না! না! একেবারেই না!
যুগল-খুনে ডাকাত ছাড়া তাদের আর কিছুই বলা যায় না। বড় মাপের খুনি নয়, ডাকাতও নয়। রবিনহুড বা বিশে ডাকাতের মতো মহান আর দরদি ছিল না তারা কস্মিনকালেও। লুঠ করেছে নিছক নিজেদের স্বার্থে–দশের কল্যাণের জন্যে নয়। নরহত্যা করেছে নির্বিচারে কেবল মাত্র ধরা পড়ার ভয়ে। পুলিশকে ঘৃণা করত তারা সমস্ত অণু-পরমাণু দিয়ে অধিকাংশ নীচুদরের অপরাধীর মতোই। নরশোণিতের তৃষ্ণা জাগ্রত হয়েছে মজ্জাগত এই ঘৃণা থেকেই। আমেরিকার পয়লা সারির খুনে গুন্ডারা বলত, জনসাধারণের এক নম্বর শত্রু হল বনি আর ক্লাইড।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল তারা এদের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে।
বনি আর ক্লাইড! দুবৃত্তদেরও দিবানিশির আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল অতি সাধারণ দুটি ছেলে আর মেয়ে। ছিমছাম ব্যাঙ্ক ডাকাতদেরও, মাথা হেঁট হয়ে যেত এদের এক একটা নারকীয় কীর্তির পর। খুন! খুন! খুন! খুন করাটাই ছিল তাদের একমাত্র উকট উল্লাস। জাহান্নমে যাওয়া এক কিশোর আর এক কিশোরীর অন্তরের অন্দরে এহেন পৈশাচিক আনন্দের চাহিদা এল কীভাবে, এবার তা দেখা যাক।
.
প্রচণ্ড প্রেম
ক্লাইডের পুরো নাম ক্লাইড চেস্টনাট বারো। বাবা ছিল টেক্সাসের গরিব চাষা। আট ছেলে মেয়ে। ষষ্ঠজন এই কীর্তিমান ক্লাইড।
ক্লাইডের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের চব্বিশে মার্চ। ছেলেবেলা থেকেই অতিশয় বদমেজাজি। মাথায় রক্ত চড়ে যেত একটুতেই। ভয়ানক অবাধ্য আর একগুঁয়ে। আর একটা গহিত বাসনা সুপ্ত ছিল তার চরিত্রে তখন থেকেই সমকামিতা!
কিন্তু তার প্রচণ্ড প্রেম ছিল মাত্র দুটি বস্তুর ওপর।
একটি ধ্বংসের দূত, আর একটি গতিবেগের।
বন্দুক আর মোটরগাড়ি ছিল তার জীবনের সব চাইতে প্রিয়…প্রাণের চাইতেও।
ক্লাইড-চরিত্রের সবচেয়ে ভয়ানক দিকটি ছিল কিন্তু তার মানসিক বিকৃতি। স্যাডিজ! অপরকে কষ্ট দিয়ে বুকভরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত বাচ্ছাবেলা থেকেই। আর এই মানসিক বিকৃতির জন্যেই অমানুষিক নিষ্ঠুরতা প্রশ্রয় পেয়ে এসেছে তার চরিত্রে কঁচা বয়স থেকেই।
ক্লাইডের পৈশাচিক প্রবৃত্তির কিছু কিছু ঘটনা পাওয়া গেছে তার বাল্যবন্ধুদের কাছ থেকে। সাক্ষী আছে প্রতিবেশীরাও। মুরগি ছানার ঘাড় মুচড়ে রগড় দেখত ক্লাইড–মরো মরো না হলে ছাড়ত না। একটা জীবন্ত প্রাণীকে অকারণে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়ে নারকীয় উল্লাস চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলত, যা নাকি নজিরবিহীন। যন্ত্রণায় ছটফট করত মুরগি ছানা, পরমানন্দে তা প্রত্যক্ষ করত ক্লাইড। কখনও-সখনও পাখা ভেঙে দিত পাখির। ভাঙা ডানা নিয়ে ওড়বার বৃথা চেষ্টায় যখন ঘুরে-ঘুরে আছড়ে পড়ত হতভাগ্য বিহঙ্গ–অকপট হর্ষে অট্টহাস্য করত ক্লাইড।
বনি মেয়েটাও একসময়ে শক্ত ধাঁচের মেয়ে বলে নাম করেছে। মেয়েরা সিগারেট খায়– কিন্তু চুরুট খায় কি? বনি কিন্তু দাঁতে কামড়ে চুরুট খেত পাকা চুরুটখেকোদের মতো। যেন ইস্পাত দিয়ে গড়া বনি বালিকা বয়স থেকেই অতিরিক্ত যৌনক্ষুধায় ছটফট করেছে। রতিক্রিয়ায় ভঁটা দেয়নি কখনও।
ক্লাইডের চেয়ে বয়েসে সে ১৮ মাসের ছোট। তবে সামাজিক প্রতিপত্তির দিক দিয়ে ক্লাইডের চেয়ে এক ধাপ উঁচুতেই ছিল বলা যায়। ক্লাইডের বাবা ছিল চাষা। আর বনির বাবা তৈরি করত ইট।
বনির বাবা মারা যান বনির চার বছর বয়সেই। পুরো ফ্যামিলিটা তখন চলে আসে টেক্সাসে। ডালাসের কাছে সিমেন্ট সিটিতে আস্তানা নেয়।
ক্লাইড কিন্তু তার আগে থেকেই আসর জাঁকিয়ে বসেছিল পশ্চিম ডালাসে। বাবা চাষবাস করে সংসার চালাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিল বলেই মাঠ ছেড়ে চলে আসে পেট্রল পাম্পের ব্যবসায়। গাড়ি আসছে এন্তার, খালি তেল ভরে দেওয়া। রোজগার মন্দ হচ্ছিল না।
বনি আর ক্লাইডের প্রথম দেখাশুনা কবে কীভাবে হয়েছিল–তা কিন্তু সঠিক জানা যায়নি। বেধড়ক খুন আর ডাকাতি করে যাওয়ার ব্যাপার-স্যাপারগুলো যেমন রহস্যাবৃত খুঁটিনাটি বিবরণ জানা যায়নি কোনওদিনই–ঠিক তেমনি এই কীর্তিধন্য ব্যক্তি দুটির প্রথম মিলন কাহিনিও ধোঁয়াটে রয়ে গেছে আজও।
তবে বনির মা মিসেস পার্কারের মুখে যে ঘটনাটা শোনা গেছে, অজস্র রোমান্টিক রটনার মধ্যে সেইটাকেই খুবই সম্ভাব্য বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। ক্লাইডের বয়স যখন একুশ আর বনি সবে উনিশ বছরের জন্মদিবস পালন করেছে–সেই সময়ে দেখা হয় দুজনের দৈবাৎ। বনির এক বান্ধবী ছিল ক্লাইডেরও বান্ধবী। কমন ফ্রেন্ড। মেয়েটির হাত ভেঙে যাওয়ায় তার সেবায় উঠে পড়ে লেগেছিল ক্লাইড। বনি আর ক্লাইডের ঘটনাবহুল জীবন-সড়কের মিলন ঘটেছিল হাতভাঙা এই মেয়েটির বিছানার পাশে।
বনিকে দেখেই পটেছিল ক্লাইড। প্রথম দর্শনেই প্রেম। এমন কিছু আহামরি দেখতে ছিল না বনি। ছোটখাটো আকৃতি। পাঁচ ফুট লম্বাও নয়। চোখের রং নীল। নির্লজ্জভাবে উদ্ধত আর বেহায়া। লাল মুখ।
ক্লাইডকেও এক নিমেষ ভালোবেসে ফেলেছিল বনি, অথচ চোখ যার সাপের মতো, চালচলন যার মেয়েলি–তাকে মেয়েরা চট করে জীবনমরণের সখা বলে বুকে জড়িয়ে ধরে না!
কিন্তু ভবিতব্য এড়ানো যায় না। অন্যদের কাছে এই দুই মূর্তি অচল হতে পারে–দুজনে দুজনের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠল পলক দর্শনেই।
শুরু হয়ে গেল বনি আর ক্লাইডের যুগল ক্রীড়া। রক্তজমানো বুক কাঁপানো ঘটনার পর ঘটনা।
