ক্লাইডের কাণ্ড দেখে হতবাক হলেও তার অনুরোধ রেখেছিল কয়েদি-বন্ধুরা। মাথার ওপর তুলে ধরেছিল ধারালো কুঠার। এক কোপে বাঁ পায়ের পাতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল দু-দুখানা আঙুল।
এরই নাম ক্লাইড! কশাই ক্লাইড! অভীষ্ট সিদ্ধির জন্যে কোনও কাজই পরাঙ্মুখ নয়।
হাড়ভাঙা খাটুনি বন্ধ হল আঙুলহারা ক্লাইডের। হাঁটাচলা করার জন্যে জেলখানা থেকেই তাকে দেওয়া হল একজোড়া ক্ৰাচ। এই ক্রাচেই ভর দিয়ে ঘুরে-ঘুরে সময় কাটাত নিষ্কর্মার ধাড়ি। এমন সময়ে ভগবান ক্লাইডের ভগবান–মুখ তুলে চাইলেন।
১৯৩২ এর ফেব্রুয়ারি মাসে জেল থেকে অকস্মাৎ খালাস পেল ক্লাইড। টেক্সাসের নতুন গভর্নর হয়ে এসেছিলেন একজন দয়াময়ী। সবাই তাকে মা বলে ডাকত। নামটাই হয়ে গেছিল মা ফাগুসন। ইনি গভর্নর হয়েই সমস্ত কয়েদিদের মুক্তি দিলেন। ভালোভাবে থাকো, সৎপথে থাকো– এই ছিল তাঁর বিদায়বাণী।
একই সদুপদেশ দিয়েছিলেন বনির গর্ভধারিণী মিসেস পার্কার। বলেছিলেন–এবার আক্কেল হয়েছে তো? শুধু নিজের জন্য নয়–অন্তত বনি মেয়েটার মুখ চেয়ে বাকি জীবনটা সরল পথে কাটিয়ে দাও।
জেল থেকে ফিরে বাড়ি ঢুকতেই হাসতে-হাসতে কাঁদতে কাঁদতে এই কথাই মিসেস পার্কার বলেছিল গুণধর ভাবী জামাইকে।
বচনে তুখোড় ক্লাইড তৎক্ষণাৎ আশ্বস্ত করেছিল শাশুড়িঠাকরুণকে এই ভাষায়–চেষ্টা আমি করে যাব। তবে কি জানেন, সরলপথে বেঁচে থাকাটা আর তত সহজ হবে না। কে কাজ দেবে আমাকে? তাছাড়া যখনি যেখানে ডাকাতি হবে–গোয়েন্দারা ডাকাতদের টিকি ধরতে না পারলেই আমাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবেই। চাকরি যদিও বা পাই, সে চাকরি থাকবে না।
চাকরির চেষ্টা করেছিল বইকি ক্লাইড। খুবই সাধারণ দাসত্ব মাথা পেতে নেওয়ার প্রথম প্রয়াসে ছিল বিলক্ষণ আন্তরিকতা। ওর এক বোনের বান্ধবীর স্বামী কাজ করত ম্যাসাচুসেটস্ এর একটা ঘরবাড়ি তৈরির কোম্পানিতে। ক্লাইডকে সে কথা দিয়েছিল–চাকরি জুটিয়ে দেবেই একই কোম্পানিতে।
কিন্তু ম্যাসাচুসেটস্ তো দশ-পা দুরের জায়গা নয়–দেশের একেবারে অন্য প্রান্তে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেক দূরের জায়গায় ক্লাইড গেছে বহুবার–কিন্তু এতদুরে তো কখনও যায়নি।
গৃহছাড়া ক্লাইডকে এতদূরের জায়গায় বড় একা-একা থাকতে হয়েছিল পুরো আধমাস! তারপর বাড়ির জন্যে এমনই মন কেঁদে উঠল যে আর তাকে সেখানে ধরে রাখা গেল না।
পুলিশের ভয়ে জুজু হয়ে থাকতেও ভালো লাগছিল না ভালোমানুষ ক্লাইডের। তাই একদিন ফিরে এল পশ্চিম ডালাসে। ফিরে আসার কারণটা ধানাইপানাই করে বুঝিয়ে দিলে এইভাবে–সারাটা জীবন যদি পুলিশের চোখ এড়িয়েই আমাকে থাকতে হয়, তাহলে এমন জায়গায় থাকতে চাই যেখান থেকে ঘাপটি মারা যাবে যখন তখন–দোস্তদের সঙ্গে দহরম-মহরম করে আসা যাবে।
এর ঠিক তিনদিন পর…মানে, ম্যাসাচুসেটস্ থেকে সৎকর্মের সুযোগ ছেড়ে ক্লাইডের ফিরে আসার ঠিক তিনদিন পর…গৃহত্যাগ করল বনি।
মাকে বলে গেল–হিউসটনে একটা কাজ পেয়েছি। দোকানে বসে কসমেটিকস্ বিক্রির কাজ।
কথাটা ডাহা মিথ্যে। দু-বছরব্যাপী রক্তঝরানো অভিযানে ক্লাইডকে সঙ্গ দিতে ঘর থেকে পথে নেমেছিল বনি। ডাকাতি আর নরহত্যার অভিযানে। পরে এই খুনে ডাকাতদের দলটারই নাম হয়েছিল বারো গ্যাং। জনগণের পয়লা নম্বর শত্রু। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বিভীষিকা সৃষ্টি করে বেরিয়েছিল একটানা দু-বছর!
তখন মার্চ মাস, ১৯৩২ সাল। বারো গ্যাং-এর প্রথম নরহত্যা অনুষ্ঠিত হল সতেরোই এপ্রিল। টেক্সাসের হিরো শহরে জন ডব্লিউ বুচার নামে এক মণিকারকে গুলিতে-গুলিতে ঝাঁঝরা করে ছাড়ল শোণিতপিপাসুরা। লুঠ করল কত? মাত্র চল্লিশ ডলার!
মাত্র চল্লিশ ডলারের জন্যে খুনটা তাহলে করল কোন নরাধম? ক্লাইডের সাফাই যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে অন্তত এই ঘটনায় সে নিষ্পাপ। ক্লাইড গাড়ি চালাচ্ছিল–দলবলকে গাড়িতে তুলে চম্পট দিয়েছিল।
গুলি চালিয়েছিল দলের দুই স্যাঙাত!
বনি তখন কোথায়?
ঠিক এই ঘটনার সময়ে সে তখন জেলখানায়। গাড়ি চুরির অপরাধে ধরা পড়েছিল পুলিশের হাতে। ছাড়া পেয়েছিল তিনমাস পরে কিন্তু নিষ্কৃতি পেয়েছিল গাড়ি চুরির অপবাদ থেকে।
আর ঠিক এই সময়েই হত্যা-পাগল ক্লাইড নতুন স্যাঙাত নের হ্যামিলটন এবং আরও দুই দোস্তকে নিয়ে যমালয়ে পাঠিয়েছে ওকলাহোমার ওটোকা শহরের ডেপুটি শেরিফ মুরকে।
আচমকা গুলি বর্ষণটা ঘটেছিল একটা নাচঘরের বাইরে। আকণ্ঠ মদ্যপান করছিল ক্লাইড আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা। একজন স্যাঙাত আস্ত একটা হুইস্কির বোতল টেনে নিয়ে গলায় উপুড় করে দিতেই ডেপুটির সহকারী ম্যাক্সওয়েল বলে উঠেছিল–ঢের হয়েছে। এবার থামাও! এসব লোচ্চামো এখানে চলে না।
কথাটার মধ্যে অন্যায় ছিল না এতটুকুও। কেননা, শহরে তখন মদ্যপান নিষিদ্ধ। কিন্তু রক্তপাগলদের রক্ত গরম হয়েছিল হুকুম শুনেই। গর্জে উঠেছিল রিভলভার। ডবল বুলেট বেরিয়ে গেছিল মুর-এর মাথা আর বুক ফুঁড়ে–পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়েছিল নিমেষ মধ্যে। মারাত্মকভাবে জখম হয়ে মুখ থুবড়ে ফুটপাতে আছড়ে পড়েছিল ম্যাক্সওয়েল।
বনি জেল থেকে বেরিয়েই নাচতে নাচতে ভিড়ে গেল ক্লাইড আর হ্যামিলটনের দলে। বেশ কিছু স্যাঙাত জুটিয়ে নিয়ে বাজপাখির মতো ছোঁ মারল টেক্সাসের গ্র্যান্ড প্রেরির একটা পেট্রল পাম্পে। সাড়ে তিন হাজার ডলার লুঠ করে উধাও হয়ে গেল ঝড়ের বেগে।
