বাড়িটা সেই অঞ্চলের মিশন-হাউস, গ্রাম্য-গির্জা রয়েছে পাশেই। বাড়ির সামনে টানা লম্বা বারান্দা। সারি-সারি পোঁতা খুঁটি পাক দিয়ে বেড়ে উঠেছে কালো আঙুর–পাতায় ম্যাড়মেড়ে লালচে ভাব। এর ঠিক পেছনে একইভাবে সারবন্দি ভাবে বসে রয়েছে সিধে শক্ত খুঁটির মতো অনেকগুলো মানুষ–গায়ের রং তাদের আঙুর ফলের মতোই কালো। তাদের কারোরই চোখের পাতা পড়ছে না। চামড়ায় লেগে আছে যেন বৃষ্টিবনের গাছের শ্যাওলা। এদের অধিকাংশ লম্বা বিড়ি টানছে– ছোট চুরুট বলা যায়। ছোট্ট এই দলে ধূমপানই একমাত্র নড়াচড়ার চিহ্ন। পর্যটক মহাশয়ের বর্ণনায় এরা নিছক উপজাতি ছাড়া কিছু নয়। যদিও এদের কয়েকজন মহাভারতের মধ্যম পাণ্ডবের বংশধর বলে দাবি করে।
ভদ্রলোক কলকাতায় থাকেন। একটি দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক। ছিপছিপে তনু, চুল ফঁকা-ফাঁকা, অসাধারণ নাক। অ্যাডভেঞ্চারাস এই নাক দেখলেই মালুম হয় পিঁপড়ে-খেকো প্রাণী যেমন তার দীর্ঘ নাকের ডগা দিয়ে পরখ করে নেয় সামনের পথ ঠিক আছে কিনা, ইনিও সেই বিদ্যায় বিলক্ষণ রপ্ত। সংবাদ নাকি সাংবাদিকদের কাছে দৌড়ে চলে আসে। ইনি এঁর নাকের ডগা দিয়ে সংবাদ টেনে নেন, যাচাই করেন, তারপর ছেপে দেন।
আশ্চর্য এই পুরুষের নামটাও। নাক উঁচু করে চলবেন ভবিষ্যতে, নামকরণের সময়ে তাঁর বাবা-মা বোধহয় সেই তথ্য অবগত ছিলেন–তাই তার নাম রেখেছিলেন–নাকেন্দ্র। পরে নিশ্চয় তারা ধ্যানযোগে উপলব্ধি করেছিলেন, এহেন নামের অধিকারী হয়ে পুত্রকে বিস্তর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই তারা অন্য একটা নাম দেন-বরেন্দ্র। যৌবন উপস্থিত হওয়ার পর বরেন্দ্র জানতে পারলেন, দুটি কারণে তিনি কোনও মহিলার বর হতে পারছেন না। এক, তার অ্যাডভেঞ্চারাস নাক– দুই, তাঁর বরেন্দ্র নাম। নাক ছাঁটাই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি নাম ছাঁটাই করলেন। বর বাদ গেল, হয়ে গেলেন শুধু ইন্দ্র। যদিও নামের দৌলতে ঋগবেদের প্রধান দেবতার একটি ছাড়া কোনও গুণই তিনি অর্জন করতে পারলেন না। যেটি পারলেন, সেটি হল, অন্যান্য সাংবাদিকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো। যেমন করতেন দেবরাজ–দেবতাদের ওপর কর্তৃত্ব।
এঁর উন্নাসিকতা একটি ব্যাপারে তাকে উগ্রপন্থী করে তুলেছিল। ধর্মচর্চা তোক স্বতঃস্ফূর্ত– তা যেন থাকে সংগঠনের বাইরে। দেবালয় ছিল তাঁর দু-চক্ষের বিষ, সাংগঠনিক ধর্ম প্রচারের ব্যাপারে তাঁর কলম থেকে অ্যাসিড ঝরে। এহেন মানসিকতার মানুষ যখন ব্যাগ হারিয়ে ক্ষিপ্ত হন এবং প্রথম বাড়িটাকেই দেখেন মিশন-হাউস, তখন তার ওপর উগ্রচণ্ডীর ভর হওয়া স্বাভাবিক। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো তিনি দেখলেন বিলকুল নিষ্কর্মা এবং ধরণী সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন কয়েকটি মানুষ নিমগ্নচিত্তে বিড়ি সেবন করছে কাষ্ঠ পুত্তলিকাবৎ। অগ্নিতে ঘৃতাহুতি প্রদানের মতোই চিড়বিড় করে উঠলেন ধ্যানস্থ ধূমপায়ী ওই কয়েকজনের ওপর। নির্লজ্জভাবে সময়ের এহেন অপব্যবহার যে নিদারুণ অদক্ষতার লক্ষণ, তা জ্বালাময়ী ভাষায় প্রকাশ করতে কসুর করলেন না। অতঃপর তিনি যে প্রশ্নবাণটি নিক্ষেপ করলেন, সেটি তাঁর প্রিয় ব্যাগঘটিত। প্রিয় বস্তু ফিরিয়ে আনার তিলমাত্র উদ্যোগ না দেখিয়ে ধূমপায়ী কজন যখন ধূমপানকেই ধ্যানযোগের প্রথম ধাপ বলে বিবেচনা করল এবং বাক্যহারা হয়ে রইল–তখন তিনি বাগবিস্তারের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে রাখলেন এবং একাই কথা বলে গেলেন।
কল্পনার চোখে দেখে নিন, প্রখর রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে কয়েক বিঘৎ লম্বা পেরেকের মতো সিধে একটা লোক গলা চড়িয়ে কথাই বলে যাচ্ছেন, তার পোশাক অতীব পরিচ্ছন্ন, ইস্পাতকঠিন মুঠোয় ঝুলছে একটা ব্রিফকেস। ছায়ায় সমাসীন নিষ্কম্প কয়েকটি মানুষকে লক্ষ করে তিনি অনর্গল বকে চলেছেন। উচ্চকণ্ঠে অতি যত্নে তিনি প্রথমে ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে ধূমপায়ী পুরুষ কজন এমন অলস আর কদর্য হয়ে উঠেছে। এদের এই পশুবৎ আচরণ চূড়ান্ত তামসিকতার লক্ষণ এবং এরা পশুর চাইতেও অধম। অনেক আগেই নিজেদের এহেন আদিম বর্বরতা এদের বোঝা উচিত ছিল। বক্তার ধারণা, পাদরিদের অনিষ্টকর প্রভাব রয়েছে এর মূলে। এই একটি কারণে এতগুলি লোক। দারিদ্রের চরম সীমায় পৌঁছেছে, চূড়ান্তভাবে নির্যাতিত হয়েছে এবং উপায় না পেয়ে ছায়ায় বসে অনর্গল ধূমপান করে চলেছে।
তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতার শেষাংশ ছিল এইরকম, অত্যন্ত নরম প্রকৃতির মানুষ তোমরা, তাই তোমাদের পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে মুকুটধারী পাদরিরা, তাদের গায়ে ঝকমকে সোনার আলখাল্লা, তোমাদের পরণে ছেঁড়া পোশাক। অত্যাচারীর ভূমিকায় থেকে এরা ফেটে পড়ছে আত্মম্ভরিতায়। ঠকিয়ে যাচ্ছে তোমাদের ঝকমকে ক্রাউন, চাদোয়া আর পবিত্র ছাতার ঐশ্বর্য দেখিয়ে, তোমরা বোবা বনে রয়েছ এদেরই সামনে। ভাবছ এবং তোমাদের ভাবানো হয়েছে–এরাই নাকি ধরণীর রাজা, আকাশ থেকে নেমে এসেছে তোমাদের ভালো করার জন্যে। কতখানি ভালো হয়েছে তা আয়নায় নিজেদের দেখলেই হাড়ে হাড়ে টের পাবে। নিজেদেরই কান্না পাবে। বড়-বড় কথা আর জাঁকজমক দেখিয়ে তোমাদের ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে বলেই আজ তোমাদের এই হাল হয়েছে। বর্বরতার পর্যায়ে নেমে এসেছ, লিখতে জানো না, পড়তেও জানো না–
