.
ভক্তদের প্রশস্তি
১৯৩৪-এর ২৩শে মে। লুইসানার গিবল্যান্ড থেকে আট মাইল দূরে রাস্তার ধারে ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে দুজন পুলিশ অফিসার।
ঘড়িতে তখন নটা বাজে। দূরে দেখা গেল ফোর্ড ফাইভ এইট সিডান গাড়িটা।
দেখা গেল বনি আর ক্লাইডকেও।
গর্জে উঠল পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র। মোট ১৬৭টা গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল। বনি আর ক্লাইড ভাগাভাগি করে নেয় পঞ্চাশটা। মারা যায় তৎক্ষণাৎ।
রক্তে ভেজা ন্যাকড়ার মতোই নাকি দেখতে হয়েছিল দুজনকে–গুলির নরক বানানোর পর বলেছিল একজন অফিসার।
কবর দেওয়ার জন্যে যুগল দেহকে নিয়ে যাওয়া হল ডালাসের বাড়িতে। অনেক কিংবদন্তীর সৃষ্টি হয়ে গেছিল এতদিনে। খবর ছড়িয়ে গেল আগুনের মতো। ভক্তরা ছুটে এসেছিল ফুলের তোড়া নিয়ে। গল্পে উপকথায় নাকি এমন নায়ক এমন নায়িকার কথা শোনা যায়। কফিন থেকে ফুলের পাপড়ি আর কফিনের অলঙ্করণ পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে গেছে অশ্রুসজল অনুরাগীরা। গোটা কবরখানায় এত লোক ভেঙে পড়েছিল যে ক্লাইডের সহোদরা কবরের চল্লিশ ফুটের মধ্যেও আসতে পারেনি।
ক্লাইডের বয়স তখন ২৫, বনির ২৩। দুজনার রোমাঞ্চকর কাহিনির ভাবাকুল পরিসমাপ্তির ভবিষ্যত্বাণী করে গেছিল, বনি নিজেই স্বরচিত একটি কবিতায়। কবিতাটির নাম দ্য স্টোরি অব বনি অ্যান্ড ক্লাইড। সুধী পাঠক-পাঠিকার কৌতূহল নিবৃত্তির জন্যে মূল কবিতাটির প্রতিটি শব্দ মুদ্রিত হল নিচে :
Some day theyll go down together,
Theyll bury them side by side,
To a few itll be grief-to the law a relief–
But its death to Bonnie and Clyde.
* দক্ষিণী বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত। শারদীয় সংখ্যা।
বাদালোনা-র সেই লাশটি
ভুল যত সামান্যই হোক না কেন, তা যে সব সময়েই বুঝতে পারা যায় না–তা নয়। কিন্তু কঠিন হল এই ছোট্ট ভুল শুধরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি সত্যান্বেষী অপরাধবিশেষজ্ঞ হন, আর রহস্য সমাধানের গুরুভার যদি চাপানো হয় আপনার কাঁধে–তাহলে এই ছোট্ট ভুলই যে শেষকালে কি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, তা শুধু আপনিই হাড়ে হাড়ে টের পান। তদন্তের শুরুতেই যদি কোনওরকমে ভুলপথে চালিয়ে দেওয়া যায় আপনাকে, তাহলেই তুমুল বিপর্যয়ের মাঝে পড়ে সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে পড়তে আপনি বাধ্য।
প্রথম থেকেই আমার কেন জানি মনে হয়েছিল বাদালোনার খুনের কেসটাতে রহস্য রয়েছে প্রচুর। আপাতদৃষ্টিতে যত সরল মনে হয়েছিল, তত সরল নয় কেসটি। সমস্ত হত্যাপর্বটা এমনই গোলমেলে যে মেজাজ খিঁচড়ে গিয়েছিল আমার। খবরের কাগজে বর্ণিত লোমহর্ষক নাটক হিসাবেই প্রথম শুরু হয়, কাহিনি। স্বভাবমতো সাংবাদিকরা দিব্বি চাঞ্চল্যকরভাবেই পরিবেশন করেছিল খবরটা। কিছু কিছু আবছা ইঙ্গিত আর সম্ভাবনাও উল্লেখ করতে ভোলেনি। ১৯৩২ সালের মার্চ মাসের শেষাশেষি শুরু হয় এই সংবাদ-পত্ৰ নাটকের। বাদালোনার একটা ভিলায় মাটির নীচে একটি যুবতী মেয়ের লাশ পাওয়া গিয়েছে। বাদালোনা অবশ্য বার্সিলোনার কাছেই। সম্ভবত মাসখানেক আগে খুন করা হয়েছিল মেয়েটিকে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার বিকৃত দেহ। মুখ দেখে জানার উপায় ছিল না তার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু এইটুকু বোঝা গিয়েছিল যে বছর তিরিশ হবে তার বয়স।
বাড়িটা একতলা। মালিকের নাম অ্যান্তোনিও ক্যারিরা জানকোসা। মাস তিনেক আগে আর্জেন্টিনার এক ভদ্রলোককে বাড়িটা ভাড়া দিয়েছিলেন তিনি। ভদ্রলোকের নাম অরিলিও মার্তিনেজ। নিজেকে আর্জেন্টিনার বাসিন্দা বলে দাবি করলেও আসলে তিনি ছিলেন স্পেনের অধিবাসী।
লাশ পাওয়ার একমাস আগে এই ভদ্রলোকই বাড়ির চাবি মালিকের হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। দিনকয়েক পরে ঘরদোর তদারক করতে এলেন জাকোসা। তখনই কীরকম একটা গন্ধ পেলেন উনি। শুধু তাই নয়। লক্ষ্য করলেন মেঝের কয়েকটা টালিও আলগা হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের শরণ নিলেন জাকোসা। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম দিলেন মেঝের টালি সরিয়ে পরীক্ষা করা হোক। মাটি খুঁড়তেই পাওয়া গেল মেয়েটার দেহ। একটা থলির মধ্যে হাত-পা বাঁধা লাশটা ঠেসে সযত্নে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল মুখটা।
ড্রেসিং গাউন ছাড়া আর কিছুই ছিল না মেয়েটির পরনে। খবরের কাগজের সবজান্তারা লিখেছিল, গলা টিপে অথবা মাথায় চোট মেরে জীবনদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল হতভাগিনীর। লাশ পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন প্রায় তিরিশ বছর তার বয়স।
এখনও মনে পড়ে সেটা হাতে নেওয়ার পর বাদালোনায় গিয়ে কি পরিমাণে দমে গিয়েছিলাম আমি। অল্প কয়েকটি শহরতলী ভিলা দিয়ে গড়ে-ওঠা অঞ্চলটিতে জীবনের চঞ্চল স্রোতস্বিনী যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এরকম নিঝুম নিশ্চুপ জায়গা মোটেই ভালো লাগে না আমার। বিশেষ করে কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না খুন যেখানে হয়েছে, সেই ভিলাটিকে। পূতিগন্ধে ভরপুর বাতাসে যেন দম আটকে আসতে চায়। ঘরের মেঝেতে বিশাল একটা গর্ত দেখলাম। লাশটা থলিতে পাওয়া গিয়েছিল এই ঘর থেকেই।
তন্নতন্ন করে বাড়ি তল্লাস করে একগাদা পরিধেয়, একটা চশমা এবং একটা হাতব্যাগ জড়ো করলাম আমি, কতকগুলো পোশাকে রক্তের দাগ লেগেছিল। বলাবাহুল্য জিনিসগুলো নিহত মেয়েটিরই। সারা তল্লাটে দারুণ গুজব ছড়িয়ে গিয়েছিল খুন যেই করুক না কেন, এই তার প্রথম খুন নয়। পাড়াপড়শীদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে একটু বুদ্ধি খরচ করলেই পুলিশের কর্তারা এই মৃত্যু-ভবন থেকে আরও অনেক লাশ আবিষ্কার করতে পারবে। গুজবগুলো যে নেহাতই গুজব এবং ভিত্তিহীন, তা না বললেও চলবে। সেই কারণেই প্রথমেই বলে নিয়েছি আমি কেসটার প্রকৃত রহস্য ধরতে না পারার ফলেই এতখানি জটিল হয়ে উঠেছিল এই তদন্ত পর্ব।
