জুলাই মাসে গাড়ি হাঁকিয়ে গেছে আয়োয়া-র মধ্যে দিয়ে এবং খুন জখম লুঠপাট করে গেছে টাকার ঘাটতি দেখা দিলেই। শেষে ঠাঁই নিয়েছে মিসৌরির একটা ট্যুরিস্ট ক্যাম্পে।
কিন্তু জিরেন পায়নি। কেবিন থেকে চুপিসাড়ে বেরোনো আর ঢোকা, জানলা দরজায় অষ্টপ্রহর পরদা টেনে রাখা–এইসব দেখেই সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। ডবল কেবিনকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পুলিশের বেড়াজাল ভেদ করে বেরিয়ে আসে পুরো দলটা। ভয়াল ভয়ঙ্কর ত্রয়ীর গায়ে আঁচড় না লাগলেও মাথায় তিন-তিনটে বুলিটের ক্ষত বহন করতে হয়েছে বাক-কে। আর ব্লাঞ্চি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল জানলার ভাঙা কাঁচের টুকরো চোখে-মুখে আছড়ে পড়ায়।
.
চিকেন খানা
দলের প্রত্যেকেই তখন মরিয়া। খিদে আর তেষ্টায় কাহিল তো বটেই; বাক মরতে বসেছে; বনি আর ব্ল্যাঞ্চি দুজনেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। খাদ্য, পানীয়, ডাক্তার, ওষুধ দরকার এখুনি। তাই একজন গেল সরাইখানা থেকে পাঁচটা চিকেন রোস্ট কিনতে বাকি সবাই লুকিয়ে রইল আয়োয়ার ডেক্সটারে–একটা নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে।
গ্রামে-গঞ্জে তখন সাড়া ফেলেছে বারো গ্যাং। কাজেই পাঁচটা চিকেন খানা একসঙ্গে বিক্রি হতেই খবর চলে গেল পুলিশের কাছে। দুশো পুলিশ এসে ঘিরে ফেলল পাঁচজনকে।
আবার গুলিবিদ্ধ হল বাক-এবার উরুতে, কাঁধে আর পিঠে। ব্ল্যাঞ্চি মুমূষু স্বামীর বুকের ওপর আছড়ে কেঁদে উঠল উন্মাদিনীর মতো–মারা যেও না..মারা যেও না…দোহাই তোমার…মারা যেও না! কিন্তু নেহাতই কপাল খারাপ বাক আর ব্লাঞ্চির।
ছদিন পর প্রলাপ বকতে-বকতে হাসপাতালে শেষ ঘুম ঘুমোল বাক। ব্ল্যাঞ্চি তখন পাশে নেই। রয়েছে জেলখানায়। সেখান থেকে আদালতে। দশ বছর জেলখাটার শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয়েছিল সদ্য বিধবা হয়েও।
অব্যাহত ছিল কিন্তু বনি আর ক্লাইডের প্রলয়-অভিযান। বাক আর ব্ল্যাঞ্চিকে পুলিশ যখন পাকড়াও করছে, জোন্স, ক্লাইড আর বনি তখন গুলি বর্ষণের প্রলয় সৃষ্টি করছে। হেঁটে নদী পেরিয়েছে। ওপারে পৌঁছে আবার একটা গাড়ি চুরি করেছে। অজানার অভিযানে গা ভাসিয়েছে। লক্ষ্মীছাড়ার মতোই দুরন্ত গতিবেগে ধেয়ে চলেছে–কোথায়? তিনজনের কেউই তা জানে না।
দুশো পুলিশের ব্যুহ ভেদ করে আসা কম হিম্মতের কথা নয়। একেবারে অক্ষত অবস্থায় বেরোনো যায় না। জোন্সের মাথাতেও চোট লেগেছিল সামান্য ক্লাইডের একটা বাহুতেই বুলেট বিধেছিল চারবার। মাথার ক্ষত সেরে যেতেই ভেগে পড়েছিল জোন্স। বনি আর ক্লাইড ফিরে গেছিল ডালাসে। অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর আর জানুয়ারি–এই চার মাস ডালাসেই কাটিয়েছে। ঘুমিয়েছে। গাড়ির মধ্যে। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করেছে লুকিয়ে-চুরিয়ে নিরালা জায়গায়। বিরামবিহীনভাবে চুরি করেছে গাড়ি, লুঠ করেছে দোকানপাট আর পেট্রলপাম্প।
.
দুই স্বর্ণকেশী
এবারও ধরা পড়তে-পড়তে দুজনে বেঁচে গেছে স্রেফ বনির বুদ্ধির জোরে। সোনালি রঙের একটা পরচুলা জোগাড় করে ক্লাইডকে পরিয়ে দিয়েছিল বনি। সাজিয়ে দিয়েছিল মেয়েদের সাজে। বলেছিল–বোকা পুলিশগুলো খুঁজছে এমন দুজনকে যাদের একজন পুরুষ আর একজন স্বর্ণকেশী। দুজন স্বর্ণকেশীকে তো খুঁজছে না। ধোঁকাবাজিতে কাজ হয়েছিল। বোকা পুলিশদের নাকের ডগা দিয়ে প্রতিবার পগারপার হয়েছে ধুরন্ধর বেপরোয়া দুই খুনে ডাকাত যাদের নীতিজ্ঞানের বালাই নেই একেবারেই!
১৯৩৪-এর ১৬ই জানুয়ারি কাজের ছক পালটে নিল বনি আর ক্লাইড–রে হ্যামিলটনের ২৬৩ বছরের বন্দিদশা ঘুচিয়ে দিয়ে। দুঃসাহসের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত রেখে গেল হান্টসভিল কারাগারে। গাড়ি হাঁকাল বনি, কয়েদিদের কাজের জায়গায় ঝোঁপের মধ্যে অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখল ক্লাইড, নিজেও মেসিনগান চালিয়ে সাহায্য করল রে হ্যামিলটনকে পালিয়ে যেতে। গুলি খেয়ে প্রাণপাখি উড়ে গেল একজন ওয়ার্ডারের। রে হ্যামিলটনের সঙ্গে চম্পট দিল আরও চারজন কয়েদি।
অতি দ্রুত কাজে নেমে পড়ল হ্যামিলটন। হানা দিয়ে গেল একটার পর একটা ব্যাঙ্কে। অবশ্যই ক্লাইড নিয়েছিল বড় রকমের ভূমিকা–হ্যামিলটন যদিও তা স্বীকার করেনি পুলিশের কাছে। দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে যে কটা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে–প্রত্যেকটির পেছনে ছিল বনি আর ক্লাইড এ বিশ্বাস পুলিশের মাথায় এনে দিয়েছে অনেক প্রমাণ অনেক সাক্ষী।
পয়লা এপ্রিল রোববার ডালাসের কাছে গ্রেপআইনে দুজন হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে টক্কর লাগল বনি, ক্লাইড আর হ্যামিলটনের সঙ্গে পালিয়ে আসা একজন কয়েদির। নিমেষমধ্যে মেশিনগান চালিয়ে দুই অফিসারকেই খতম করে দিল তিন নরঘাতক। পাঁচ দিন পর ওকলাহোমা-র মিয়ামির কাছে একজন পুলিশকে সটান গুলি করে যমের দক্ষিণ দুয়ার দেখিয়ে দিল বনি। সে বেচারা গোপন খবর পেয়েই ছুটে এসেছিল এক স্বর্ণকেশীর সঙ্গে দুই পুরুষকে চোরাই ফোর্ড গাড়ির মধ্যে দেখতে!
বারো গ্যাংকে পরলোকের পথ দেখিয়ে দেওয়ার জন্যে তখন কিন্তু উঠে পড়ে লেগেছে ওকলাহোমা, লুইসিয়ানা আরকানসাস আর ক্যানসাসের সমস্ত পুলিশ। অনেকেই বলে নাকি পুলিশকে খবর দিয়েছিল মেথভিনের বাবা। মেথভিন সেই কয়েদির নাম যাকে হ্যামিলটনের সঙ্গে জেলের মাঠ থেকে উদ্ধার করেছিল বনি আর ক্লাইড। পুলিশে খবর দিয়ে মেথভিনকে বাঁচাতে চেয়েছিল পিতৃদেব! পুলিশের সঙ্গে এই চুক্তি না হলে নাকি সেবারেও নাজেহাল হতে হত আরক্ষাবাহিনীকে তাণ্ডব কাণ্ড ঘটিয়ে ফের উধাও হয়ে যেত দুই রুদ্রমূর্তি।
