ভুল! ভুল! মা হয়েও মেয়েকে তিনি চিনতে পারেননি।
বনি সব জানত। পরিচয়ের প্রথম পর্বেই নরপিশাচ ক্লাইড তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝে ফেলেছিল–এই সেই বিরল কন্যা যার কাছে তার যাবতীয় দুষ্কৃতির কেচ্ছা অকপটে বিবৃত করা যায়। তাই কিছুই গোপন করেনি ক্লাইড। সাত-সাতটা অপরাধের ইতিবৃত্ত সগৌরবে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল নিবিষ্টচিত্ত শ্রোতা বনির কর্ণরন্ধ্রে৷
পুলকিত হয়েছিল বনি। খুবই! এই বয়েসেই এত কুকীর্তি। অহো! অহো! মনুষ্যদের মধ্যে এমন প্রাণী যে অতিশয় দুষ্প্রাপ্য।
এহেন মনের মানুষকেই কিনা রাত ভোর হতেই চোখের সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে গেল। বেআক্কেলে পুলিশ!
প্রচণ্ড ক্রোধে তাই ফেটে পড়েছিল বনি। বিপুল নৈরাশ্যে আচ্ছন্ন হয়েছিল তার চিত্তাকাশ! হায়! হায়! হায়! কত স্বপ্ন সে দেখেছিল এই একটা রাতেই। অজস্র রোমাঞ্চ কল্পনায় বিভোর ছিল সুখনিদ্রায়! কত স্বপ্নই দেখেছিল একটি মাত্র বিভাবরীতে সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেল হতচ্ছাড়া পাজি বদমাশ পুলিশবাহিনী!
রাগ হবে না? হওয়াই উচিত! অন্তত বনির মতো ডাকসাইটে মেয়ের। নতুন মানুষটাকে বুকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল যে আরক্ষাবাহিনী, তাদের সে ক্ষমা করতে পারেনি আমৃত্যু শুধু এই কারণেই।
কিন্তু মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখে প্রিয়তমের ছবি বুকে নিয়ে দু-দুটো বছর প্যান প্যান করে কেঁদে কাটিয়ে দেওয়ার মানুষ নয় বনি–সে যে কী ধাতু দিয়ে তৈরি তা তার গর্ভধারিণী জননীও অতিবড় দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে উঠতে পারেননি। তা না হলে তিনি বলেন–ক্লাইড ছোঁড়াটাই যত নষ্টের গোড়া। ওই হাবাতেটার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমার মেয়ে অপরাধ কী জিনিস জানত না–অপরাধীদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াত না!
মায়েরা অন্ধ হন চিরকালই। মিসেস পার্কারের তাই দোষ নেই।
বলা যাক বনির কথা। ক্লাইড তো গেল হরিণবাড়ি, মানে, জেলে। বণি কিন্তু পণ করল, এইরকম একটা ক্ষণজন্মা পুরুষকে দু-দুটো বছর জেলখানার পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখলে দেশের বিরাট ক্ষতি অনিবার্য! সুতরাং অবিলম্বে তার মুক্তির ব্যবস্থা করা যাক।
বলা বাহুল্য, ব্যবস্থাটা আইনের পথে নিশ্চয় নয়। বিলক্ষণ প্রশান্তচিত্তে একদা এক শুভলগ্নে একটা রিভলভার নিয়ে জেলে ঢুকল বনি–পাচার করে দিলে ক্লাইডের হাতে।
রক্ত নেচে উঠল ক্লাইডের ধমনীতে। মারণাস্ত্রকে কোমরে লুকিয়ে রেখে রইল সুযোগের প্রতীক্ষায়। এবং সুযোগ যখন এল, তখন উপর্যুপরি রিভলভার নির্ঘোষে সচকিত হল জেলখানা। উধাও হয়ে গেল শ্রীমান ক্লাইড।
একা নয়–সঙ্গে আরও দুজন জেলখাটা আসামিকে নিয়ে।
কিন্তু জেলখানার জাল পা থেকে ছাড়াতে পারল না অত চটপট। আবার শ্রীঘরে ফিরে আসতে হল অল্পদিনের মধ্যেই–
না, না, জেল থেকে পালানোর নিছক অপরাধে নয়–আরও একটা আনকোরা অপরাধ করে ফেলায়।
হাত নিশপিশ করছিল ক্লাইডের। বনের পাখিকে খাঁচায় পুরে রাখলে তার মনে ময়লা লাগবেই। এই ময়লা সাফ করার জন্যেই যেন পাগল হয়ে গেছিল ক্লাইড। তাই আর তর সইল না।
ওহিও-র মিডলটন শহরের রেলওয়ে অফিসে হানা দিল ক্লাইড। দুর্বার বেগে তছনছ করে দিয়ে গেল গোটা অফিস। লুটপাট, ডাকাতি। একাই একশো।
মন তাতে একটু শান্ত হল বটে, কিন্তু অশান্ত হল পুলিশবাহিনী। বড় চতুর, বড় দক্ষ সে দেশের নগর রক্ষীরা, তাই ঝটপট জালে ফেলে তুলে নিল শ্রীমান ক্লাইডকে! চালান করল আদালতে। আদালত থেকে শ্রীঘরে। এবার দয়াদাক্ষিণ্য, কৃপা, অনুকম্পা নয়–পুরো চোদ্দ বছর বনবাস, থুড়ি, শ্রীঘরবাস করতে হবে ক্লাইড মহাপ্রভুকে।
এবং এই শ্রীঘরবাসের ফলেই বেশ খানিকটা পালটে গেল ক্লাইড। ছেলেবেলা থেকেই যে ছিল বুনো, দামাল, দুর্বার কিন্তু স্নেহকোমল–জেলখানায় থেকে সে হল কুলিশকঠোর এবং তিক্ত। সুকুমার মনে অপরকে ভালোবাসার যেটুকু প্রবৃত্তি প্রচ্ছন্ন ছিল–হরিণবাড়ির রূঢ় বাস্তবতায় তা উবে গেল একেবারেই। জেলখানায় থেকে ক্লাইড হয়ে গেল পুরোপুরি নিষ্করুণ, নির্দয়, নির্মম!
টেক্সাসের জেলখানা তো আর প্রমোদকেন্দ্র নয়–পিকনিক করার জায়গায়ও নয়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যেতে হত আসামিদের রৌদ্রতপ্ত তুলোর খেতে। কাজে ঢিলেমি দিলে অথবা এত খাটতে পারছি না বলে গাঁইগুই করলেই রাম ধোলাইয়ের ব্যবস্থাও আছে। মারের চোটে চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে ছাড়ে পিতৃপুরুষের নামও বিস্মৃত হতে হয়। মার খেয়ে এবং ক্লান্ত গতরে কাহিল হয়ে গেলেও রাত নামলেই ছুটে-ছুটে সমস্ত রাস্তা পেরিয়ে ফিরে আসতে হয় জেলখানায় খাঁচাবন্দি হতে। ঘোড়ায় চড়ে ওয়ার্ডাররা তাড়িয়ে নিয়ে যায় চাবুকের সুমধুর সঙ্গীত শোনাতে-শোনাতে এবং কশাঘাতের তীব্র জ্বলুনি সওয়াতে-সওয়াতে। পিছিয়ে পড়লেই চাবুক আর চাবুক! পালানোর প্রশ্নই ওঠে না।
.
প্রথম নরহত্যা
সুতরাং কাজ না করার একটা উপায় বের করতে হয়েছিল কয়েদিদের। বড় অভিনব উপায়। শুনলেও গা শিরশির করে।
গোড়ালির করা অর্থাৎ টেন্ডন কেটে দিত নিজেরাই। অমানুষিক পরিশ্রম থেকে পলায়নের অমানুষিক প্রক্রিয়া।
সোনার চাঁদ ক্লাইড এগিয়েছিল আরও একধাপ বেশি। জনাকয়েক কয়েদিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নৃশংসতম একটা কাজে তাকে সাহায্য করতে রাজি করিয়েছিল। বাঁ পাখানা তাদের সামনে এগিয়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল বন্ধু কয়েদিদের–হাঁ করে দেখছ কী? চালাও?
