জটিলতা আরও বৃদ্ধি পেল শবব্যবচ্ছেদ করার পর। তাড়াহুড়ো করে কোনওরকমে ওপরে-ওপরে কর্তব্য শেষ করলেন ডাক্তার। মেয়েটির বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে, তথ্য পেলাম তাঁর কাছ থেকেই। ফলে, ওই বয়সের অনেকগুলি মেয়ের নাম পাওয়া গেল। খামোকা খানিকটা সময় নষ্ট করলাম তাদের প্রত্যেকের হদিশ বার করতে। শেষকালে দেখা গেল প্রত্যেকেই জলজ্যান্ত জীবিত।
হত্যা-রহস্য সমাধানে একটা মস্ত বড় বিষয় হচ্ছে মোটিভ অর্থাৎ হত্যার উদ্দেশ্য। প্রত্যেক গোয়েন্দাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মোটিভ নির্ণয় করার জন্যে আদাজল খেয়ে উঠে-পড়ে লাগে। কিন্তু এদিক দিয়েও আমি অসহায়। কেননা, খুনের আগে অরিলিও মার্তিনেজের জীবন সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ জানতাম না আমি। মাস দুয়েকের জন্যে ভিলায় আস্তানা পেতেছিলেন ভদ্রলোক। তারপর আরও মাসদুয়েক কেটে গেছে, নতুন কোনও ভাড়াটে বসাননি তিনি বাড়িতে। পাড়াপড়শীদের কাছে শুনলাম সন্ধের অন্ধকার না নামলে ভদ্রলোককে বাইরে বেরোতে দেখা যেত না। দেখতে শুনতে যুবাপুরুষের মতোই। মৃদুস্বরে বড় সুন্দর কথাবার্তা বলে চিত্তজয়ের গুণ ছিল তাঁর। কৃশকায়। উচ্চতাও তেমন কিছু নয়। কিন্তু পোশাক-পরিচ্ছদের দিক দিয়ে ফুলবাবুটির মতো সেজেগুজে থাকতেন। চেহারার ওপর যে বিলক্ষণ যত্ন ছিল মার্তিনেজের, তা তাঁকে দেখলেই বোঝা যেত।
বাড়ির লিজে সই দেওয়ার সময় আত্ম-পরিচয় দেওয়া আইডেনটিফিকেশন কার্ডটি সংলগ্ন করে রেখেছিলেন মার্তিনেজ। এই কার্ড পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলাম অনেক যত্ন নিয়ে সই করেছেন ভদ্রলোক। তাইতেই আমার আর তিলমাত্র সন্দেহ রইল না যে এ নাম তার পিতৃদত্ত নয়–ছদ্মনাম। আমি জানি অনেকে মনে করেন Graphology অর্থাৎ হাতের লেখা পরীক্ষা করে চরিত্র নিরূপণের শাস্ত্রে নাকি কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাঁদের সঙ্গে এ সম্পর্কে একমত নই আমি। ঠিকানা ছাড়া কার্ডে যা কিছু তথ্য পাওয়া গেল, তা ডাহা মিথ্যা। ঠিকানা দেওয়া ছিল ১০ নং ক্যাল্লি দ্য টলার্স, বার্সিলোনা। গেলাম সেখানে। বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের ভার ছিল যে স্ত্রীলোকটির ওপর, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম অরিলিও মার্তিনেজ বলে কেউ এ-বাড়িতে থাকতেন কিনা? বাড়ির মালিকের কাছে। আমাকে নিয়ে গেল সে এবং তার কাছেই জানলাম অরিলিও মার্তিনেজের নাম এ-বাড়ির কেউ এর আগে শোনেনি। কিন্তু সহজেই হাল ছাড়বার পাত্র নই আমি। নামটা যে আসল নয়, তা তো আমি জানতামই। কাজেই, মার্তিনেজের চেহারার বর্ণনা দিলাম এবার। কাজ হল তাতে। বাড়িওলা বললেন–হ্যাঁ, হা, চিনি বইকি। বেঞ্জামিন বালসোনাকেই তো এই রকম দেখতে। আমার এই বাড়িতেই কিছুদিন ছিলেন ভদ্রলোক। বড় অল্প কথাবার্তা বলতেন। তাছাড়া বাঁধাধরা জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি–বড় বিশৃঙ্খল ছিল তাঁর প্রকৃতি। মাঝে-মাঝে দারুণ টানাটানি চলত। তবে একবার শুনেছিলাম, বার্সিলোনাতে নাকি তার একটা ভিলা আছে।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেল পয়লা নম্বরের জোচ্চোর এই বালাসানো। অনেকগুলো শহরের পুলিশ মহলে বিলক্ষণ নামডাক আছে তার। দূরন্ত জুয়ারি সে, হাতের মারপ্যাঁচেও মহা ওস্তাদ। এ ধরনের লোকদের জীবনে অভাব অনটন আর স্বাচ্ছল্যের যেমন দ্রুত পরম্পরা দেখা যায়, বালসানোও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বালসানো আর অরিলিও মার্তিনেজ যে এক এবং অভিন্ন পুরুষ, তা প্রমাণ করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। ক্যাল্লি দ্য টলার্সের বাড়িওলা আর বাদালোনার প্রতিবেশীদের পুলিশ ফোটোগ্রাফ দেখাতে তারাও একবাক্যে সমর্থন জানাল আমার সিদ্ধান্তকে।
তদন্ত-পর্বের এই পর্যায়ে পৌঁছে অনায়াসেই বালসানোর নামে গ্রেপ্তার পরোয়ানা বার করে দিতে পারতাম। কিন্তু নিহত মেয়েটিকে তখনও শনাক্ত করে উঠতে পারিনি আমি। কাজেই চট করে কিছু করা সঙ্গত মনে করলাম না। এই সময়ে খবর পেলাম, ইউলেলিয়া মাইনো নামে একজন বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে বার্সিলোনাতে প্রায় দেখতে পাওয়া যেত বালসানোকে। গোলগাল নধরকান্তি চেহারা মেয়েটার। চুলের রং কুচকুচে কালো। ক্যাল্লি দ্য লা ক্যাডেনাতে একসঙ্গে একটি ঘরে কিছুদিন ছিল ওরা দুজনে। তারপর উধাও হয়ে যায় বালসানো এবং মেয়েটি। এবং কেউ জানে না বর্তমানে পৃথিবীর কোনও মুলুকে আস্তানা নিয়েছে দুই মূর্তিমান।
আরও খবর পেলাম, ইউলেলিয়া তার সম্মায়ের সঙ্গে গ্রানোলর্স-এ থাকত। সঙ্গে সঙ্গে হাজির হলাম সেখানে। বিমাতা বাড়িতেই ছিলেন। আমাকে দেখেই না জানি কি হাঙ্গামার সূত্রপাত হয়েছে। মনে করে রীতিমতো সঙ্কিত আর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। এই বাড়িতেই একটা চিঠির কয়েকটা ছিন্ন অংশ পেলাম। জোড়া লাগাতেই পেলাম পুরো চিঠিটা। ইউলেলিয়ার চিঠি। একজন বন্ধুর সঙ্গে বার্সিলোনা ত্যাগ করে যাচ্ছে সে। বিমাতার কাছে তার অনুরোধ তিনি যেন পড়া শেষ হয়ে গেলেই চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলেন। চিঠির তারিখ ছিল ২৩ মার্চ, ১৯৩২। বাদালোনায় মৃতদেহ আবিষ্কারের ঠিক দুদিন আগেকার তারিখ।
এ-কেসের একটা অত্যন্ত দরকারি সূত্র হচ্ছে বালসানো-ইউলেলিয়া ঘটিত প্রণয় উপাখ্যানটি। কিন্তু তার চাইতেও দরকারি যা, তা হল খুনে পাষণ্ডটার নাম ধাম জানা। শবব্যবচ্ছেদ হওয়ার পর যে রির্পোট পেয়েছিলাম তা আমার কাছে অন্তত সন্তোষজনক মনে হয়নি। কিন্তু একগুঁয়ে ডাক্তার কিছুতেই তাঁর রিপোর্ট শুধরোতে রাজি হলেন না। মেয়েটির বয়স নাকি কোনওমতেই তিরিশের বেশি নয়–ছিনেজোঁকের মতো এই তথ্যকেই আঁকড়ে রইলেন ভদ্রলোক। ভেবে দেখলাম ক্যাল্লিন দ্য টলার্সের বোর্ডিং হাউসে গেলে অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর আমি পেলেও পেতে পারি। তাই আবার গেলাম বাড়িওলার সঙ্গে এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে।
