অ্যালবার্ট ক্যামপিয়ন, এতক্ষণে নড়ে উঠলেন চেয়ারে। বললেন, গিলকিক গুলি খেয়েছে চার দেওয়ালের মধ্যে। তার মধ্যে দুটো দেওয়াল হচ্ছে নিরেট কংক্রিটের বাকি দুটো দেওয়াল হচ্ছে রক্তমাংসের–কনস্টেবল ক আর খ।
ওটু, রক্তমাংসের দেওয়াল কি নির্ভরযোগ্য?
বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন ওটস্।
বিড়বিড় করে শুধু বললেন, ও মাই গড! পরক্ষণেই বাই-বাই করে ছুটলেন থানায়।
খবর এল যথাসময়ে। কনস্টেবল ক ছুটিতে গেছে আজ সকালেই। লাশটা পাচার করেছিল সে-ই–পাছে ছুটি নষ্ট হয়, এই ভয়ে।
কিছু বুঝলেন? লাশটা কোথায় পাচার হয়েছিল?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
বালির গাদার সামনে থেকে ডানদিকের গ্যাসপোস্ট পর্যন্ত–যেখান থেকে শুরু হয়েছে কনস্টেবল খ-য়ের এখতিয়ার।
কাফের দোতলা থেকে ডোনোভান গুলি করেছিল গিলকিক-কে। গুলি খেয়ে গিলকিক টলতে-টলতে মুখ থুবড়ে পড়ল বালির গাদার সামনে। কনস্টেবল খ এসে দেখল, মহা মুশকিল। নিজের এলাকায় খুন হওয়া মানেই তদন্তে জড়িয়ে পড়া। ছুটি বাতিল হবেই।
কনস্টেবল খ সেই মুহূর্তে টহল দিতে ঢুকেছে ভেতরে। ফঁকিবাজ ক লাশটাকে তুলে এনে শুইয়ে দিল খ-য়ের এলাকায়। তারপর ছাড়ল পুলিশী হাঁক।
ক্লিয়ার?
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ৮ই ফাল্গুন, ১৩৮১।
স্যার আর্থার কোনান ডয়ালের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
ফিরোজা নিয়ে ফেরেববাজি। শার্লক হোমস
আগের রাতে খুব বরফ পড়েছিল লন্ডনে। বরফ জমা রাস্তার ওপর দিয়ে তুর্কি নাচ নাচতে
নাচতে এক ভদ্রলোক এলেন শার্লক হোমসের আস্তানায়।
কাল রাতে তার সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।
কী সর্বনাশ? শুধোল হোমস।
বেরিল-মুকুটের নাম শুনেছেন তো? জাতীয় সম্পত্তি বললেই চলে। উনচল্লিশটা অমূল্য বেরিল রত্ন আছে তাতে। একটা রত্ন হারালেও জোড়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাল রাতে মুকুট থেকে খোয়া গেছে তিন-তিনটে রত্ন।
কী করে?
আমি ব্যাঙ্কার। আমার নাম আলেকজান্ডার হোল্ডার। গতকাল মুকুটটা বন্ধক রেখে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড নিয়ে গেলেন মুকুটের মালিক কথা রইল চারদিন পর ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। ব্যাঙ্ক লুঠ আকছার হচ্ছে বলে মুকুটটা আমি বাড়ি নিয়ে এলাম। দেরাজে রাখলাম। রাত্রে খেতে বসে আমার অপোগণ্ড ছেলে আর্থার আর মা লক্ষ্মী ভাই-ঝি মেরীকে বললাম মুকুটের কথা। সুন্দরী ঝি লুসী হয়তো বাইরে থেকে সে কথা শুনেছিল। হাসতে-হাসতে আর্থার অবিশ্যি বলেছিল গুদোমের তাকে রাখা চাবি দিয়ে দেরাজ নাকি খোলা যায়। ও নিজে খুলেছে ছেলেবেলায়।
আর্থার মামরা ছেলে। আর বিয়ে করিনি। আদর দিয়ে নিজেই তার মাথা খেয়েছি। এখন ক্লাবে গিয়ে অনেক কাপ্তেন বন্ধু পাকড়েছে। যখন-তখন টাকা চায়। জুয়ো খেলতেও শিখেছে। স্যার জর্জ বার্নওয়েল ওর বড় দোস্ত। অতি পাজি নচ্ছার লোক। প্রায় বাড়ি আসে। আর্থার ওর খপ্পর থেকে বেরোতে পারছে না। সে ছাড়া বাড়িতে অন্য কেউ আসে না।
মেরীর বাপ-মা নেই। আমার কাছেই মানুষ। বড় ভালো মেয়ে। দু-দুবার আর্থার ওকে বিয়ের প্রস্তাব জানিয়েছে। রাজি হয়নি মেরী। হলে এই সর্বনাশ হত না। আর্থারকে ভালো করতে পারে কেবল সে-ই।
ঝিয়েরা সব পুরোনো লোক। আলাদা থাকে। লুসীই নতুন। কাজের মেয়ে। কিন্তু রূপসি বলে অনেক ভোমরাকে আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়।
কাল রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আর্থার এসে ফের দুশো পাউন্ড চাইল। হাঁকিয়ে দিলাম। মুখ কালো করে চলে গেল বটে কিন্তু পথে বসিয়ে গেল আমাকে।
শুতে যাওয়ার আগে আমি নিজে সারা বাড়ির দরজা-জানলা বন্ধ আছে কিনা দেখে নিচে নেমে দেখলাম জানলা খুলে দাঁড়িয়ে আছে মেরী। আমাকে দেখেই পাল্লা বন্ধ করে দিয়ে বললে, লুসী ফের রাস্তায় বেরিয়েছিল। ওকে একটু বকা দরকার।
মাঝরাতে দড়াম করে দরজা বন্ধ করার আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল আমার। পাশের ঘরে খসখস আওয়াজ শুনে এসে দেখি আর্থার মুকুট ভাঙবার চেষ্টা করছে দেরাজের সামনে দাঁড়িয়ে। খালি পা। পরনে নাইট ড্রেস। চোর-চোর করে চেঁচিয়ে উঠলাম। আমার চিৎকারে আর্থার ভীষণ রেগে উঠল। মুকুট কেড়ে নিয়ে দেখলাম, কোণটা ভাঙা। তিনটে বেরিল রত্ন উধাও। চিৎকার শুনে মেরি ছুটে এসেই অজ্ঞান হয়ে গেল কোণ ভাঙা রত্নমুকুট দেখে।
পুলিশ ডেকে আর্থারকে ধরিয়ে দিলাম। আর্থার কিন্তু রেগেমেগে যেন আমাকেই মারতে এল। রত্ন তিনটে কোথায় কিছুতেই বলল না। পুলিশও বলছে, রত্ন উদ্ধার তাদের ক্ষমতায় কুলোবে না। মিস্টার হোমস, আমাকে বাঁচান।
শার্লক হোমস সব শুনে অদ্ভুত কথা বলে বসল, আর্থার বেঁকা মুকুটকে সোজা করবার চেষ্টা করেনি তো?
শুনে তো ব্যাঙ্কারমশায় রেগে কঁই, কী! আপনি আমার বকাটে ছেলের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন?
আচ্ছা আর বলব না। চলুন আপনার বাড়ি যাওয়া যাক।
যাওয়ার পথে গুম হয়ে বসে রইল হোমস। ব্যাঙ্কারের বাড়ি পৌঁছে পকেট থেকে বার করল মস্ত একটা আতস কাঁচ। যে জানলার সামনে মেরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন ব্যাঙ্কার তার গোবরাট আর ফ্রেম দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তারপর নেমে গেল বাড়ির পাশে আস্তাবলের সামনেকার সরু গলিটায়। পুলিশ নাকি সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে দেখেছে–বাইরে উঁকিও মারেনি।
ওয়াটসন রইল বাড়ির মধ্যে। কিছুক্ষণ পরেই ঘরে ঢুকল মেরী। মুখ অতি বিষণ্ণ। ব্যাঙ্কারকে বললে মিনতি করে, আর্থার নির্দোষ। ওকে ছাড়িয়ে আনুন। কিন্তু ব্যাঙ্কার কোনও কথাতেই কান দিলেন না। এমন সময়ে বুট থেকে বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এল শার্লক হোমস। মেরীকে দেখে জিগ্যেস করল, লুসী রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যার সঙ্গে কথা বলছিল তার একটা পা কাঠের তৈরি, তাই না? শুনে হেসে ফেলল মেরী–হ্যাঁ। তরকারিওলার একটা পা কাঠেরই বটে হোমস কিন্তু হাসল না।
