সেই রাতেই সিমেন্ট সিটির বাড়িতে বনি এল ক্লাইডকে সঙ্গে নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কত কথাই বলে গেল দুজনে। কথা যেন আর ফুরোয় না। আশ মিটিয়ে দুজনে দুজনকে দেখছে তো দেখছেই।
রাত গম্ভীর হল। এত রাতে দুরন্ত মেয়ের রহস্যময় বন্ধুকে তো আর বলা যায় না বাপু হে, এবার পথ দেখো। চোখ যার সাপের মতো–তাকে অন্তত সাফ কথাটা বলতে পারেননি মিসেস পার্কার। উলটে বসবার ঘরে একটা বড় সোফায় তার শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
পরে বলেছিলেন–যাক বাবা, বাঁচা গেল! রয় সরে পড়ার পর থেকেই হেদিয়ে মরছিল মেয়েটা। ক্লাইডকে নিয়ে মেতেছে–ভালোই করেছে।
.
যে কাজ অপরাধীদের মানায়
রয়! সে কে?
পুরো নাম তার রয় থর্টন। যে বয়েসে ছেলেমেয়েরা নির্মল মেলামেশা আর খেলাধুলোয় মেতে থাকে–সেই বয়েসেই রয়ের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম এবং ইত্যাদি চালিয়ে গেছে বনি। যৌনপিপাসার নিবৃত্তি ঘটাতেই মাত্র ষোল বছর বয়েসে প্রিয়তম রয়কে বিয়েও করে ফেলেছিল বনি। যার প্রতিটি রক্তকোষ কামনার লেলিহান শিখায় সদা উদ্দীপ্ত–তার পক্ষেই মানায় এতটা বেহায়াপনা।
কিন্তু শাশুড়িঠাকরুণের দাপটে বিয়ে ভেঙে দিতে হয় বছর কয়েকের মধ্যেই। ছেলের ওপর ধকল যাচ্ছে দেখে ছেলের মা স্থির থাকতে পারেনি। দূর দূর করে খেদিয়ে দিয়েছে খুদে বউকে– যার লাসলা আর কামনা, দেহের আর মনের খিদে মিটোনোর ক্ষমতা ছিল শুধু একজনেরই ক্লাইডের!
বিতাড়িত হয়ে মায়ের কাছে ঠাই পেয়েছে বনি। আবার এই মা-ই ক্লাইডকে ঠাই দিয়েছে। বাড়িতে প্রথম দর্শনের দিনেই। বনির জীবনে তাই একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছে এই মা। ক্লাইডের কাছেও মা ছিল শ্রদ্ধা আর সম্মান, ভালোবাসা আর পরম আশ্রয়ের স্থল। আতঙ্কের পর আতঙ্ক সৃষ্টি করে দুজনে যখন বেশ কয়েকটা স্টেটের পুলিশ বাহিনীকে সন্ত্রস্ত আর সজাগ করে তুলেছে তখনও পুলিশের চোখে বেমালুম ধুলো দিয়ে বনি আর ক্লাইড হাসতে হাসতে দেখা করে গেছে যে-যার মায়ের সঙ্গে। প্রতিটি অভিযান রোমাঞ্চকর এবং রক্তঝরানো–তবুও পুলিশ তাদের টিকি ধরতে পারেনি।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন কুলিশকঠোর করাল নির্মম চরিত্র আর আছে কিনা সন্দেহ।
বনি আর ক্লাইডের মিলন ঘটে যাওয়ার দিন থেকেই বলা যায় শুরু হয়ে গেল ওদের যৌথ অ্যাডভেঞ্চার। মিসেস পার্কারের দৌলতে বড় সোফায় শুয়ে নিরুদ্বেগে নাক ডাকাচ্ছে ক্লাইড রাতভোর হয়েছে, ভোরের পাখি ডাকছে…এমন সময় পুলিশ হানা দিল সেই ঘরেই!
ক্লাইডকেই চাই তাদের। কেন? কারণটা শুনে মিসেস পার্কার তো থ! চোখ দেখেই নাকি মানুষ চেনা যায় ক্লাইডের সাপের মতো চোখ দেখে তাহলে তিনি অকারণে শঙ্কিত হননি।
ছোটখাটো মেয়েলি চেহারার ছোকরার গুণের তো ঘাট নেই! এই বয়সেই গাড়ি চুরি করেছে বেধড়ক, ডাকাতি করেছে হাসতে-হাসতে। এক-আধটা নয় সাত-সাতটা চার্জ ঝুলছে তার বিরুদ্ধে। সপ্ত অপরাধে অপরাধী ফিচেল ছোকরা এর পরেও ভিজে বেড়ালের মতো নিরীহ নিপাট ভদ্রলোক সেজে প্রেম করতে পারে তার মেয়ের সঙ্গে এবং যেন ভাজামাছটি উলটে খেতে জানে না–এমনি শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকের মতো অমন বিচ্ছিরিভাবে নাসিকা গর্জন করে ঘুমোতে পারে প্রণয়িনীর বসবার ঘরে?
বেচারি মিসেস পার্কার! ভেবেছিলেন, প্রথম জামাই সরে পড়ার পর দ্বিতীয় জামাইকে নিয়ে দিনগুলো শান্তিতে কাটাবেন। কিন্তু এ কী আপদকে সোফায় ঘুমোতে দিয়েছেন? এ যে খাল কেটে কুমির ডেকে আনা!
বনি কিন্তু চেঁচিয়ে-মেচিয়ে একসা করেছিল। তার চোখের সামনেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে ক্লাইডকে? এত বড় স্পর্ধা? হিস্টিরিয়া রোগে পেয়েছিল তাকে সেই মুহূর্তে! তারপর কিন্তু চোখের পাতা আর কঁপেনি।
একেবারেই না। নরহত্যা, চুরি, ডাকাতি আর গুলিবৃষ্টির ঝড় বইয়ে দিয়েছে দুজনে মিলে কিছুদিন পর থেকেই। দাঁতে চুরুট কামড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়েছে মুখে–আগ্নেয়াস্ত্রের ঘোড়া টিপে ধূম্রজাল রচনা করেছে নগরে-নগরে। চিত্ত চঞ্চল হয়নি এতটুকুও। মনের মানুষকে পেয়ে বনি দেখিয়ে দিয়েছে নারী নারকীয় হতে পারে কতখানি।
জেলখানায় থাকতেই হত ক্লাইডের টানা চোদ্দো বছর। কিন্তু ভিজে বেড়ালের গাঁটে-গাঁটে কুচুটে বুদ্ধির তো অন্ত নেই। তাই ভেবেচিন্তে সাতটা অপরাধের মধ্যে তিনটে অপরাধের আদ্যোপান্ত স্বমুখে নিবেদন করল আদালতে৷ অপরাধী নিজেই যখন অপরাধ স্বীকার করে, কবুল জবাব দেয়– তখন ধর্মাবতারের কঠিন প্রাণ গলে যায়, শাস্তির বহর কিঞ্চিৎ কমিয়ে দেন।
ধুরন্ধর ক্লাইড এমন অভিনয় করে গেল যেন নিদারুণ আত্মগ্লানি আর অনুশোচনা তাকে কুরেকুরে খাচ্ছে ভেতর থেকে। বোকা বনে গেল প্রত্যেকেই। চোদ্দ বছরের জায়গায় মাত্র দু-বছরের শ্রীঘর বাসের সাজা মাথা পেতে নিয়ে মুখ টিপে হেসে জেলখানার চেহারাটা দেখতে গেল ক্লাইড।
কৌতূহলী পাঠিক পাঠিকা নিশ্চয় জানতে ইচ্ছুক, কড়া ধাতের মেয়ে বনি সাধারণ মেয়ের মতো অত চেঁচামেচি করেছিল কেন ক্লাইডকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ে?
খুবই সমীচীন কৌতূহল!
বনির মা মিসেস পার্কার সর্পচক্ষু ভাবী জামাইয়ের অতীত কাহিনি কিছুই জানতেন না। তাই তিনি ভেবেছিলেন এবং পরে সবাইকে বলে দিলেন–আহা রে! সদ্য ভালোলাগা মানুষটা এত কুকাণ্ড করে বসে আছে, জানতে পেরে মেয়ে আমার বড় শ পেয়েছিল!
