এমি ল্যাঙ্গার নামে একজন জার্মান স্ত্রীলোকের সঙ্গে কিছুদিনের জন্যে এ-বাড়িতে সংসার পেতেছিল বালসানো। প্রায় ষাট বছর বয়স এমি ল্যাঙ্গারের। বিধবা। স্বামী ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। অবস্থা ভালোই ছিল তার। আসক্তি মদ আর অন্যান্য মাদক দ্রব্যে। বিস্তর অর্থ ছাড়াও অনেক হিরে-জহরৎ ছিল নাকি তার গহনার পেঁটরায়। চলে যাওয়ার সময়ে সব কিছুই নিয়ে গিয়েছিল সে ফেলে গিয়েছিল শুধু একটা কাকাতুয়া। দিব্যি জার্মান বলতে পারে পাখিটা। দেখলাম, মনিবানীর আকস্মিক অন্তর্ধানে মুষড়ে পড়েছে বেচারি। খুঁজে পেতে এমন একজনকে বার করলাম যে জার্মান কথা কইতে পারে। তাকে নিয়ে এলাম কাকাতুয়ার সামনে। ওদের কথার্বাতা থেকে নতুন কোনও তথ্য জানতে পারব, এই আশা ছিল আমার। কিন্তু এবারও আশাহত হতে হল আমাকে।
কিন্তু এমি লাঙ্গারই যে বালসানোর হাতে খুন হয়েছে এবং বাদালোনার সেই লাশটি যে তারই সে বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল আমার। বাদালোনার ভিলাতে পাওয়া কিছু আসবাবপত্র আর বই যে এমি ল্যাঙ্গারেরই, তাও প্রমাণ করতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি আমাকে। খুঁজতে খুঁজতে বার্সিলোনায় একটি দোকানের সন্ধান পেলাম। পুরোনো জিনিস খরিদ করত দোকানদার। এমি ল্যাঙ্গারের কিছু পোশাক উদ্ধার করলাম দোকান থেকে। বালসানোই বিক্রি করে ছিল। কিন্তু আসল কাজটাই যে তখনও বাকি। যেমন করেই হোক আমাকে প্রমাণ করতেই হবে যে লাশটা এমি ল্যাঙ্গারেরই এবং কোনও তরুণী মেয়ের নয়। এ ব্যাপারে আমার ওপর কিঞ্চিৎ কৃপাবর্ষণ করলেন ভাগ্যদেবী। হঠাৎ খবর পেলাম, এমির পায়ে একবার একটা দগদগে ঘা হয়েছিল। অস্ত্রোপচার করে তবে সুস্থ হয়েছিল সে। ভেবে দেখলাম এ খবর যদি নির্ভেজাল হয়, তাহলে লাশটা আর একবার পরীক্ষা করলেই মুশকিল আসান হয়ে যাবে। তৎক্ষণাৎ সে ব্যবস্থা হল। অপারেশনের চিহ্নও পাওয়া গেল পায়ে। ডাক্তারও শেষ পর্যন্ত সুর পালটে স্বীকার করলেন, মেয়েটার বয়স তিরিশ নয়, ষাট এবং সে এমি ল্যাঙ্গারই বটে।
এবার বালসানো আর তার নতুন প্রণয়িনীকে জালে ফেলতে হবে। কাগজে কাগজে ছেপে দিলাম ওদের ছবি আর দৈহিক বর্ণনা। পরিশেষে মাদ্রিদের লাভেপিসু কোয়ার্টারে একটা বোর্ডিং হাউসে গ্রেপ্তার করা হল দুজনকে যে ঘরে এমি ল্যাঙ্গারকে পুঁতে রেখে ছিল, তার নক্শা আর খবরের কাগজে প্রকাশিত খুনের বিবরণটা নিজের কাছেই রেখে ছিল বালসানো।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর এতটুকু চঞ্চলতা দেখা গেল না বালসানোর ধীর স্থির মুখে। ওর বিরুদ্ধে কেন্সটা যে ভাবে দাঁড় করিয়েছিলাম তাতে ফাঁক ছিল না কোথাও। কিন্তু অম্লানবদনে ও সব অভিযোগ অস্বীকার করে বসল। এমি ল্যাঙ্গারকে নাকি সে কস্মিনকালেও দেখেনি। এবং এ জঘন্য হত্যা তার নয়, তারই জানাশুনা আর একজন অপরাধীর। এমি ল্যাঙ্গার নিহত হওয়ার সময়ে শ্রীঘরে ছিল তার এই খুনে বন্ধুটি–এ খবর শুনেও তিলমাত্র বিচলিত হল না ও। ওর মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্যে বেশ কয়েকবার অকুস্থলে নিয়ে গেলাম ওকে। প্রতিবারই বিন্দু বিন্দু ঘামে ওর বিবর্ণ মুখ ভরে উঠলেও কিছুতেই স্বীকার করানো গেল না যে সেই হত্যাকারী।
ভিলার মধ্যে কিন্তু এমি ল্যাঙ্গারকে খুন করা হয়নি। ক্যাল্লি দ্য টলার্সের বোর্ডিং হাউস ছেড়ে বার্সিলোনার ক্যাল্লি দ্য রোজেনল-এ একটা বাড়িতে আস্তানা নিয়েছিল ও। খুনের দিন-তিনেক বাদে বালসানোকে একটা বিশাল সুটক্সে বয়ে নিয়ে যেতে দেখেছিল একজন মেয়ে কুলি। বিশ্রি দুর্গন্ধ বেরুচ্ছিল ভেতর থেকে। জার্মান স্ত্রীলোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে সে নাকি একাই ফিরে যাচ্ছে। এই সাফাই গেয়েছিল বালসানো।
নাক সিঁটকে শুধিয়েছিল মেয়ে-কুলিটা–কিন্তু ওই সুটকেসটা থেকে ও রকম যাচ্ছেতাই গন্ধ বেরুচ্ছে কেন বলুন তো? কী আছে ওতে?
সসেজ–একদম খারাপ হয়ে গেছে কিনা তাই, চটপট জবাব দিয়েছিল বালসানো।
এই সুটকেসটাই ভিলাতে নিয়ে গিয়েছিল সে। ভেতরে ছিল হতভাগিনী এমি ল্যাঙ্গারের লাশ। সুটকেসটা পরীক্ষা করার পর রক্তের দাগ পাওয়া গেল ভেতরে। পেরেকে লেগে থাকা মেয়েদের পোশাকের সুতোও পেলাম। খুনের সূত্রপাত হয় একটা ঝগড়া থেকে। বালসানোর ধারণা ছিল কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আছে এমি ল্যাঙ্গারের। কিন্তু যখন সে দেখলে সব ভুয়ো–অত টাকাই নেই তার, তখন সংহার মূর্তি ধারণ করল সে। মদে চুর চুর হয়েছিল এমি। কথা কাটাকাটি হতে হতে ফস করে সে খামচে ধরে বালসানোর মুখ। তৎক্ষণাৎ ছুরি বাগিয়ে ধরে বালসানো এবং পরমুহূর্তে একটি মাত্র মোক্ষম টানে দু-টুকরো করে দেয় এমির কণ্ঠনালী। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রুধির স্রোত। আঘাতটা যে মারাত্মক, তখন বুঝতে পারেনি বালসানো। তাই গোটা দুই মোজা এমির গলায় পেঁচিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে ও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিষ্প্রাণ হয়ে যায় এমির দেহ। নির্বিকারভাবে এবার লাশ সরানোর আয়োজনে তৎপর হয়ে ওঠে বালসানো। স্বল্প পরিসরে দেহটাকে যাতে ঠেসে নিয়ে যাওয়া যায়, তাই আরও ক্ষতবিক্ষত করে নেয় লাশটা। এই কারণেই বিকৃত দেহটাকে পুলিশের হাতে পড়ার পর চুল চেরা পরীক্ষা না করার ফলে ঠিক কীভাবে খুন হয়েছিল এমি, তা জানা যায়নি অনেকদিন পর্যন্ত।
