চারপাশ দেখলেন। উপলব্ধি করলেন, তিনি একা নন। ছাড়িয়ে এসেছেন শহরের শেষ বাড়ি। বেশিরভাগ বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। জানলার পাল্লাও অনেক বাড়িতে খোলা নেই। উনি হেঁটে চলেছেন দুটো দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে। এবড়োখেবড়ো আর বড়-বড় পাথর দিয়ে তৈরি। পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে গজিয়েছে গোছা-গোছা কাটা ঝোঁপ। দেওয়াল দুটো সমান্তরালভাবে প্রসারিত ফটকের দিকে। ফটকের ওদিকে কফি হাউসের আলো দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয় অনেক দূরে রয়েছে। ফটকের নিচে কী রয়েছে, তাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু বোঝা যাচ্ছে, বড়-বড় পাথর দিয়ে মেঝে বাঁধাই করা হয়েছে। চাঁদের আলো ঠিকরে যাচ্ছে সেই পাথর থেকে। এখানে সেখানে রয়েছে এলোমেলো ন্যাশপাতি গাছ। দেখেই অশুভ সংকেতের ডংকা বাজল তার মনের মধ্যে। অদ্ভুত একটা চাপ অনুভব করলেন। কিন্তু পা থামালেন না। একটুও থমকে দাঁড়ালেন না। সাহস তাঁর আছে। সাহসকে ছাড়িয়ে যায় তার কৌতূহল। সারাজীবন কাটিয়েছেন সত্যের অন্বেষণে, ক্ষুধিত বুদ্ধিসত্তা দিয়ে মিথ্যের বিনাশ ঘটিয়েছেন। সত্যানুসন্ধান যত তুচ্ছ ব্যাপারেই হোক না, কৌতূহল চরিতার্থ করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাকে বিপদের দিকে টেনে নিয়ে যাবে জেনেও পেছিয়ে আসেননি। তবে মাত্রা ছাড়িয়ে যাতে না যায়, সেদিকে খরনজর রেখেছেন। নিজেকেও সেই অজুহাতে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছেন। এক্ষেত্রে তার অন্যথা ঘটল না। সোজা হেঁটে গেলেন পাম গাছের দিকে। গাছের ওপর থেকে লাফিয়ে এসে একটা লোক ছোরা মারল তাকে। একই সময়ে বানরের ক্ষিপ্রতায় পাঁচিলের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ধেয়ে এল একটা লোক। সে উঁচিয়ে রয়েছে একটা কাঠের মুগুর। ছোরা মারার সঙ্গে-সঙ্গে মুগুরও নেমে এল তার মাথার ওপর। ফাদার ঘনশ্যাম একপাক ঘুরে গিয়ে টলে উঠলেন এবং মালভর্তি বস্তার মতো ধপ করে পাথরের মেঝেতে পড়ে গেলেন। পড়ে যখন যাচ্ছেন, তখন তার মুখের পরতে-পরতে ফুটে উঠল মৃদু কিন্তু নিবিড় বিস্ময়বোধ।
নান্দুরাম ঠিক এই সময়ে জানলায় দাঁড়িয়েছিলেন। ভদ্রলোক ধর্মে খ্রিস্টান কিন্তু চার্চে যান না। তবে যে-কোনও কারণেই তোক সমীহ করেন ফাদার ঘনশ্যামকে। এই শহরেই তাঁর জন্ম। শিক্ষাদীক্ষা আমেরিকায়। পেশায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। কাজ কারবারও করেন আমেরিকায়। পয়সাকড়ি আছে, নাম-যশ আছে, তাই আলাপ পরিচয় আছে সাংবাদিক ইন্দ্র, ব্যবসায়ী কিন্তু ধার্মিক রঞ্জুলাল আর নাস্তিক শিরোমণি আলভারেজের সঙ্গে। তিনি এক বিচিত্র চরিত্র। বৈচিত্র্য-পিয়াসী বলেই ফাদার ঘনশ্যামকে ভালোবাসেন।
এহেন মানুষটাকে কালো কুমড়োর মতো ছাতা বগলে জানলার সামনে দিয়ে এমন সময়ে হেঁটে যেতে দেখে তিনি অবাক হলেন। চাঁদের আলোয় চকচকে ওই টাক, ওইরকম বিচ্ছিরি আলখাল্লা আর ভাঙা ছাতা বগলে যাচ্ছেন কোথায় ফাদার?
চোখ ছিল তার জানলার দিকে। তাই পরক্ষণেই দেখলেন আরও দুটো মনুষ্যাকৃতি হনহনিয়ে চলে গেল তার জানলা পেরিয়ে। কঁকড়া চুলো খর্বকায় মানুষটাকে এক ঝলকেই চেনা গেল– মদ্য প্রস্তুতকারক সুরজলাল। কিন্তু তার পাশে ঢ্যাঙা বৃষস্কন্ধ ও লোকটা কে?
হুমড়ি খেয়ে জানলায় পড়লেন নান্দুরাম। পেছন থেকে বৃষস্কন্ধ ব্যক্তিকে চিনতে পারলেন। ডাক্তার যোশী। রঙুলালের ব্লাডপ্রেসার দেখতে গেছিলেন যখন তখন আলাপ হয়েছিল নান্দুরামের সঙ্গে।
ঠিক এই সময়ে আর্ত চিৎকার শুনলেন ফটকের দিক থেকে। ধপ করে একটা আওয়াজ। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে অনেক লোকের চিৎকার। হট্টগোল।
নান্দুরাম বেগে নামলেন পথে। দৌড়লেন চন্দ্রালোকিত ফটকের দিকে। দেখলেন, ঠিক নিচেই লম্বমান কালো বস্তাবৃত একটা খুদে দেহ। ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডল। তিনি নড়ছেন না।
কফি হাউস থেকে দৌড়ে এসেছে অনেক লোক। এসেছেন স্বয়ং আলভারেজ। তিনি ফাদারের বডির কাছে কাউকে আসতে দিচ্ছেন না। এই মুহূর্তে তার পরনে রয়েছে রক্তরাঙা সফরি স্যুট। মাথার লম্বা সোনালি চুলে চাঁদের আলো ঠিকরে দিচ্ছে সোনালি আভা। মাথায় তিনি কম করেও সাত ফুট। সেই অনুপাতে প্রস্থেও বিশাল। রাজ সেনাপতির মতো খানদানি বন্ধু নিয়ে তিনি দুদিকে দুহাত বিস্তার করে জনগণকে রুখে দিচ্ছেন। নিরক্ত মুখে পাশে দাঁড়িয়ে সুরজলাল। নান্দুরাম যখন হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে পৌঁছলেন, তখন ফাদারের নাড়ি দেখা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে আখাম্বা চেহারার ডাক্তার যোশী বললেন একটাই কথা, ডেড।
সন্ত্রাসবাদীরা শেষ করে দিল একটা ভালো মানুষকে, উৎফুল্ল গলায় বললেন আলভারেজ, আমি কিন্তু মারিনি, তোক দিয়েও মারাইনি। যদি সেরকম লোক ধরা পড়ে, এই মুহূর্তে তাকে লটকে দেব এই গাছে।
নান্দুরাম বললেন, আপনি কোথায় ছিলেন?
কফি হাউসে। ফাদারের জন্য বসেছিলাম। গোপন মিটিং ছিল জরুরি বিষয়ে। সুরজলাল আর ডাক্তারকে দেখিয়ে বললেন, এঁরাও যাচ্ছিলেন মিটিং-এ।
গাছের ছায়া থেকে ফ্যাকাশে মুখে বেরিয়ে এলেন সাংবাদিক ইন্দ্র, সর্বনাশ হয়ে গেল। গোটা পৃথিবীর ক্ষতি হয়ে গেল। ফাদার ঘনশ্যাম ইজ ডেড।
রঞ্জুলাল এলেন দৌড়তে-দৌড়তে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, বললেন ডাক্তারকে, সিওর ডেথ?
হানড্রেড পারসেন্ট।
তাহলে ফাদারের ডেডবডি সরিয়ে নেওয়া হোক।
টলতে টলতে বাড়ি ফিরে এলেন নান্দুরাম। ঝিম মেরে বসে রইলেন ঘরে। ফাদারের সঙ্গে তার দোস্তি তেমন প্রগাঢ় না থাকলেও লোকটার বোকা বোকা চেহারা আর ভালো ভালো কাজগুলো তাঁর ভালো লাগত। এমন একটা মানুষকে খতম করে দিয়ে গেল চণ্ডালরা। ঘরে বসেই শুনলেন, রাত ভোর হওয়ার আগেই কবরস্থ হবেন ফাদার ঘনশ্যাম। খবরটা দিয়ে গেলেন সাংবাদিক ইন্দ্র। কারণ, ভয়ানক দাঙ্গা লাগবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঝটপট ডেডবডি মাটির নিচে চালান করে দিতে হবে। মিশন-হাউসে লোক জড়ো হচ্ছে।
