বললেন ফিকে হেসে, পাদরিদের মতো গড়ে উঠিনি আমি। তবে এটাও ঠিক যে পাদরিদের হাতে গড়বার ভার পুরো ছেড়ে দিলে, পাদরিজননাচিত হত না কিছুই।
হঠাৎ উৎফুল্ল হলেন সাংবাদিক ইন্দ্র–মিঃ রঞ্জুলাল, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় তো আগেই ঘটেছে। মনে পড়ছে? বম্বের ট্রেড কংগ্রেসে গেছিলেন?
মিঃ রঙুলালের মাংসল চোখের পাতা পাখা ঝাঁপটাল বারকয়েক। হাসলেন নিজস্ব ঢঙে। বললেন, মনে পড়েছে।
ঘণ্টা দুয়েক চলেছিল মিটিং। কাজ হয়েছিল অনেক। আপনিও অনেক বদলে গেছেন।
কপাল ভালো অমন জায়গায় যেতে পেরেছিলাম, রঞ্জুলাল বেশ বিনীত।
সৌভাগ্য তাদের কাছেই আসে সৌভাগ্যকে যারা লুফে নিতে পারে,–সোৎসাহে বলে গেলেন সাংবাদিক ইন্দ্র, কথায় বাধা দিচ্ছি না তো?
একদম না। রঞ্জুলালের জবাব, পাদরিসাহেবের কাছে হামেশা আসি স্রেফ দুটো কথা বলার জন্য–যা প্রাণে আসে, তাই বলে যাই কাজের কথা থাকে না।
ফাদার ঘনশ্যামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর অন্তরঙ্গতা সঞ্চারিত হয়েছিল সাংবাদিক ইন্দ্রর মধ্যেও। দেখতে-দেখতে নৈকট্যবোধ এসে গেল তিনজনের মধ্যেই। রকমারি আলোচনায় মুখর হলেন তিন পুরুষ। অচিরে সাংবাদিক ইন্দ্র উপলব্ধি করলেন, মিশন-হাউস ইত্যাদি ব্যাপারে তার পূর্ব ধারণাকে বেশি পাত্তা দেওয়া ঠিক হচ্ছে না সাদামাটা পাদরির সামনে। ইনি মুখে খই না ফুটিয়ে আর চেহারায় চমক না দেখিয়ে সমাজের যা মঙ্গল করে চলেছেন, তা অনেক বাক্যবীরের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজেই শেষকালে প্রস্তাব করলেন, ফাদার ঘনশ্যামের এত কিছু সুকর্ম, তিনি দেশময় প্রচার করতে চান তাঁর সুলেখনীর মাধ্যমে। আর ঠিক সেই কথার পরেই ফাদার ঘনশ্যাম বুঝলেন, সাংবাদিক ইন্দ্রর বৈরী আচরণ যদিও বা বরদাস্ত করা যায়, তার সহানুভূতির সুর তিনি সহ্য করতে পারছেন না।
সাংবাদিক ইন্দ্র কিন্তু এমন উপকরণ কি ছাড়তে পারেন? কোমর বেঁধে লেগে গেলেন। ফাদার ঘনশ্যামকে নিয়ে ফিচারের পর ফিচার লিখে গেলেন ইংরিজি আর বাংলা পত্রপত্রিকায়। উচ্চ প্রশংসায় ঠাসা সেইসব লেখা সাগরপাড়ের কাগজেও ছাপা হতে লাগল বিশেষ করে আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্য ছেয়ে গেল তার লেখালেখিতে। মিডলওয়েস্টের দেশগুলি উদগ্রীব হয়ে রইল ফাদার ঘনশ্যামের নতুন নতুন কাহিনি জানবার আশায়। খর্বকায় কুমড়ো আকৃতি ফাদারের নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ফটো তোলা হল দেদার এবং বিশাল ছবি ছাপা হয়ে যেতে লাগল যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রচারিত রবিবাসরীয় পত্রিকাগুলোয়। বেচারা ফাদার ঘনশ্যাম! প্রচারের দানবিক চাকার ঘূর্ণন বন্ধ করতে পারলেন না তিনি কিছুতেই। তার নিছক কথাগুলোকে তার বাণী বানিয়ে কাগজে-কাগজে ছাপিয়ে যেতে লাগলেন সাংবাদিক ইন্দ্র। ফাদার ঘনশ্যামের বাণী ফ্যালনা জিনিস নয়। বড়-বড় পোস্টার বানিয়ে বিক্রির ব্যবসাও জমে উঠল দেখতে-দেখতে। মোটা হরফের ওপর ফাদারের শ্রীহীন আকৃতি শোভা পেতে লাগল ঘরে-ঘরে। এরপর দেখা গেল, তার মুখের সামান্য কথা বাণীতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর স্লোগানে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মিছিলে সেই স্লোগান পাইকারি হারে কাজে লাগানো হচ্ছে। আমেরিকা ছাড়া অন্য দেশের মানুষের কাছে একসময় বড় একঘেয়ে লাগতে লাগল ফাদার ঘনশ্যামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে। কিন্তু আমেরিকা জাতটা আলাদা। ম্যাডাম ব্ল্যাভাটস্কি, কর্নেল অলকট, অ্যানি বেসান্ত প্রমুখ থিয়সফিস্টদের ধারণা অনুসারে মানুষ জাতটার বর্শাফলক এই আমেরিকান জাত– এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। নতুন কিছু পেলে তার সমাদর করতে তারা জানে। তাই তারা সাদর আমন্ত্রণ জানাল ফাদার ঘনশ্যামকে। বেশি কিছু না, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি স্টেটে যাবেন এবং একটি করে বক্তৃতা দেবেন। ফাদার ঘনশ্যাম সবিনয়ে সেই সব আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করলেন। পরিণামে তার সম্পর্কে আমেরিকান মানুষের শ্রদ্ধা দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হয়ে গেল। ফাদার ঘনশ্যাম নাকি এক বিস্ময়। আমেরিকায় বিনা পয়সায় বেড়াতে চান না যিনি, তিনি নিশ্চয় লোকাতীত ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং আরও লোভনীয় প্রস্তাবের পর প্রস্তাব আসতে লাগল তার কাছে। বেচারি ফাদার ঘনশ্যাম! ঠিক এই সময়ে গল্পের সিরিজ ছাপা হতে লাগল তাঁকে কেন্দ্র করে, শার্লক হোমস-এর গল্পের মতো। বলা বাহুল্য, এই জাতীয় গল্প লেখা আর ছাপানোর মূলেও সক্রিয় রইল সাংবাদিক ইন্দ্রর অত্যুৎসাহ। প্রায় সব গল্পের প্লটে অনুরোধ থাকছে একটাই–মহামান্য বুদ্ধিবর ফাদার ঘনশ্যাম যেন এই জটিল সমস্যাটার সমাধান করে দিয়ে যান শার্লক হোমস স্টাইলে। গল্পের স্রোত বাড়তে বাড়তে যখন মহানদী হতে চলেছে, অনুরোধ-উপরোধের ঢেউ যখন প্লাবন আকারে ফাদার ঘনশ্যামকে ভাসিয়ে দিতে চলেছে, যখন প্রত্যাখান করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন ফাদার, তখন তিনি একটাই অনুরোধ করেছিলেন– বন্ধ করো এইসব গল্প ছাপানো, প্রত্যাখ্যান করলেই যখন তা নব কলেবরে নতুন আমন্ত্রণ আকারে আবির্ভূত হচ্ছে, তখন দিলেন স্থগিতাদেশ, অবশ্যই বিনীত অনুরোধের মোড়কে পুরে।
সাংবাদিক ইন্দ্র এই পয়েন্টটা লুফে নিয়ে মোচড় দিলেন অন্যদিকে। গুজবের স্রোত বইয়ে দিলেন অন্য খাতে। ডক্টর ওয়াটসনের হিরো একদা সাময়িকভাবে পাহাড়চুড়ো থেকে যেভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল–ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডলও সেইভাবে সাময়িকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেই তো হয়।
