ঠিক এই সময়ে পাদরিসাহেব স্বয়ং বেরিয়ে এলেন মিশন-হাউসের বাইরে। নিতান্ত দীনহীন পোশাকে। প্রায় ছুটতে ছুটতে এলেন। তাঁর মাথায় নেই স্বর্ণকিরীট, অঙ্গে নেই মহার্ঘ বস্ত্র। চালচলন মর্যাদাব্যঞ্জক নয় মোটেই। বরং তার বিপরীত। গগন থেকে খসে পড়া ধরণী-সম্রাট মনে হওয়া দূরে থাক, প্রথম দর্শনেই তাকে নিতান্ত হাঘরে মানুষ বলে মনে হয়। অন্যের ব্যবহার করা কালো আলখাল্লায় মোড়া যেন একটা বেঢপ বান্ডিল। মাথায় মুকুট- ফুকুটের বালাই নেই। চকচক করছে টাক। হোঁকা আকৃতি নিয়ে তিনি বিষম বেগে বেরিয়ে নিস্পন্দ ধূমপায়ীদের কী যেন বলতে গেলেন, কিন্তু আগন্তুককে দেখেই দ্রুতস্বরে বললেন–
আরে! আরে! বলুন কীভাবে সাহায্য করতে পারি। ভেতরে আসতে পারেন–স্বচ্ছন্দে।
ভেতরে এলেন সাংবাদিক ইন্দ্র। বিবিধ বিষয়ে তার জ্ঞানবৃদ্ধিও ঘটতে লাগল তখন থেকে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, পূর্ব ধারণার চাইতে শক্তিশালী ছিল ভদ্রলোকের সাংবাদিক-কৌতূহল আর সহজাত প্রবৃত্তি। সেয়ানা সাংবাদিকদের যা অবশ্যই থাকে। প্রচুর প্রশ্ন করে গেলেন। জবাব শুনে চমৎকৃত হলেন। আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেল। যা ছিল তার বক্তৃতার পাদদেশে–অর্থাৎ কেলে মর্কট মানুষগুলো লিখতে জানে না, পড়তেও জানে না–এই ব্যাপারেই আবিষ্কৃত করলেন যে তথ্য, তা তাঁর পূর্ব ধারণা নস্যাৎ করে ছাড়ল। এরা সবাই দিব্বি লিখতে পারে, চমৎকার পড়তে পারে। কারণ একটাই। বেঢপ চেহারার এই পাদরি নিজে তাদের লিখতে পড়তে শিখিয়েছেন। কিন্তু কেউই এই দুটোর ধার ধারে না। তার কারণ আছে। ওরা কথা বলতে ভালোবাসে। কথার মাধ্যমেই শেখে, কথার মাধ্যমে শেখায়, কথার মাধ্যমেই বোঝায়। স্রেফ প্রাকৃতিক পন্থা তাদের বেশি পছন্দসই। সাংবাদিক মশায় আরও জানলেন, এই যে অদ্ভুত মকুটে মানুষগুলো আবলুস কাঠের তৈরি পুতুলের মতো চুপচাপ বসে, মাথার এক গাছি চুলও না নাড়িয়ে, অপদার্থ অলসের মতো এক নাগাড়ে লম্বা বিড়ি টেনে যাচ্ছে–এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত কর্মঠ নিজস্ব জমিতে। সাংবাদিকের বিস্ময় আরও বেড়ে গেল যখন জানলেন, ভিখিরির মতো দেখতে হলেও ওদের প্রত্যেকের নিজেদের চাষ-আবাদের জমিজমা রয়েছে। অর্থাৎ দারিদ্র্য কী জিনিস, তার স্বাদ এখনও পায়নি। এরা গতর খাটায়, অল্পে সন্তুষ্ট হয়, বাকি সময়টা প্রতিবেশীদের মঙ্গল চিন্তা করে এবং অত্যন্ত সুখী জীবনযাপন করে। জমিজমার মালিক হওয়ার ব্যাপারে পাদরি সাহেবের অবদান আছে সামান্য এবং পলিটিক্সে শুধু এই ক্ষেত্রেই তিনি নাক গলাতে বাধ্য হয়েছেন। বংশ পরম্পরায় এরা জমি ভোগ করে এসেছে। পাদরি সাহেব শুধু দেখেছেন, বংশধরদের কেউই যেন জমি নেই বলে গা ঢালা দিয়ে কাটায়। জমি পাইয়ে দিয়েছেন প্রত্যেকেই। স্থানীয় পলিটিক্সে এইটাই সর্বশেষ হস্তক্ষেপ। নাস্তিকদের আধিপত্য এখানে বেড়েই চলেছে। তাদের প্রচার বিজ্ঞানকেন্দ্রিক। ফলাও করে বিজ্ঞান যুক্তিনিষ্ঠ সংগঠনরা জানিয়ে যাচ্ছে, ভগবান টগবান কিছু নেই। চার্বাকনীতি অনুসরণ করো। পরলোকের কথা না ভেবে ইহলোকেই গুছিয়ে নাও। ঠাকুর দেবতাদের নিয়ে ব্যবসা, তা লাটে তুলে দাও। দৈব ঘটনা, অলৌকিক ঘটনা–এসব ধর্মব্যবসায়ীদের বাকতাল্লা–একদম কান দেবে না। জানবে, সবই বিজ্ঞাননির্ভর। বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা হয় না, বুজরুকি দিয়েও তা মগজে ঢোকানো যায়। ব্যাখ্যা একটা কোথাও আছে, বিজ্ঞান সেই ব্যাখ্যার নাগাল ধরে ফেলবেই। সেদিনই বুঝবে দৈব মাহাত্ম স্রেফ বোলচাল, ধর্মের নামবলী গায়ে দিয়ে লোক ঠকানোর কারবার।
একটা গুপ্ত সমিতির অভ্যুদয় ঘটেছে স্থানীয় পলিটিক্সের এহেন গোলমেলে পরিস্থিতিতে। মাঝে-মাঝে দাঙ্গা বাধাচ্ছে এই সমিতি বিজ্ঞান আর সমাজ কল্যাণের অজুহাতে। প্রচলিত বিশ্বাস আর সংস্কারের এক তীব্র সমালোচক এই সমিতির কর্ণধার। নাম তার আলভারেজ। পূর্বপুরুষ ছিলেন পর্তুগীজ। রক্তের গরম এখনও তার ধমনিতে বইছে। নিন্দুকরা অবশ্য বলে, নিগ্রো রুধির কিঞ্চিৎ পরিমাণে মিশেছে তার ধমনীতে। ভদ্রলোক সুসংগঠক। এ জায়গার বেশ কয়েকটা লজ আর মন্দিরের একচ্ছত্র অধিপতি, সেসব জায়গায় গোপনে চলে নাস্তিকতার আরাধনা কাজকর্ম বিলক্ষণ হেঁয়ালিপূর্ণ।
রক্ষণশীল যারা, তারা সংগঠিত হয়েছে যে ব্যক্তির ছাতার তলায় তিনি বিলক্ষণ বিত্তবান পুরুষ। বেশ কয়েকটা কারখানার মালিক। পয়সা আছে, মানসম্মানও আছে। তবে তার নাম শুনলেই লোকে চনমনে বোধ করে না। নিজে সম্ভ্রান্ত হয়েও পাঁচজনের সঙ্গে মিশে থাকেন। নাম তার রঞ্জুলাল। রঞ্জুলাল যদি উঠেপড়ে না লাগতেন এবং মিশন-হাউসের পাদরির সঙ্গে হাত না মেলাতেন তাহলে এখানকার সব চাষি জমির মালিক হতে পারত না। ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডল সুকৌশলে এই ব্যক্তিকে দিয়ে মস্ত এই কাজটা করাতে পেরেছেন বলেই দাঙ্গাহাঙ্গামা এখানে কমে গেছে-শান্তি-শৃঙ্খলা বহাল রয়েছে।
সাংবাদিক ইন্দ্রকে এইসব কথা যখন বলে যাচ্ছেন ফাদার ঘনশ্যাম, সেই সময়ে রক্ষণশীল নেতা রঞ্জুলাল ঢুকলেন ঘরে। ভদ্রলোক কৃষ্ণকায় পুরুষ। অস্বাভাবিক পেটমোটা। গোটা শরীরটায় যেন হাওয়া ঢুকিয়ে ফুলিয়ে টানটান করা হয়েছে–ফুটবলে যা করা হয়। টোকা মারলেই বুঝি টং করে আওয়াজ হবে। তার মুখ গোল, গালে আর চিবুকে প্রচুর মাংস, কিন্তু মাথায় চুল নেই মোটে, বিলকুল তেলতেলে মাথা। সুগন্ধী চুরুট টানতে টানতে ঘরে ঢুকেই তিনি থিয়েটারি ঢঙে চুরুট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে নিভিয়ে দিলেন। যেন ফাদার ঘনশ্যামকেই তিনি খোদ গির্জে বলে মনে করছেন। বাতাসে মাথা ঠুকে অভিবাদনও সারলেন আশ্চর্যভাবে কোমর বেঁকিয়ে–ওইরকম টাইট ফিগারে ঝট করে এতখানি বেঁকে পড়া অসম্ভব। কিন্তু অসম্ভবকেই তিনি সম্ভব করলেন। তবে হ্যাঁ, সামাজিক মেলামেশায় রঞ্জুলাল অতি মাত্রায় নিষ্ঠাবান পুরুষ বিশেষ করে ধার্মিক ব্যক্তিদের সমীপে এলে তিনি যেন তার সমস্ত অহংবোধ নিমেষে নিক্ষেপ করেন মাটির দিকে। এই ব্যাপারে তিনি পাদরিদের চেয়েও বেশি পাদরিপ্রতিম। বিড়ম্বিত বোধ করলেন ফাদার ঘনশ্যাম–প্রাইভেট লাইফে এতটা বিনয় তাঁকে বরাবর বিচলিত করে।
