আলো ফোঁটার আগেই কফিনে শোয়ানো হল ফাদারকে। তার মুখের বিস্ময় বোধ প্রকৃতই রহস্যবহ। আততায়ীদের অন্য কেউ না জানলেও, ফাদার ঘনশ্যাম নিশ্চয় চিনতে পেরেছিলেন। তাই অত অবাক হয়েছিলেন। আলভারেজ কিন্তু কফিনের কাছেই দাঁড়িয়ে গলাবাজি করে গেলেন সমানে। এ খুন তিনি করেননি। তার দলের কেউ করেনি। খুনিকে পাওয়া গেলে তিনি নিজের হাতে তাকে ফাঁসিতে লটকাবেন।
মিশন-হাউসের মস্ত ক্রসের তলায় রাখা হয়েছে কফিন। একটু উঁচু জমিতে, তিনদিকে সবুজ ঝোঁপ, সামনের দিকে কিছু নেই, তাই রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে কফিন। কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে গেছে রাস্তায়। তাদের চোখ ছলছল করছে। পিতৃহারা হওয়ার শোকে আচ্ছন্ন প্রত্যেকেই। একদম বোবা। কোথাও নেই কোনও শব্দ। এমনকী আলভারেজও আর তড়পাচ্ছেন না।
অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে, আর সময় নেই দেখে রঞ্জুলাল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। টাইট গোল শরীরের গলা দিয়ে যতখানি আওয়াজ বের করা সম্ভব, ততখানি আওয়াজ ছেড়ে বললেন-কে খুন করেছে ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডলকে? তাকে দুচক্ষে দেখতে পারত না যে লোকটা–খুন করেছে সে।
আর যায় কোথা। এতক্ষণ যে আম জনতা গলা বুজিয়ে ছিল, অট্টরোলে ফেটে পড়ল তারা। তাদের ক্ৰোধারুণ চোখ ঝলসে ফেলছে একজনকেই–আলভারেজকে।
বীর-শরীরী আলভারেজ যেন এইরকম একটা মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। নিমেষে তার চেহারা গেল পালটে। আফ্রিকার অরণ্যের জঘন্য জিঘাংসা আশ্রয় করল তার সমস্ত মুখাবয়ব। রক্তলাল পরিচ্ছদের মতনই লাল টকটকে হয়ে উঠল দুই চক্ষু। সাত ফুট লম্বা শরীরটা ফুলে যে ডবল হয়ে গেল এবং মনে হল, আদিম বর্বরতা যদি কোথাও থাকে, তবে তা এখানে, এই দেহে।
গলা চিরে বেরিয়ে এল নারকীয় হুঙ্কার–খবরদার। ফাদারকে খুন করেছে খোদ ভগবান। যদি বিশ্বাস থাকে ভগবানে। কিসসু নেই। এই ব্রহ্মাণ্ডে ভগবান-টগবান কেউ নেই। থাকলে মরতে হত না নিরীহ মানুষটাকে।
ওই একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট। তৎক্ষণাৎ জনগণের অট্টনিনাদ হল স্তব্ধ। এইবার নিশ্চয় শোনা যাবে গুলিগোলার আওয়াজ। কিন্তু তা হল না।
নৈঃশব্দ্য খান-খান করে দিয়ে বিষম বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন সাংবাদিক ইন্দ্র, ফাদার নড়ছেন।
বাতাস পর্যন্ত বুঝি থেমে গেল এই কথায়। নিথর হল গাছের পাতা।
কফিনের ওপর ঝুঁকে পড়েছেন ডাক্তার যোশী। দেখলেন, ফাদারের মুখ পাশ ফিরেছে।
তারপরেই নান্দুরাম দেখলেন, ফাদার চোখ পিটপিট করছেন। গুঙিয়ে উঠছেন। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে বসে কুতকুতে চোখে জ্বলজুল করে তাকিয়ে আছেন ডাক্তার যোশীর দিকে।
জীবনে অনেক ইলেকট্রিক্যালমির্যাকল দেখেছেন এবং দেখিয়েছেন নান্দুরাম, কিন্তু এইমির্যাক কখনও দেখেননি। কোনও বিজ্ঞানের ক্ষমতা নেই এরকম মিরাকল দেখায়। অসম্ভবকে প্রত্যক্ষ করা কাকে বলে, সেই প্রথম তিনি জানলেন। হাজার বছরেও যা দেখা যায় না, তা দেখবার জন্য আধঘণ্টার মধ্যে ভেঙে পড়ল গোটা শহরের মানুষ। ঈশ্বরকে সশরীরে ধরায় অবতীর্ণ হওয়া বুঝি একেই বলে। হাজার-হাজার লোক উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সামনের রাস্তায়। এমন অলৌকিক ঘটনা কে কবে দেখেছে? এমনকী আলভারেজের মতো পাষাণ হৃদয় মানুষেরও মাথা ঘুরে গেল। দু-হাতে রগ টিপে ধরে তিনি ঘাসের ওপর বসে পড়লেন।
স্বর্গসুখের এহেন টর্নাডোর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা খর্বকায় ব্যক্তিটার কোনও কথাই শোনা গেল না। একে তো তিনি চেঁচিয়ে কথা বলতে পারেন না, তার ওপর মরে বেঁচে ওঠার ধকলে তাঁর কণ্ঠস্বর ক্ষীণতর হয়েছে। হট্টগোলও কর্ণবধিরকারী। তার দুর্বল অঙ্গভঙ্গি দেখে শুধু বোঝা যাচ্ছে, তুমুল এই হর্ষ তাঁর চিত্তে বিলক্ষণ বিরক্তি উৎপাদন করছে। জনতার সামনে উঁচু জমিতে এসে দুহাত নেড়ে উত্তাল জনগণকে শান্ত করবার বৃথা চেষ্টা করে চলেছেন–হাত নাড়া দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা পেঙ্গুইন পাখনা ঝাঁপটাচ্ছে। উদ্দামতা একটু স্তিমিত হতেই গলা চড়িয়ে, তাঁর পক্ষে যতখানি রাগ দেখানো সম্ভব, ততখানি রাগ দেখালেন, আঃ! কী হচ্ছে!
পরক্ষণেই ঘুরে দাঁড়ালেন সাংবাদিক ইন্দ্রর দিকে। বললেন, এখুনি এই মুহূর্তে ফ্যাক্স করে গোটা পৃথিবীতে আসল খবরটা ছড়িয়ে দিন।
মির্যাকল? মিনমিন করে বুঝি জীবনে এই প্রথম কথা বললেন সাংবাদিক ইন্দ্র।
না, না, না। ঠিক উলটো। এখানে কোনও মিরাকল ঘটেনি। আমি মিরাকল ঘটাতে পারি না।
ঢোক গিললেন সাংবাদিক ইন্দ্র। অধোবদনে নেমে গেলেন ফ্যাক্স মেশিনের সন্ধানে।
নান্দুরাম বললেন, ফাদার, আপনার সঙ্গে কথা আছে।
কুতকুতে চোখে তাকিয়ে গোলমুখে বোকা-বোকা ভাব ফুটিয়ে বললেন ফাদার ঘনশ্যাম, কী কথা?
কৌতূহল।
চলুন।
ওঁরা এখন বসে আছেন গিঞ্জের আচার্যর ঘরে। কাগজপত্র যেভাবে গতকাল ছড়িয়ে গেছিলেন ফাদার, রয়েছে সেইভাবেই। পাশেই ওষধি সুরার বোতল এবং শূন্য গেলাস।
গম্ভীর বদনে বললেন ফাদার, কীসের কৌতূহল?
নান্দুরাম বললেন, মরে বেঁচে উঠলেন কীভাবে?
ফাদার বললেন, জীবনে বেশ কিছু মার্ডার কেসের সমাধান ঘটিয়েছি। এবার তদন্ত হবে আমার নিজের মার্ডারের।
নান্দুরাম বললেন, যদি কিছু মনে না করেন, বোতল থেকে ঢেলে একটু মদ খাব?
উঠে দাঁড়ালেন ফাদার ঘনশ্যাম। গেলাসে সুরা ঢাললেন। গেলাস চোখের সামনে এনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর গেলাস নামিয়ে রেখে ফের চেয়ারে বসলেন।
