বিচারপতি প্রবেশ করলেন মঞ্চে। জুরীরা বসলেন যে যার আসনে। শুরু হল সওয়াল জবাব। যথা সময়ে ডাক পড়ল একনাথ রায়ের।
বাক্সটা হাতে নিয়ে কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ালেন একনাথ রায়। কাঠগড়ার সামনেই পেশকার পান্নাবাবুর টেবিল। বাক্সটা সেই টেবিলে রাখলেন।
পান্নাবাবুকে বললেন, একটা কাগজ দেবেন?
কাগজ এগিয়ে দিলেন পান্নাবাবু। ঝর্ণা কলম বার করে কাগজে কি লিখলেন একনাথ রায়। পেশকারের হাতে দিয়ে বললেন, ধর্মাবতারের টেবিলে রাখুন।
নীরবে হুকুম তামিল করলেন পান্নাবাবু। ধর্মাবতার কাগজ খণ্ডতে চোখ বুলোলেন। নিবিড় বিস্ময় ঘনীভূত হল চোখে। হুকুম দিলেন, ফকিরচাঁদ, ফিকিরলাল আর শ্রীশচন্দ্রকে বিপরীত দিকের কাঠগড়ায় হাজির রাখা হোক।
একনাথ রায় বাগাড়ম্বর করলেন না। মামলার সংক্ষিপ্তসার গুছিয়ে বললেন। সবশেষে বললেন, এই নরমেধ যজ্ঞের হোতা তিনজন–ফরিকচাঁদ, ফিকিরলাল এবং শ্রীশচন্দ্র। কিন্তু প্রমাণ নেই। আমি একটি খুনের দৃশ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপিত করব। দেখে বিচার করুন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই বলে এই কশাইদের লোকালয়ে ছেড়ে দিয়ে এতগুলি নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন করা উচিত হবে কিনা।
সামনের আসনে বসে ঘাড় বেঁকিয়ে তদগতচিত্তে সহকর্মীর ভাষণ শুনছিলেন উমানাথ। এখন আড়চোখে তাকালেন বিপরীত কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান তিন আসামির দিকে।
এতক্ষণ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়েছিল তিনজনে। একনাথের শেষ কথায় ঈষৎ উদ্বেগ উপস্থিত হল তিনজোড়া চোখে।
একনাথ কাঠের বাক্সের ডালা খুললেন। একটা কাঁচের গেলাস রাখলেন কাঠগড়ায় চওড়া রেলিংয়ের ওপর। একটা বেতের রিঙ আটকে দিলেন গেলাসের মাথায়। রিঙ থেকে উঠেছে দুটো খাড়াই কাঠি–দুটো কাঠির মধ্যে আড়াআড়িভাবে আর একটা কাঠি দিয়ে জোড়া। শেষোক্ত কাঠির মাঝখান থেকে একটা টোয়াইন সুতো ঝুলছে গেলাসের তলদেশ পর্যন্ত।
এক বোতল জল বার করলেন বাক্স থেকে। জল ঢাললেন গেলাসে–বেশি না–দেড়ইঞ্চি পরিমাণ।
এবার বেরোল একটা দু-ইঞ্চি লম্বা কাঁচের পুতুল। দু-হাত বুকে জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
সবশেষে বার করলেন একফালি কালো কাপড়–প্রস্থে দু-আঙুল, দৈর্ঘ্যে এক আঙুল।
সবকটি বস্ত কাঠের রেলিংয়ে সাজিয়ে রেখে আদালত কক্ষের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন একনাথ রায়। ঘর ভরতি লোক রুদ্ধশ্বাসে চেয়ে আছে তাঁর পানে।
দম নিয়ে শুরু করলেন একনাথ, ধর্মাবতার, আমি শুধু একজনের খুনের দৃশ্য এখানে দেখাবো। নাম তার মহাকালী। বৃত্তিতে পতিতা। গায়ে কালো শাল দিয়ে খদ্দের খুঁজতে বেরোত রাস্তাঘাটে– কল-কারখানার আশে-পাশে। বয়স তিরিশ।
ধরুন, এই পুতুলটা সেই মহাকালী। আর এই কালো কাপড়টা তার কালো শাল। শালটা পুতুলের কাঁধে জড়িয়ে দিলাম আপনাদের সামনে।
দেড়মাস আগে খদ্দের ধরতে বেরিয়েছিল মহাকালী। ফকির-ফিকির-শ্ৰীশ তাকে নিয়ে গেল বাড়ির মধ্যে। কিছু খাইয়ে বেহুঁশ করে ফেলল। তারপর পায়ে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিল কুয়োর মধ্যে এইভাবে… বলতে-বলতে টোয়াইন সুতোর প্রান্ত কাঁচের পুতুলের পায়ে বেঁধে গেলাসের মধ্যে নামিয়ে দিলেন একনাথ রায় পুতুলটাকে উলটো করে। মাথা রইল নিচের দিকে। কঁধ পর্যন্ত ডুবে রইল জলের মধ্যে। কালো কাপড়টা তলিয়ে গেল গ্লাসের তলদেশে।
সুতো ছেড়ে দিয়ে সটান ফিকির-ফকির-শ্রীশচন্দ্রের পানে চাইলেন একনাথ রায়। ধর্মাবতার তার আগেই সূকুটি করে চেয়েছিলেন সেইদিকে।
আদালতশুদ্ধ লোক দেখলছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে তিন আসামির একদা বেপরোয়া মুখ। এমনকী ফিকিরলালের পেচকচক্ষুর তারকাতেও ভয়ের কাপন অতিশয় প্রকট।
জুরীরাও দেখলেন সেই দৃশ্য। দৃষ্টি বিনিময় করলেন পরস্পরের সঙ্গে।
এতক্ষণে বোঝা গেল, নাটকের প্রারম্ভে একনাথ এই কথাই লিখে জানিয়েছিলেন বিচারপতিকে,
চোখ রাখুন তিন আসামির ওপর। মনের পাপ মুখের অগোচর থাকবে না!
এবং এই প্রতিক্রিয়া যাতে প্রমারস্বরূপ গ্রাহ্য হয়, তাই এত গোপনীয়তা অবলম্বন করেছেন। এই কদিন।
এখন, নাটকীয় প্রস্তাবনা দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন, অনুমান তাঁর অভ্রান্ত। উপসংহার টানলেন আরও কম কথায়।
বললেন আসামিদের ওপর চোখ রেখে, বেশ কিছুক্ষণ জলে চুবিয়ে রেখে মেরে ফেলা হল মহাকালীকে। বেহুঁশ করার জন্যে যা কিছু খাওয়ানো হয়েছিল–বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে। শরীরের বাইরে কোথাও আঁচড়ের দাগ রইল না–ভেতরেও জল ঢুকল না–বেহুঁশ ছিল বলে মহাকালী ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে পারেনি। কিন্তু মি লর্ড, আবদুল তা করেছিল। তাই কুয়োর গায়ে লেগে রগটা সামান্য কেটে গিয়েছিল। মানুষ বেঁচে থাকলেই হার্ট রক্ত পাম্প করে মরে গেলে করে না। রগের কাটা দিয়ে তাই রক্ত বেরিয়েছিল আবদুলের মৃত্যুর আগে রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখেই বুঝেছিলাম, আবদুল লড়ে মরেছে।
একটু থেমে দম নিলেন একনাথ রায়। গেলাসটা মাথার ওপর তুলে বললেন, আপনারা দেখুন, কালো কাপড়টা জলের তলায় পড়ে। পুতুলটাকে মাথা নিচের দিকে করে না ডোবালে কিন্তু কাপড়টা খসে পড়ত না। কুয়োর তলায় কালো শাল দেখে তাই আমি ব্যাক ক্যালকুলেশান করে বাকিটা অনুমান করেছিলাম। বাগানে পাওয়া গেল শাড়ি আর শায়া–শালটা কুয়োর তলায় কেন?–স্ত্রীলোকটিকে মাথা নিচু করে চুবিয়ে মারা হয়েছিল বলে।
