন যাবতীয় মেশিন। বহু মেশিন তিনি নিজে বানিয়ে নিয়েছেন। ভদ্রলোক কদাকার। ছেলেবেলায় পড়ে গিয়ে পিঠ বেঁকে গিয়েছিল–সেই থেকে কুঁজো। মুখে অজস্র আব–হঠাৎ দেখলে ভয় হয়। আব ঝুলছে হাত থেকে, ঘাড় থেকে, কপাল থেকে, চিবুক থেকে। আবের জঙ্গলের মধ্যে চোখ জোড়া কিন্তু আশ্চর্য সুন্দর। স্বপ্নময়, উদাস এবং আত্মনিমগ্ন।
