.
তাড়া খাওয়া জন্তু
পুলিশের অকর্মণ্যতার জন্যেই এতদিন ধরে এত কুকর্ম করে যেতে পেরেছে দুজনে। আরও একটা কারণ আছে। সারা আমেরিকা জুড়ে নেমেছে সেই সময়ে নৈরাশ্যের নিষ্ক্রিয়তা। সেই সঙ্গে বেড়েছে অপরাধ করার হিড়িক। একই পুলিশকে সামলাতে হয়েছে সবদিক।
তবে হ্যাঁ, বহুবার ধরা পড়তে-পড়তে বেঁচে গেছে বনি আর ক্লাইড। ১৯৩৩ এর মার্চে মিসৌরির জোপলিনে একটা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে আত্মগোপন করেছিল বনি, ক্লাইড আর জোন্স। সঙ্গে জুটেছিল ক্লাইডের ভাই বাক আর ভ্রাতৃবধূ ব্ল্যাঞ্চি। পাড়াপড়শিদের কিন্তু সন্দেহ হয়েছিল। প্রত্যেকেই অভিজাত শ্রেণির মানুষ। প্রকৃতই খানদানী। নতুন ভাড়াটেদের হাবভাব দেখে তাই ঘাবড়ে যায় একজন প্রতিবেশী। পুলিশকে সে-ই খবর দিয়েছিল। বলেছিল–এ আবার কীরকম ভাড়াটে? তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো ভয়েভয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকে আর বেরোয়?
টনক নড়েছিল পুলিশের। দু-গাড়ি বোঝাই সশস্ত্র আদমি এসেছিল তদন্ত করতে। গুলির ঝড় বয়ে গেছিল পরমুহূর্তেই। তারই মধ্যে উধাও হয়ে গেছিল পুরো দলটা বুলেটের চোট অবশ্য এড়োতে পারেনি ক্লাইড আর জোন্স। সামান্য জখম হয়েছিল দুজনেই। কিন্তু জানে খতম হয়ে গেছিল দুজন পুলিশ আর একজন আহত হয়েছিল মারাত্মকভাবে।
পরের মাসেই পলাতকদের খবর পাওয়া গেল লুই সিয়ানা, ওকলাহোমা, মিনেসোটা আর আয়োয়া-র গোটা কয়েক অঞ্চল থেকে। ডাকাতি হয়ে গেছে প্রতিটি অঞ্চলেই। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে। ফলে গা ঝাড়া দিয়েছে পুলিশ। হন্যে হয়ে খুঁজছে খুনে ডাকাতদের।
টুরিস্ট ক্যাম্পে থাকা যে আর নিরাপদ নয় বুঝল বনি আর ক্লাইড। অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকা আরও বিপজ্জনক। তাই নিশাযাপন করত চুরি করা গাড়ির মধ্যে। এক গাড়ি ফেলে চুরি করত আর একটা গাড়ি! রাতের পর রাত এইভাবে কাটিয়েছে চোরাই গাড়ির মধ্যে।
ঘুমোনোর কষ্ট গায়ে মাখেনি দুজনের কেউই। যত চিন্তা পোশাক নিয়ে। নোংরা পোশাক পরে থাকা তো সম্ভব নয়! গায়ে কাদা ময়লা থাকলেও চলবে না। ফিটফাট থাকতে গেলে যেটুকু ঝুঁকি নিতে হয়–তা নিতে হয়েছে বইকি। জামাকাপড় কাঁচতে দিয়ে গেছে ছোট শহরের কোনও ধোপার কাছে। নিয়ে গেছে দিন কয়েক পরে। জোন্স আর ক্লাইড চুলকাটা আর দাড়ি কামানোর জন্যে নাপিতের কাছে গেছে ঠিক এইভাবে। একজন গুলিভরা রিভলভার নিয়ে পাহারা দিয়েছে। গাড়িতে বসে–আর একজন তখন গাল আর মাথা পেতে দিয়েছে নাপিতের ক্ষুর আর কঁচির কাছে।
বেশ কিছুদিন এইভাবেই স্রেফ কপাল জোরে মরতে মরতে বেঁচে গেছে পুরো দলটা। বনি কিন্তু বুঝেছিল, চিরকাল ভাগ্য সহায় হবে না। একদিন বলেও ফেলেছিল,–মরবার আগে মাকে আর একবার দেখতে চাই। কিন্তু সে সুযোগ এসেছিল প্রায় এক বছর পরে। রক্তাক্ত শেষ বিদায় নিয়ে এসেছিল বনি আর ক্লাইড মায়েদের কাছ থেকে।
ইতিমধ্যে একটা দুর্ঘটনা বাঁধিয়ে বসেছিল ক্লাইড। গাড়ি চালাচ্ছিল ঘণ্টায় সত্তর মাইল গতিবেগে। টেস্কাসের ওয়েলিংটনে খাদের ওপর ব্রিজটা যে ধসে পড়েছে, তা নজরে আনেনি। শূন্যে দুবার ঘুরপাক খেয়ে গাড়ি গেঁথে গেল খাদের তলদেশে আগুন লেগে গেল তৎক্ষণাৎ। শূন্যপথেই ক্লাইড ছিটকে বেরিয়ে গেছিল অবশ্য তার আগেই। বনি চাপা পড়েছিল জ্বলন্ত গাড়ির তলায়।
.
মৃত্যুর সামনে
অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গিয়ে ক্লাইড দৌড়ে এসেছিল প্রাণপ্রিয়দের প্রাণে বাঁচাতে। জোন্সকে টেনে বের করেছিল ভেতর থেকে–সেই সঙ্গে উদ্ধার করেছিল অতীব মূল্যবান অস্ত্রাগার বেশ কিছু মেশিনগান আর রিভলভার। এদিকে তারস্বরে চেঁচিয়ে গেছে বনি–ক্লাইড, প্লীজ! টেনে বার করতে না পারলে গুলি করো আমাকে!
একা ক্লাইড কোনওদিনই উদ্ধার করতে পারত না বনিকে যদি না সাহায্য করত একজন চাষা আর খেত মজুর। দুর্ঘটনার আগাগোড়া তারা দেখেছে ছুটেও এসেছিল। হাতাহাতি করে আধপোড়া বনিকে এরাই টেনে বের করেছিল অনল-পরিবৃত যন্ত্রযানের তলা থেকে। ঠাই দিয়েছিল খামার বাড়িতে। কিন্তু তারপরেই সন্দেহ করে বসে অতিথিদের। গোপনে খবর পাঠায় পুলিশকে। কিন্তু চুলের ডগাও ছুঁতে পারল না তিন মূর্তির। বন্দুকবাজি করে হাওয়া হয়ে গেল বনি, ক্লাইড আর জোন্স।
ভাই আর ভ্রাতৃবধু, বাক আর ব্লাঞ্চির সঙ্গে যোগাযোগ করে আরকানসাসের ফোর্ট স্মিথের কাছে ট্যুরিস্ট ক্যাম্পের একটা ডবল কেবিন ভাড়া নিল ক্লাইড। বনি তখন প্রলাপ বকছে মৃত্যুর বুঝি আর দেরি নেই। মুখে-মুখে রাশিরাশি মিথ্যে বলে গেল ক্লাইড। স্টোভ ফেটে যাওয়ায় নাকি পুড়ে গেছে বনি। চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার জোগাড় করেছে। যদিও পুরো তল্লাট জুড়ে তখন পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে ভয়াল ভয়ঙ্কর ত্রয়ীকে ক্লাইড নিরুদ্বেগে ট্যুরিস্টদের বোকা বানিয়েছে, ডাক্তারকে ধোঁকা দিয়েছে তাঁর উপদেশমতো বনিকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব নয় বলে তাকে দিয়েই ট্যুরিস্ট কেবিনে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে নার্স মোতায়েন করেছে।
খুবই কড়া স্নায়ু থাকলে এত কাণ্ড করা সম্ভব হয়। কিন্তু শুধু নার্ভের জোর থাকলেই তো চলবে না টাকার জোরও যে দরকার। কাজেই নিতান্তই নিরুপায় হয়ে হাতের কাছের একটা ব্যাঙ্ক আর দুটো মণিহারি দোকানও লুঠ করেছে। এই কর্ম করতে গিয়ে গণ্যমান্য এক ব্যক্তিকে গুলি করে পরলোকে পাঠিয়েছে এবং তারই গাড়ি হাঁকিয়ে অকুস্থল থেকে চম্পট দিয়েছে। পরিশেষে ট্যুরিস্ট ক্যাম্প থেকেও।
