এমিকে কবর দেওয়ার জন্যে ভিলার বাগানটাই প্রথমে মনোনীত করেছিল বালসানো। কিন্তু যে রাতে কাজ সারবে বলে স্থির করলে সে, সেই রাতেই একজন চৌকিদার তাকে দেখতে পায়। কাজেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলল বালসানো। ঘরের মেঝেতেই সমাহিত করা হল এমি ল্যাঙ্গারকে। বার্সিলোনার ক্রিমিন্যাল কোর্টে খুনের অপরাধে বিচার শুরু করা হল তার আর ইউলেলিয়া মেইনের। কিন্তু তখনও অবিচল বালসানো। দৃঢ়কণ্ঠে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করার পর বারবার এই বলে সে হুঁশিয়ার করে দিলে আদালতকে যে নির্দোষীকে অবিচারের যাঁতায় ফেললে প্রত্যেকেরই সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। মুক্তি দেওয়া হল ইউলেলিয়াকে। কিন্তু খুন আর ডাকাতি করার জন্যে বাইশ বছর এবং দলিল দস্তাবেজ জাল করার জন্যে আরও দু-বছর সশ্রম কারাবাসের শাস্তি দেওয়া হল খুনে বদমাশ বেঞ্জামিন বালসানোকে।
১৯৩৬ সালে শুরু হয় স্পেনের গৃহযুদ্ধ। বালসানো তখনও জেলে। যুদ্ধের দুর্যোগ বার্সিলোনার ওপর ঘনিয়ে আসতেই অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে তাকেও মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫৫ সালের আবার নতুন অপরাধের জন্যে তাকে পাঠানো হয় কারাকপাটের অন্তরাল।
* ডন ভিসেনতি রেগুয়েনগো (মাদ্রিদ, স্পেন) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
স্যার আর্থার কোনান ডয়ালের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
বুদ্ধিমান ঘোড়া আর বোকা চোর। শার্লক হোমস
চলন্ত ট্রেনে বসে ঘটনাটার আদ্যোপান্ত ওয়াটসনকে বলল হোমস। ভারী রহস্যজনক ব্যাপার। ডার্টমুর জায়গাটা যেমন ফাঁকা তেমনি নিরিবিলি। দু-চারটে স্বাস্থ্যনিবাস আছে স্বাস্থ্যকামীদের জন্যে। সিম্পসন বলে একটা লোক প্রায় আসত সেখানে। খুনের দিন এসেছিল সিলভার বেজ যে আস্তাবলে আছে, সেইখানে। তখন সন্ধে হতে চলেছে। মাংসের বাটি হাতে ঝি আসছে ট্রেনারের বাড়ি থেকে হান্টার ছোকরার জন্যে। রাত্রে আস্তাবল পাহারা দেবে হান্টার–খাবেও ওইখানে। এমন সময়ে সিম্পসন পাকড়াও করল ছুঁড়িকে। হাতে মাথামোটা ভারী লাঠি। মিঠে-মিঠে বুলি ছেড়ে হাতে একটা দশ পাউন্ডের নোটও গুঁজে দিতে গেল। ভড়কে গিয়ে ঝি গিয়ে বলে দিল হান্টারকে। সিম্পসন ততক্ষণে কাছে এসে গেছে। হান্টারকেও ঘুস দিয়ে জানতে চাইল সিলভার বেজ সম্বন্ধে খবরাখবর।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল হান্টার। রেসের আগে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। তাই তবে রে বলেই দৌড়ল কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার জন্যে। ঝি মেয়েটিও ভো দৌড় দিল বাড়ির দিকে। যেতে-যেতে দেখল জানলা দিয়ে ভেতরে মুণ্ড বাড়িয়ে রয়েছে সিম্পসন। হান্টার অবশ্য কুকুর নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখল লোকটা ভেগে পড়েছে।
ট্রেনারের নাম স্ট্রেকার। খুব নাম আছে। ঝিয়ের মুখে সব শুনে অস্থির হলেন ভদ্রলোক। রাত একটায় বর্ষাতি কাঁধে বেরিয়ে পড়লেন আস্তাবলের দিকে। বউকে বলে গেলেন মন চঞ্চল হয়ে আছে ঘোড়াদের জন্যে। একটু দেখে আসা যাক।
সেই হল তাঁর কালযাত্রা। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেও মিসেস স্ট্রেকার বোঝেননি তিনি বিধবা হয়ে গেছেন। আস্তাবলে গেলেন স্বামীর খোঁজে। গিয়ে দেখেন তাজ্জব কাণ্ড। হান্টার ছোঁড়া বেহুঁশ। মাচায় শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে আরও দুটো ছোঁড়া। আস্তাবলের দরজা খোলা। সিলভার বেজ উধাও।
বেশ খানিকটা দূরে পাওয়া গেল গাছে ঝুলন্ত বর্ষাতি। একটু তফাতে মুখ গুঁজড়ে পড়ে স্ট্রেকার। খুলি চূর্ণ কঠিন আঘাতে। হাতে একটা রক্তমাখা তীক্ষ্ণ ছুরি। বেশ খানিকটা কাটা দাগ। পাশে পড়ে সিম্পসনের পরিত্যক্ত গলাবন্ধ–তাতেও রক্ত লেগে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে আরও কয়েকটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল হোমস। স্ট্রেকারের হাতের ছুরিটাকে ডাক্তারি ভাষায় ছানিকাটা ছুরি বলে। খুব দামি আর খুব সূক্ষ্ম ধারালো ফলা। কিন্তু ফলা মোড়া যায় না। পকেটে নিয়ে যাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও স্ট্রেকার ছুরি নিয়ে দৌড়েছিলেন। তাড়াতাড়িতে নাকি টেবিল থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন–বললেন তার বিধবা বউ।
স্ট্রেকারের পকেটে পাওয়া গিয়েছিল মোমবাতি, দেশলাই আর কুড়ি গিনি দামের একটা মেয়েদের জামার ক্যাশমেমো। কুড়ি গিনি দামের জামা কি সাধারণ বউ-ঝি পরে? মিসেস স্ট্রেকারকে আচমকা শুধোল হোমস, অমুক পার্টিতে একটা ঝলমলে দামি পোশাক পরে আপনি গিয়েছিলেন না?
আজ্ঞে না, সাফ জবাব দিলেন স্ট্রেকার গৃহিণী। আপনি আর কাউকে দেখেছেন! কর্নেল রস হতাশ হলেন হোমসের পাগলাটে কথাবার্তা আর কাদার মধ্যে মুখ ঘষটানো দেখে। হোমস কিন্তু গ্রাহ্য করল না। বলল, আমি একটু বেড়িয়ে আসি। নমস্কার।
বলে ওয়াটসনকে নিয়ে পা বাড়াল জলার ভেতর দিকে। যেতে যেতে বললে, বেদেরা ঘোড়া লুকোয়নি। ওরা পুলিশকেও এড়িয়ে চলে। ফাঁকা জায়গাতেও ঘোড়া ঘুরছে না। ঘোড়ারা দল বেঁধে থাকে। কাজেই হয় যাবে কিংস পাইল্যান্ডে নয় কেপলটনে। কিংস পাইল্যান্ডে ঘোড়া যখন ফেরেনি–তখন কেপলটনেই আছে।–ওই দেখো ঘোড়ার পায়ের ছাপ।
আসবার সময়ে সিলভার ব্লেজ-য়ের পায়ের নাল সঙ্গে এনেছিল হোমস। পায়ের ছাপের সঙ্গে তা মিলে গেল। পাশেই দেখা গেল থ্যাবড়ামুখো একসারি জুতোর ছাপ। ঘোড়া আর মানুষে কিংস পাইল্যান্ডের দিকে কিছুটা এসে ফের ফিরেছে কেপলটনের দিকে।
চিহ্ন অনুসরণ করে একটা আস্তাবলের সামনে পৌঁছল দুজনে। পাহারাদার ছোকরা তেড়ে এল ওদের দেখে। তারপরেই বেরিয়ে এল আস্তাবলের মালিক। সে আরও রুক্ষ। এই মারে কি সেই মারে।
