গেল ওপরে। গুদোম ঘরের তাকে রাখা চাবি দিয়ে দেরাজ খুলে রত্নমুকুট হাতে নিয়ে বললে ব্যাঙ্কারকে, মশায় আপনি এর আরেকটা কোণ ভাঙতে পারবেন? আঁতকে উঠলেন ব্যাঙ্কার। হোমস ততক্ষণে গায়ের জোর দিয়ে কোণ ভাঙতে আরম্ভ করে দিয়েছে। কিন্তু না পেরে বললে, দেখলেন তো? যদিও বা কেউ ভাঙতে পারে এমন জোর আওয়াজ হবে যে পাশের ঘর থেকে ঠিকই শুনতে পাবেন।
তাহলে? ঢোঁক গিলে বললেন ব্যাঙ্কার।
আপনার ছেলে আর যাই হোক চোর নয়। বলে ভদ্রলোককে ফের রাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল হোমস। যাওয়ার আগে বলে গেল, কাল সকাল নটায় আসবেন বাসায়।
বেকার স্ট্রিটে ফিরেই হোস ছদ্মবেশ ধরল। লোফারের ছদ্মবেশ। বেরিয়ে গেল শিস দিতে দিতে। অনেকক্ষণ পরে ফিরে এসে একজোড়া বুট ওয়াটসনের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে আবার নামল রাস্তায়। সারারাত বাইরে থেকে ফিরল পরের দিন ভোরে।
নটার সময়ে ব্যাঙ্কার ভদ্রলোক আসতেই হোমস বললে, এক-একটা বেরিল রত্নের জন্যে হাজার পাউন্ড দিতে রাজি?
দশ হাজার দেব।
অত চাই না। এই নিন কলম। চেক বার করুন। লিখুন চার হাজার পাউন্ড–আমার পারিশ্রমিক সমেত। বাঃ, উঠে গিয়ে দেরাজ খুলে রত্নমুকুটের ভাঙা কোণটা এনে ব্যাঙ্কারের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বললে, খুশি?
আলেকজান্ডার হোল্ডারের তখন হয়ে এসেছে। দু-চোখ প্রায় ঠেলে বেরিয়ে আসে আর কি! হোস কি তুকতাক জানে?
গম্ভীর কণ্ঠে বললে হোমস, আর একটা ঋণশোধ বাকি রইল আপনার।
খপ করে চেক-বই তুলে নিয়ে বললেন ব্যাঙ্কার, বলুন কত পাউন্ড?
পাউন্ড নয়–ক্ষমা চাইতে হবে। আপনার ছেলের কাছে। আর্থার ছিল বলেই রত্নমুকুট ফিরে পেয়েছেন। নইলে পুরোটাই যেত। দুশো পাউন্ড না চেয়ে পায়নি বেচারি। ঘুম আসছিল না রাত্রে। এমন সময়ে শুনল বাড়ি থেকে জানলা-পথে পাচার হয়ে গেল রত্নমুকুট। দেখে আর চুপ করে থাকতে পারেনি। জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে বেদম ঠেঙিয়ে চোরের হাত থেকে ছিনিয়ে আনে রত্নমুকুট। চোরের মাথা ফেটে যায় ওর মারে হাতের মধ্যে থাকে শুধু মুকুটের ভাঙা কোণ। জানলা দিয়ে বাড়ি ঢুকে দড়াম করে পাল্লা বন্ধ করে দোতলায় উঠে ভাঙা মুকুটের কোণ সিধে করার চেষ্টা করছিল আর্থার–আপনি তাকে চোর বলায় আর মুখ খোলেনি।
কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?
দেখলাম গলির বরফে জুতো পরে কে যেন পায়চারি করেছে–আর একজন খালি পায়ে সেই দাগ মাড়িয়ে গিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেখলাম জুতো পায়ে লোকটা দৌড়ে পালিয়েছে রক্তের ফোঁটা পড়তে পড়তে গেছে। গোবরাট পরীক্ষা করে দেখলাম আর্থার জানলা দিয়েই লাফিয়ে নেমেছিল। তাই ছদ্মবেশে চোরের বাড়ি গিয়ে চাকরের সঙ্গে ভাব জমিয়ে মনিবের একজোড়া বুট জোগাড় করলাম। আপনার গলিতে এসে পায়ের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম। ফিরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করলাম চোরকে। এমনিতেই তার মাথা ফেটেছিল। তারপর আমার রিভলভার দেখে উগড়ে দিল রত্নের হদিশ। বিক্রি করেছিল ছশ পাউন্ডে–আমি কিনে নিলাম হাজার পাউন্ডে।
কিন্তু চোর কে? কে রত্নমুকুট পাচার করেছিল তার হাতে? রাগে ফেটে পড়লেন ব্যাঙ্কার।
আপনি কিন্তু ধরে ফেলেছেন–তাই না?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
রাত্রে দরজা বন্ধ করতে এসে কাকে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন আলেকজান্ডার হোল্ডার?–মেরীকে। ভাঙা মুকুট দেখেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল কে?–মেরী।
বাড়িতে কেউ আসে না একজন ছাড়া। কী তার নাম? স্যার জর্জ বার্নওয়েল। পাজি নচ্ছার বদমাস।
সরলা মেরী পটে গিয়েছিল এই বদমাসের মিষ্টি বচনে। শুতে যাওয়ার আগে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণের মানুষকে জানিয়েছিল রত্নমুকুটের বৃত্তান্ত। শুনেই প্রেয়সীর কাছে মুকুট ভিক্ষা করেছিল স্যার জর্জ।
মেয়েরা সব পারে–প্রেমে পড়লে। সুতরাং কাকামণিকে পথে বসাতে দ্বিধা করল না মেরী। গভীর রাতে মুকুট এনে তুলে দিল পরমপ্রিয়কে। ওপর থেকে আর্থার দেখল, স্তম্ভিত হল, কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি হারাল না। খামোকা চোর বদনাম শুনেও ফাঁসিয়ে দিল না মেরীকে।
কিন্তু মেরী কোথায়? কর্মফল ভোগ করতে পালিয়েছে স্যার জর্জের সঙ্গে।
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ১৩৮২।
বনি আর ক্লাইড
দিবসরজনীর বিভীষিকা ছিল ওরা…
মরণের ডঙ্কা বাজিয়ে গেছে নগরে নগরে…
এক কিশোর আর কিশোরীর রুধির-পিপাসার রক্তাক্ত কাহিনি।
.
হলিউডের ফিল্ম ক্যামেরা বিপুল গ্ল্যামার এনে দিয়েছে বনি আর ক্লাইডের শোণিতসিক্ত জীবন
উপাখ্যানে। সময় অনেক কিছুই গ্রাস করে, আবার অনেক কিছুকেই মর্যাদা দেয়। বনি আর ক্লাইড এমনই দুটি ব্যক্তি যাদের মহাকাল মুছে ফেলতে পারেনি, রুপোলি পরদার মহিমায় যারা কলঙ্কিত চরিত্র নিয়েও বীরত্বের শিরোপা পেয়েছে।
রবিনহুড চরিত্রকে কেন্দ্র করে কিংবদন্তীর অভাব নেই। বনি আর ক্লাইডও বহু আশ্চর্য কিংবদন্তীর স্রষ্টা। রবিনহুড ছিল ধনীর ত্রাস। গরিবের সহায়। বনি আর ক্লাইডও ছিল নিয়মের নিগড় পরা সমাজে বিদ্রোহের বহ্নিশিখা। লড়ে গেছে আমৃত্যু নিজেদের দাবি আদায়ের সংগ্রামে, সারা আমেরিকা জুড়ে তখন নেমেছে নৈরাশ্যের নিকষ তমিস্রা। বনি আর ক্লাইড নগরে-নগরে উড়িয়েছে মরণের কেতন, খেলেছে রক্তের হোলিখেলা।
কিন্তু সত্যিই কি মাথায় তুলে নাচার মতো মানুষ ছিল বনি আর ক্লাইড?
