মন্থর কণ্ঠে বললেন, একনাথ, আমার সেদিনকার রূঢ়তা মনে রেখো না। আজ কী পেলে?
একনাথ সংক্ষেপে গুটি কয়েক কথায় প্রতিবেদন পেশ করলেন।
গালে হাত দিয়ে শুনলেন উমানাথ। বুদ্ধিদীপ্ত চক্ষু সঙ্কুচিত হয়ে এল শেষের দিকে নাসিকারন্ধ্র ঈষৎ স্ফীত হল হাফপ্যান্ট ইত্যাদি উদ্ধারের কাহিনি এবং মর্মস্পশী অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তটা শুনে।
চোখ ফিরিয়ে চেয়ে রইলেন জানলা দিয়ে। একটা সিগারেট ধরালেন। মৃদু টান দিতে লাগলেন। মনে-মনে পর্যালোচনা করলেন সহকর্মীর অভিযান কাহিনি।
অবশেষে সিগারেটের দগ্ধাংশ ছাইদানীতে গুঁজে দিয়ে ফের তাকালেন ঘাড় বেঁকিয়ে।
বললেন, কুয়োটা দেখেছ?
একনাথ রায় আশা করেছিলেন নতুন পদনিদের্শ। কুয়ো দেখার কথা তিনি বলতে ভুল করেননি। তবু কেন সেই প্রশ্ন?
বললেন গাঢ় কণ্ঠে, দেখেছি।
কীভাবে দেখেছ?
ওপর থেকে ঝুঁকে। জল ছাড়া কিছু নেই।
আঃ! বলতে-বলতে রক্ত জমে উঠল উমানাথের ফরসা মুখে, জলের তলায় কী আছে দেখোনি কেন?
বিদ্রোহীকণ্ঠে একনাথ রায় বললেন, তা হলে তো পাশের পুকুরটার তলাতেও দেখতে হয়।
শক্তচোখে চাইলেন উমানাথ, একনাথ, বেলেঘাটার পুকুরের জলে জেলে জাল ফ্যালে, লুকোনোর পক্ষে তাই বাড়ির পাশের পুকুর নিরাপদ নয়। কিন্তু জেলে কি কুয়োতে জাল ফেলে?
আস্তে-আস্তে খাড়া হয়ে বসলেন একনাথ রায়। অনিবার্য সিদ্ধান্তটা নিমেষমধ্যে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়ল মাথার মধ্যে।
আমাকে মাপ করবেন স্যার। এখুনি যাচ্ছি।
.
ফিরলেন বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার পর।
লোকজন ডেকে জল ঘেঁচেছেন কুয়োর। স্নান হয়নি, আহারও হয়নি। নিজে দাঁড়িয়ে তদারক করেছেন।
কাজ হয়েছে উমানাথের তাড়নায়। তিরস্কারের পুরস্কার পেয়েছেন হাতে-হাতে। রোদ ঝলসানো উপবাসক্লিষ্ট কালো মুখেও তাই হাসির ঝলক ফুটেছে। বেশ কয়েকদিন পরে মনটা হালকা হয়েছে। দু-হাত পেছনে রেখে দাঁড়ালেন বস-এর সামনে।
স্নেহাস্পদর সহাস্য মুখ দেখে কৌতুক কটাক্ষ হানলেন উমানাথ।
কি হে, রাজ্য আর রাজকন্যে দুটোই জয় করে এলে নাকি?
আজ্ঞে না, সে রকম কিছু পাইনি।
তবে কি পেলে? আর একটা লাশ?
আজ্ঞে, তাও না।
তা হলে? মণিমাণিক্য সোনাদানা?
প্রায় সেইরকমই।–দামের দিক দিয়ে।
বলো কী! দেখাও তোমার সাগরহেঁচা মাণিক।
পেছন থেকে হাতজোড়া সামনে নিয়ে এলেন। একনাথ রায়। বললেন, এইটা।
জিনিসটা একটা লেডিজ শাল। কালো রঙের।
কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলেন উমানাথ। তারপর বললেন সবিস্ময়ে, মেয়েদের শাল। কিন্তু এর দাম হিরে জহরতের সমান হল কী করে?
আমার কাছে তাই।
চোখ চকচকর করল উমানাথের, মার্ডারের মেথড পেয়েছ?
আজ্ঞে।
এই শালটাই সেই মেথড?
বলতে পারেন।
হেঁয়ালি রাখো, একনাথ, ঈষৎ গলা চড়িয়ে বললেন উমানাথ। কি জেনেছ বলো।
আজ্ঞে, যা জেনেছি, তা আপনার সামনেই রয়েছে। শাল-টাই শেষ পর্যন্ত শাল দিল ফকিরচাঁদকে।
একনাথ!
আপনি ভাবুন। আমি যা বলবার আদালতে বলব। বলে, সবিনয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন একনাথ।
উমানাথ ভদ্র উপলব্ধি করলেন শুধু চ্যালেঞ্জ নয়–এই কদিনের রুক্ষ আচরণের পালটা জবাব দিয়ে গেলেন তার সুযোগ্য শিষ্য।
.
পরের দিন উমানাথ নিজেই উপস্থিত হলেন একনাথের অফিসকক্ষে। শিষ্যটি তখন ঘাড় হেঁট করে নোট লিখছেন খাতায়। পদশব্দে মুখ তুললেন এবং গাত্রোত্থান করলেন।
কতদূর এগোলে? জিজ্ঞাসা করলেন উমানাথ।
আজ্ঞে, আপনাকে একটা টিপস দিতে পারি।
কি রকম? তরল কণ্ঠ উমানাথের।
শাল-টা যার, সায়া-শাড়িও তার। একই স্ত্রীলোকের। নাম তার মহাকালী। পেশায় পতিতা। মাস দেড়েক সে ঘরে ফেরেনি। কিন্তু শালটা দেখেই ভাটিখানার মালিক চিনতে পেরেছিল। মার্কামারা শাল।
আর কিছু? নির্নিমেষে চেয়ে রইলেন উমানাথ।
ঠোঁট টিপে বললেন একনাথ, আজ্ঞে না।
বড় কঠিন ঠাঁই, মনে-মনে বললেন উমানাথ।
একনাথ বস-এর মুখ দেখে মনের ভাব অনুধাবন করলেন। সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হুকুম করলে কিন্তু আমি বলতে বাধ্য।
আত্মসম্মানে লাগল উমানাথের। বললেন, না থাক। দেখি আমি ভেবে।
কিন্তু অনেক ভেবেও কালো শাল থেকে হত্যার মেথড বার করতে পারলেন না।
.
আদালত প্রাঙ্গণ। সেদিন লোক হয়েছে খুব।
ফকির-ফিকিরের ফৌতি ব্যবসার কাহিনি পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা শহরে–সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নবীন পুলিশ অফিসার একনাথ রায়ের নাম।
আদালতে তাই আজ এত ভিড়। কেউ বলছে ফকির জন্মান্তরিত ঠগী সর্দার আমীর আলি। মা ভবানীর প্রসাদ নিয়ে পথিকদের গলায় ফাঁস লাগিয়ে পথে পুঁতে রাখত। এ জন্মে সে মায়ের প্রসাদে স্রেফ মন্ত্রের জোরে নরহত্যা করছে–বাঘা পুলিশ আর দুদে ডাক্তাররাও অপারগ হয়েছে হত্যার পদ্ধতি নির্ণয় করতে। কেউ বলছে তার চাইতেও লোমহর্ষক কাহিনি। ফকির-ফিকির যুগ্মভাবে নাকি হাজারখানেক হত্যা করেছে কলির ভীষ্ম একনাথ রায় আসরে অবতীর্ণ না হলে ছেলেপুলেরা কেউ নিরাপদ না। ইত্যাদি, ইত্যাদি…
সংক্ষেপে, সারা শহরে টি-টি পড়ে গিয়েছে ফৌতি ব্যবসা নিয়ে।
উৎকণ্ঠা চরমে উঠল একনাথ রায় প্রবেশ করতেই। হাতে একটা কাঠের বাক্স। ক্যাশবাক্স বলেই মনে হল। ডালার আংটা ধরে ঝুলিয়ে আনলেন এবং আসন গ্রহণ করলেন কাঠগড়ার সামনে।
জোড়া-জোড়া চোখ ছানাবড়ার আকারে স্থির হয়ে রইল বাক্সটার ওপর। কী আছে ভেতরে? ফকির ফিকিরের অজ্ঞাত রহস্য নিশ্চয় মনুষ্যবধের অভিনব উপকরণ।
