যথা নিয়মে কাকুতি-মিনতি তেড়ে এল ফাদার ঘনশ্যামের দিকেই। কেন তিনি বিশ্ববরেণ্য শার্লক হোমসের অনুকরণে সাময়িকভাবে লোকচক্ষু থেকে অদৃশ্য হচ্ছেন না?
দাবির পর দাবি। দাবির পর দাবি। হেদিয়ে উঠেও অপরিসীম ধৈর্য সহকারে প্রতিটি দাবির জবাব লিখে জানিয়ে দিলেন ফাদার ঘনশ্যাম, সাময়িকভাবে নিজেকে অন্তর্ধান করানোর বিকল্প প্রস্তাবে জানালেন তাকে নিয়ে লেখা গল্পগুলো সাময়িকভাবে অন্তর্ধান করলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। তিনি নিজে অন্তর্হিত হবেন কি না হবেন–সেটা নির্ভর করছে গল্পগাছার তিরোধানের ওপর। দিনে দিনে জবাব দেওয়া তিনি কমাতে লাগলেন। জবাবের বয়ানও দিনে দিনে সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর হতে লাগল। শেষ জবাবটা লেখবার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
আমেরিকা জুড়ে যখন কোনও হইচই আরম্ভ হয় তখন তার রেশ এসে পড়ে এই পোড়া দেশে। একেই বলে পশ্চিমী প্রভাব। সাদা চামড়া যখন নেচেছে কালো চামড়ার ফাদার ঘনশ্যামকে নিয়ে, তখন এখানেও শুরু হয়ে যাক হুজুগের নাচ। বিশেষ করে যে অঞ্চলটিতে ফাদার ঘনশ্যাম প্রায় লুকিয়ে থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে যাচ্ছিলেন প্রচার আর আড়ম্বর বাদ দিয়ে, ঠিক সেই জায়গাটাতেই হুদো-হুঁদো পর্যটকের আসা শুরু হয়ে গেল, শুধু গোটা ভারত থেকে নয়, আমেরিকা আর ইউরোপ থেকেও। পর্যটন ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো ঘটে গেল। ফাদার ঘনশ্যামের নামাঙ্কিত পথ নির্দেশক ফলক পুঁতে দেওয়া হল রাস্তার মোড়ে-মোড়ে। ফাদার ঘনশ্যামের নাম লেখা বিশেষ টুরিস্ট বাসও আসতে লাগল। দুর্গমতম সেই দ্বিতীয় ভূস্বর্গে। দলে-দলে মানুষ পিলপিল করতে লাগল ছোট্ট ওই জায়গায়। যেন কুতুবমিনার দেখতে ছুটছে। সবচেয়ে ঝামেলা বাধাল স্থানীয় দোকানদাররা। তাদের কেউ ফাদার ঘনশ্যামের মূর্তি বানিয়ে চড়া দামে বেচে লাল হয়ে গেল দু-দিনেই, কেউ বেচতে বসল তাবিজ-মাদুলি-লকেট। সবেতেই ঝুলছে ফাদার ঘনশ্যামের ছবি, নয়তো লেখা রয়েছে তার মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী। নাজেহাল হলেন আর এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের ধান্দাবাজিতে। অষ্টপ্রহর তারা হানা দিয়ে গেল গোবেচারা পাদরির ওপর একটা মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের বানানো দ্রব্যটার গুণের তারিফ করে দেওয়া হোক লিখিতভাবে। কোনও শংসাপত্রই যখন ছাড়া হল না ফাদারের তরফ থেকে, তখন আসতে লাগল চিঠির স্রোত। সবাই জানে ফাদার ঘনশ্যামের এই একটি দুর্বলতার সংবাদ সাহিত্যিক না হয়েও তিনি পত্র-সাহিত্যের সমাদর করেন। কারও মনে কষ্ট দেন না। চিঠি এলে চিঠির জবাব দেন। প্রথম-প্রথম তিনি পত্রদাতাদের উদ্দেশ্য ধরতে পারেননি বলে এন্তার জবাব দিয়ে গেছেন। তারপর জানলেন–তার সই-এর জন্যই এত চিঠি লেখা হচ্ছে, আর তাঁর অটোগ্রাফ চড়া দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানুষের এই অবস্থাই হয়। কাউকে ফেরাতে পারেন না, ফেরাতে পারেননি মদ্য প্রস্তুতকারক সুরজলালকে। খচমচ করে দুটো লাইন লিখে দিয়েছিলেন পুঁচকে একটা কার্ডে। আর এই লেখাটাই হল তার কাল। জীবনের মোড় ফিরিয়ে দিল বড় ভয়ংকরভাবে।
সুরজলাল মানুষটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অনর্থক বাড়াবাড়ি করেন। ছোটখাটো চেহারা, কঁকড়া চুল, চোখে সোনার রীমলেস চশমা। উনি একটা মেডিসিন্যাল পোর্ট মদ্য প্রস্তুত করেছিলেন। দাম খুবই কম রেখেছেন। গরিব-গেরস্তরা যাতে অসুখ-বিসুখ কাটিয়ে উঠে স্বচ্ছন্দে কিনে খেতে পারেন। ফাদার ঘনশ্যাম গরিবদের কাছে ভগবান সমান। তিনি যদি এই ওষধি-সুরা সামান্য চেখে দেখেন এবং তার মতামত জানিয়ে দেন, তাহলে আখেরে গরিবদেরই উপকার হবে। এরপরেও একটু আম্বা দেখালেন সুরজলাল। কখন এবং কোথায় বসে সুরা চাখবেন ফাদার ঘনশ্যাম তা যদি দয়া করে সংলগ্ন কার্ডটায় লিখে দেন, তাহলে চিরঋণী থাকবেন মদমেকার সুরজলাল।
আম্বা শুনে অবাক হলেন না ফাদার ঘনশ্যাম। বিজ্ঞাপনদাতাদের উকট উন্মাদনা কত দিকে মোড় নিতে পারে, তা তাঁর অজানা ছিল না। তাই তিনি কার্ডে যৎসামান্য লিখে দিয়ে হাতের কাজে মন দিলেন। যে কাজ করলে তিনি আনন্দ পান। কিন্তু বাধা পেলেন আবার। এবার চিরকূট পাঠিয়ে কাজে বাগড়া দিলেন যিনি, তিনি বাজে লোক নন। পাঠিয়েছেন তাঁর পলিটিক্যাল শত্রু আলভারেজ। গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ের মিটমাট করতে চান তিনি। মিটিং হোক আজকেই রাতে শহরের প্রাচীরের বাইরে একটা কফি হাউসে। ফাদার ঘনশ্যাম যদি রাজি থাকেন, এক লাইন লিখে বার্তাবাহকের হাতে যেন এখুনি পাঠিয়ে দেন। বার্তাবাহক লোকটা মার্কামারা দাঙ্গাবাজ টাইপের। যেমন চেহারা, তেমনি চাহনি। তাকে বিদেয় করার জন্য ঝটপট এক লাইনে সম্মতি জানিয়ে দিলেন ফাদার ঘনশ্যাম। তারপর দেখলেন, এখনও ঘণ্টাদেড়েক হাতের কাজ করা যাবে। সুতরাং তন্ময় হলেন সেই কাজে। ঘড়ি দেখে কাজ বন্ধ করলেন। কুতকুতে দুই চোখে কৌতুক ভাসিয়ে সুরজলালের পাঠানো অত্যাশ্চর্য ওষধি সুরার দিকে চেয়ে রইলেন, এক গেলাস পান করলেন এবং নিশার আঁধারে বেরিয়ে পড়লেন।
কড়া চাঁদের আলোয় ছোট্ট শহর ভেসে যাচ্ছে। ছবির মতো সুন্দর ফটকের ওপর বাঁকা খিলেনের দিকে চেয়ে রইলেন ফাদার। ফটকের ওদিকে রয়েছে আশ্চর্য বাহারি পাম গাছের ঝালর। ফোকাস মেরে যেন রঙ্গমঞ্চ সাজানো হয়েছে। খিলেনের অন্যদিকে ঝুলছে পাম গাছের খাঁজকাটা একটা পাতা। চাঁদ রয়েছে তার পেছন দিকে। এদিক থেকে মনে হচ্ছে যেন কালো কুমিরের চোয়াল। স্রেফ এই কল্পনায় তিনি আকৃষ্ট হতেন না যদি না তাঁর সহজাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে ফেলত আরও একটা ব্যাপার। বাতাস কোথাও নেই, সবই নিথর। অথচ স্পষ্ট দেখলেন, ঝুলে থাকা পামগাছের পাতা একটু-একটু নড়ছে।
