কিন্তু শার্লক হোমস কি মন্ত্র জানে? চোয়াড়ে লোকটার কানে-কানে কী মন্ত্র বলতেই সাপের ফণা নেমে এল যেন। কুকুরের মতো কেঁউ-কেঁউ করে ঘুরতে লাগল হোমসের পেছন পেছন। উলটে ধমক দিয়ে হোমস-ই বলে গেল রেসের দিন ঘোড়া যেন হাজির থাকে।
ফেরার পথে হোমস বললে, ওয়াটসন, লোকটার পায়ে থ্যাবড়া জুতো লক্ষ করেছ? কর্নেল রসের কাছে গিয়ে বললে, আমরা চললাম। আপনার ঘোড়া রেসে দৌড়োবে।
কর্নেল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চেয়ে রইলেন। বেরোনোর পথে ভেড়ার পাল দেখে থামল হোমস। ছোকরাটাকে ডেকে জিগ্যেস করলে, দিন কয়েকের মধ্যে তোমার ভেড়াদের অসুখ-বিসুখ করেনি? অবাক হয়ে ছোকরা বললে, করেছে বইকি। তিনটে ভেড়া খুঁড়িয়ে চলছে। শুনে ভীষণ খুশি হল হোমস। গ্রেগরিকে ডেকে বললে, বৎস, ভেড়াদের অদ্ভুত অসুখটা নিয়ে তলিয়ে ভেবো।
আর কিছু উপদেশ দেবেন? গ্রেগরি বুঝল হোমস রহস্যের কিনারা করে ফেলেছে।
হোমস বললে, কুকুরটার অদ্ভুত আচরণ নিয়েও ভেবে দেখো।
কুকুর! সে তো রাতে চেঁচায়নি।
সেইটাই তো অদ্ভুত ব্যাপার!
নির্দিষ্ট দিনে একটা অন্য ঘোড়া সিলভার ব্লেজ-য়ের জায়গায় দৌড়ে বাজি জিতল। অন্য ঘোড়া মনে হল এই কারণে যে সিলভার ব্লেজ-য়ের যেখানে-যেখানে সাদা দাগ থাকা উচিত সেখানে তা নেই।
হোমস কিন্তু বললে কর্নেল রসকে, মদ দিয়ে ধুয়ে দিন ওই জায়গাগুলো। সাদা দাগ বেরিয়ে পড়বে। ঘোড়া যে লুকিয়ে রেখেছিল। সে পাকা জোচ্চোর। ঘোড়া ফিরিয়ে দিতে এসেও লুকিয়ে রেখেছিল ভোল পালটে মাঠে নামাবে বলে। ওই জন্যে সব আস্তাবল সার্চ করেও সিলভার ব্লেজ কে দেখতে পায়নি গ্রেগরি।
কিন্তু স্ট্রেকারকে খুন করল কে? শুধোলেন কর্নেল রস।
সে তো আমাদের সঙ্গেই রয়েছে।
খেপে গেলেন কর্নেল। হোমস তখন সিলভার ব্লেজয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন, ভারী বুদ্ধিমান ঘোড়া। স্ট্রেকার মেয়েমানুষের খপ্পরে পড়েছিল। তাই বিশ গিনির পোশাক কিনে দিতে হত। দেনায় ডুবে টাকার লোভে ঠিক করেছিল সিলভার ব্লেজয়ের পেছনের টেন্ডন একটু চিড়ে দেবে গভীর রাতে। শুধু চোখে ধরা যাবে না। কিন্তু খোঁড়া হয়ে যাবে বিখ্যাত ঘোড়া। ওই জন্যেই ছানিকাটা ছুরি আর মোমবাতি রেখেছিল সঙ্গে। তাড়া খেয়ে ফেলে যাওয়া সিম্পসনের গলাবন্ধ তুলে নিয়েছিল ঘোড়ার পা বাঁধবে বলে। কিন্তু ঘোড়াদের অদ্ভুত অনুভূতি ওদের অনেক বিপদ থেকে বাঁচায়। মাঠের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে গেল স্ট্রেকার–দাপাদাপিতে ছোকরাদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে–এই ভয়ে। কিন্তু দুরভিসন্ধি আঁচ করে সিলভার ব্লেজ চাট মেরে খুলি গুঁড়িয়ে দিল ট্রেনারের–পড়বার সময়ে হাতের ছুরি আপনা থেকেই চিরে দিয়ে গেল দাবনা।
হে পাঠক হে পাঠিকা! আপনিও কম বুদ্ধিমান নন। বলুন দিকি হোমস কী করে বুঝল কুকর্মের হোতা স্ট্রেকার স্বয়ং?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
এক–কুকুরটা রাতে চেঁচায়নি কেন? চেনা মানুষ দেখেছিল বলে।
দুই–ভেড়া তিনটের খুঁড়িয়ে চলা রোগ হল কেন…ওদের টেন্ডন চিরে দিয়ে স্ট্রেকার হাত পাকিয়েছিল বলে।
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ২ বৈশাখ, ১৩৮২।
বেঁচে উঠলেন ফাদার ঘনশ্যাম
সুনামের মতো একটা জিনিস ফাদার ঘনশ্যাম মণ্ডল মাঝে-মাঝে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। আবার এক-একটা সময় আসে, সুনামের আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকতে পারেন না। অল্প সময়ের জন্য হলেও এইরকম ঘটনা তার জীবনে প্রায় ঘটে। কখনও তিনি কাগজে-কাগজে পৃথিবীর নবম আশ্চর্য হয়ে থাকেন, সাপ্তাহিকীর সমালোচনা স্তম্ভের বাগবিতণ্ডার মধ্যেও তাঁর ঠাই হয়ে যায়, ক্লাব আর ড্রইংরুমে তাঁকে নিয়ে মুখরোচক আড্ডা জমে–সেইসব আড্ডায় তার নিপুণ আর বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দাগিরির অনুপুঙ্খ বর্ণনা অত্যন্ত ভুলভাবে পরিবেশন করা হয়। আর এই জিনিসটা বেশি করে ঘটে এই পশ্চিমবঙ্গেই। ফাদার ঘনশ্যামকে যারা জানে, তাদের কাছে এই গপ্পোগুলো বেশ বেখাপ্পা আর অবিশ্বাস্য মনে হয়। তা সত্ত্বেও, ডিটেকটিভ হিসাবে ফাদার ঘনশ্যামের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি অনেক ম্যাগাজিনেই বেরচ্ছে।
আশ্চর্য এই যে, ভ্রাম্যমান এই বহুল প্রচারিত আলোকবর্তিকা দীপ্যমান হলেন অতি প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে সুদূরের সেই অঞ্চল তাঁর নিবাস থেকে বহু-বহু দূরে। তাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল বিশেষ সেই জায়গায়। কাজটা মিশনারী বিষয়ক বটে, আবার গ্রাম্য গির্জা বিষয়কও বটে। জায়গাটা ভারতের একদম উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। যেখানে স্বাধীনতাকামী উপজাতীয়রা নিত্য সংঘর্ষ আর চোরাগোপ্তা খুন-জখম যেন তেন প্রকারেণ চাগিয়ে রেখেছে, যেখানকার সন্ত্রাসবাদে গোপনে মদত দিয়ে চলেছে ভারতের বাইরের রাষ্ট্রশক্তিরা–ভারতকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন আর দুর্বল করার প্রয়াসে। সব রকম গাত্রবর্ণের মানুষই এখানে থাকে সাদা, কালো, হলদেটে। পর্যটন পিয়াসীরা প্রায় সারা বছর টহল দিয়ে যায় সেখানে কারণ, জায়গাটাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ভারতের দ্বিতীয় ভূস্বর্গ বলা চলে।
গোলমালটা শুরু হল এইরকমই এক পর্যটককে নিয়ে। দ্বিতীয় ভূস্বর্গে পা দিয়েই তিনি তার একটা ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ভীষণ বিরক্ত, ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি ঢুকে পড়লেন প্রথমেই যে বাড়িটা দেখলেন, সেই বাড়ির মধ্যে।
