সেইদিন পর্যন্ত বারো গ্যাং এত টাকা একবারে কখনও রোজগার করেনি। গুলিবর্ষণও করতে হয়নি। করার দরকারও হয়নি। বারো গ্যাং যে গুলি করে মানুষ খুন করতে বড্ড মজা পায় এ খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল আগুনের মতো। তাই রুদ্রমূর্তিদের দেখে কেউ আর হঠকারিতা দেখায়নি– বাধা দেয়নি। ফলে, রক্তারক্তিও হয়নি।
একগাদা ডলার নিয়ে খুনে ডাকাতদের দল উৎসব করতে গেল মিচিগানে হ্যামিলটনের বাবার বাড়িতে। হ্যামিলটনের শেষদিন ঘনিয়ে এল সেখানেই।
অত্যধিক মদ্যপান করেছিল হ্যামিলটন। বড় বেশি কথাও বলে ফেলেছিল। ফলে ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। চালান করা হল টেক্সাসে। উপর্যুপরি ডাকাতি আর হিস্করো মার্ডারের অভিযোগে তাকে ২৬৩ বছরের জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া হল জেলখানায়।
বেচারা! হিস্করো মার্ডারের মধ্যে হ্যামিলটন কিন্তু জড়িত ছিল না কোনওমতেই।
কিন্তু ধর্মের কল নড়ে যে এইভাবেই।
.
অতৃপ্ত কামনা
যে হ্যামিলটন পচুক জেলে বনি আর ক্লাইডের বয়ে গেছে তাতে! দুজনেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে প্রমোদভ্রমণে। পকেটে প্রচুর টাকা, হাতে অঢেল সময় আর মনে অপার ফুর্তি। মিচিগান থেকে ক্যানসাস, ক্যানসাস থেকে মিসৌরীপুরো সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর মাস গেল পকেট ফতুর করতে। সবসেরা হোটেল, খানদানী রেস্তোরাঁ আর চড়া দামের জামাকাপড় বিলাসিতার অন্ত নেই দুজনেরই। ছেলেবেলায় দুজনেই বিবিধ অনটনে কাটিয়েছে–তারই প্রতিক্রিয়া প্রকটভাবে প্রকাশ পেল জামাকাপড়ের খুঁতখুঁতুনির মধ্যে। ফিটফাট সাজগোজ না হলে মনের ময়লা যেন কাটতে চায় না কিছুতেই। চুল আর মুখের সৌন্দর্য বাড়াতে বনি নিয়মিত যেত হেয়ারড্রেসার আর বিউটি পারলারে। ফলে, দুমাসেই উড়ে গেল লুঠের টাকা–পকেটে রইল মাত্র দুটো ডলার! অতএব পুনরায় ডাকাতি না করলেই নয়! গা ঝাড়া দিল দুই নরাধম। টেক্সাসের শেরমান শহরের হাওয়ার্ড হল নামে এক ৬৭ বছরের বৃদ্ধ কসাইকে পেটে গুলি করল পর-পর তিনবার একটি মেয়ে। চুল তার সোনালি। লুটে নিয়ে গেল বুড়োর সমস্ত টাকা।
কিন্তু সোনালি চুল কার?
কার আবার, বনির! হেয়ারড্রেসারের কাছে গিয়ে রূপবতী হওয়ার সাধনায় মেতেছিল যে গত দুমাস!
লুঠতরাজ আর নরহত্যার ঝড় বয়ে গেল মিসৌরীর নানা জায়গায়। কার্থেজে একটা ব্যাঙ্ক লুঠও করল দুজনে। সবই ঝোঁকের মাথায়–আচমকা। কোনওরকম প্ল্যান প্রোগ্রাম না করেই।
ব্যাঙ্ক লুঠ করে কিন্তু লাভ হয়নি তেমন। পাওয়া গেছিল মাত্র আশি ডলার!
নৈরাশ্য-নিপীড়িত বনি আর ক্লাইড নবীন উদ্যমে তাই লুঠ করতে গেছিল আর একটা ব্যাঙ্ক। প্ল্যান না করেই গেছিল। তাই গিয়েই দেখেছিল…
চারদিন আগে উঠে গেছে বিশেষ সেই ব্যাঙ্ক!
এর পরের খুনটাও করেছে দুজনে একই রকম হঠাৎ খেয়ালের বশবর্তী হয়ে। বাঁধাধরা কাজ নেই, কাজের ছকও নেই ইচ্ছে হল–খুন করা যাক একটা। ব্যাপারটা ঠিক তাই।
এই সময় উইলিয়াম ড্যালিয়েল জোন্স নামে একটি ষোল বছর বয়সের কিশোরকে দলে টেনে নেয় ক্লাইড। নিছক দল ভারী করার উদ্দেশ্যে নয়। মূল কারণটা ছিল অতিশয় কদর্য।
বনির যৌন কামনা মিটিয়ে উঠতে পারছিল না একা ক্লাইড। তাই নাকি উইলিয়ামকে দরকার হয়ে পড়েছিল।
উইলিয়াম ছেলেও তেমনি। যেন একই ছাঁচে তৈরি। ক্লাইডের ছেলেবেলা যেমন কেটেছে পশ্চিম ডালাসের আধাবস্তি অঞ্চলে–উইলিয়ামের আশৈশব ইতিহাস ছিল তাই। নষ্ট-চরিত্র অকালপক্ক বদ কিশোর। ক্লাইডকে পুজো করত সাক্ষাৎ অবতারজ্ঞানে।
ক্লাইডও চাইছিল এই রকম একটি সেঁপো এঁচোড়েপাকা ছোকরাকে। হ্যামিলটন গেছে জেলে। বনির যৌনখিদের কিছুটা সে মিটিয়ে এসেছিল এতদিন। উইলিয়ামকে পেয়ে তাই বাঁচল ক্লাইড।
তিনজনে মিলে টেক্সাসের টেম্পল শহরে একটা গাড়ি চুরি করতে গিয়ে প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিল গাড়ির মালিকের ছেলে ডয়াল জনসনের। বনি বলেছিল পরে–বাধা দিতে গেছিল কেন ছোঁড়া? এত বড় স্পর্ধা কবজি চেপে ধরে জোন্সের? গুলি করতে তাই বাধ্য হয়েছিল জোন্স। ক্লাইড কিন্তু ভীষণ রেগে গেছিল জোন্সের ওপর–খামোকা রক্তগঙ্গা বওয়ানোর জন্যে!
সেদিনের তারিখটা ছিল পাঁচই ডিসেম্বর, ১৯৩২। পুলিশ কিন্তু বিশ্বাস করেনি বনির ভঁওতাবাজি। গুলি চালিয়েছিল আসলে ক্লাইড। পরের মার্ডারটাও করেছিল নিজের হাতে। নতুন বছরের সূচনাতেই জানুয়ারি মাসের ছতারিখে ঠান্ডা মাথায় বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ডেপুটি শেরিফ ম্যালকম ডেভিসের নশ্বর দেহ।
অথচ ক্লাইডের মুখোমুখি হওয়ার আদৌ কোনও ইচ্ছেই ছিল না ডেপুটি শেরিফের। ফাঁদ পাতা হয়েছিল ওডেল চ্যান্ডলেস নামে আর একজন ব্যাঙ্ক ডাকাতকে পাকড়াও করার জন্যে।
বেপরোয়া ক্লাইড না জেনে পা দেয় ফাঁদে এবং অম্লান বদনে খুন করে ম্যালকমকে।
১৯৩৩-এর জানুয়ারি থেকে ১৯৩৪-এর মে মাস পর্যন্ত কত ডাকাতি আর কত খুন যে করেছে বনি আর ক্লাইড–তার ফর্দ করা সম্ভব হয়নি পুলিশের পক্ষে। খুন আর ডাকাতির পরিসমাপ্তি ঘটেছিল কিন্তু ওই মে মাসেই–পুলিশের হাতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মর্ত্যধাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয় বিকারগ্রস্ত বনি আর ক্লাইড। যে গাড়িতে বসে তারা লড়াই চালিয়েছিল পুলিশের সঙ্গে–সেটিও গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত রোজগার করে গেছে দুজনে বিরামবিহীন লুঠতরাজের মাধ্যমে–এ ছাড়া পেট আর মন ভরাবার আর কোনও পন্থা তাদের পছন্দ হয়নি। খুন করেছে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো ধরা পড়ার সম্ভবনা এলেই মুখর করেছে আগ্নেয়াস্ত্রকে–পরিণাম চিন্তা করেনি কখনওই।
