রাইটার জমাদার খাতা-পেনসিল নিয়ে তৈরি। চেয়ারে এক পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একনাথ।
ঘরে ঢুকল ফকিরচাঁদ। থানাহাজতের জামাই আদরে এই কদিনেই মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তরতরে চনমনে ভাবটা যায়নি। চোখের মধ্যে ভয়ডরের লেশমাত্র নেই।
ঘরে পা দিয়েই টেবিলের দিকে তাকাল ফকিরচাঁদ। চোখের তারা ঈষৎ বিস্ফারিত হয়েই স্বাভাবিক হয়ে গেল। জিনিস দুটি এ-স্থানে সে আশা করেনি।
কর্কশকণ্ঠে শুধোলেন একনাথ রায়, চিনতে পারছ?
আজ্ঞে? ফকিরচঁদ যেন শুনতেই পায়নি।
টুপি আর প্যান্ট কার?
কী করে বলব বলুন।
তোমার ঘরের মাচায় ছিল, আর তুমিই জানো না?
মাচায় অনেক জিনিসই আছে–ভাড়া নেওয়ার সময়ে মাচায় উঠে দেখিনি।
সজোরে অধর দংশন করলেন একনাথ রায়। জেরা করলেন আরও কিছুক্ষণ–কিন্তু বৃথাই।
গেল ফকিরচাঁদ–এল ফিকিরলাল। তার মুখভাব আরও ভাবলেশহীন। চোখের তারকা অতিশয় স্থির। বিস্ফারিত হতেই জানে না।
তারপর এল শ্রীশচন্দ্র জিজ্ঞাসাবাদ করে শুধু একটা খবরই পাওয়া গেল তার কাছে। শ্রীশচন্দ্র থাকে ফকিরচাঁদের লাগোয়া বাসায়। ফকিরদের মতো টালির বাড়ি। পেছনে বাগান।
চতুর্থজনের নাম পচা। পেশায় আঁকামুটে।
রাইটার জমাদারকে বিদায় দিয়ে সাদা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন একনাথ রায়। মানসচক্ষে দেখতে পেলেন পাশাপাশি দুটি বাড়ি ফকিরচাঁদের আর শ্রীশচন্দ্রের। একটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা হয়েছে–আর একটি…
কিন্তু বৃথা হল খানতল্লাশি। শ্রীশচন্দ্রের বাড়ির মধ্যে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না।
যথা সময়ে আসামিদের নিয়ে আদালতে হাজির হলেন একনাথ রায়। আরও তদন্ত সাপেক্ষে সময় প্রার্থনা করলেন। হাকিম তা মঞ্জুর করলেন–কিন্তু বেকসুর খালাস করে দিলেন পচাকে। কারণ সে পেশায় ঝকামুটে। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল, শেয়ালদা স্টেশন থেকে ফকিরচাঁদ তাকে নিয়ে এসেছিল বস্তা বইবার জন্যে।
ফিকির, ফকির আর শ্রীশচন্দ্রকে নিয়ে থানায় ফিরলেন একনাথ রায়।
উমানাথ ভদ্র আর তাকে তলব করেননি। উনিও দেখা করেননি। দেখা করার মতো মুখ নেই।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল একনাথ রায়ের। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা কথা উদ্ভাসিত হল মনে।
সটান উঠে বসলেন একনাথ। তখনও তিনি অবিবাহিত।
মানসচক্ষে দেখলেন পাশাপাশি দুটি বাড়ি–পেছনে বাগান। বাড়ি দুটি খুঁটিয়ে দেখেছেন– দেখেননি কেবল বাগানের মাটি।
বাকি রাত না ঘুমিয়ে কাটালেন তিনি। ভোররাতেই থানায় গিয়ে লোকজন জড়ো করে হানা দিলেন বেলেঘাটার। কয়েক ফুট মাটি কুপিয়ে ফেললেন দুটি বাগানেই।
শ্রীশচন্দ্রের বাগানের জঞ্জালের গাদার নিচে আলগা মাটির তলায় পাওয়া গেল একটা সাদা শাড়ি আর সায়া। সায়ার মাঝখান থেকে টেনে ছেঁড়া–যেন গিঁট খুলতে তর সয়নি ছিঁড়ে খোলা হয়েছে–আর ফকিরদের বাগানে বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেল একটা খয়েরি হাফ প্যান্ট, একটা কালো ইজের এবং একটা ধুতি আর ফতুয়া।
বেলা আড়াইটেয় শেষ হল খোঁড়াখুঁড়ি পর্ব। চড়া রোদে দাঁড়িয়ে একনাথ রায় উপলব্ধি করলেন সেই নির্মম সত্য।
মোট ছটি খুন হয়েছে এই দুটি বাড়িতে। লাল ফেজ টুপি, নীল প্যান্ট, কালো ইজের, খয়েরি প্যান্ট, সায়া-শাড়ি এবং ধুতি-ফতুয়া সেই হতভাগ্যদেরই পরিধেয়!
আচ্ছন্নচিত্তে রোদে দাঁড়িয়ে রইলেন একনাথ রায়। মর্মস্পর্শী সত্যটা উদঘাটিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হল। আবদুল হত্যার রহস্য এখনও অমীমাংসিত লাশ পাওয়া গেছে, ডাক্তাররা ব্যবচ্ছেদ করেছেন কিন্তু হত্যার উপকরণ এবং পদ্ধতি এখনও অজ্ঞাত।
এমতাবস্থায় আরও পাঁচটি নিখোঁজ লাশ এবং সেই সম্পর্কিত তদন্তভার কাঁধে এসে চাপল।
হুঁশ ফিরল রামশঙ্করের ডাকে, হুজুর!
চোখ তুললেন একনাথ রায়। চোখ জ্বালা করছে।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চল।
বুকের ওপর চিবুক গুঁজে থানায় ফিরলেন। সমস্ত রাস্তায় মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল এক চিন্তা। ফকিরচাঁদ নিশ্চয় মন্ত্রপ্রয়োগে ছটি মানুষকে বধ করেনি। পাঁচটি লাশ বিনা বাধায় বিক্রি করেছে–ডাক্তারদের চোখে ধুলো দিয়ে। ষষ্ঠ লাশটিও অনুরূপভাবে খণ্ড-খণ্ড হত। রগটা সামান্য কেটে গিয়েছিল বলে হল না।
কিন্তু তার মন্ত্রগুপ্তি কী?
থানার সিঁড়ি দিয়ে নতমস্তকে উঠতে গিয়ে নজরে পড়ল এক জোড়া জুতো। ওপরধাপে দাঁড়িয়ে আছেন উমানাথ ভদ্র।
চোখ তুললেন একনাথ রায়। উমানাথ গম্ভীর চোখে চেয়ে আছেন তাঁর পানে–মুখ গম্ভীর।
তিরস্কৃত হওয়ার পর থেকে আর থানাদারের চৌকাঠ মাড়াযনি একনাথ রায়। পণ করেছিলেন রহস্যের মীমাংসাসূত্র আবিষ্কার না করা পর্যন্ত ঘরে ঢুকবেন না।
উমানাথ তা উপলব্ধি করেই যেন পথরোধ করে দাঁড়িয়েছেন।
বললেন ভরাট গলায়, ঘরে এসো।
রাতে ঘুম নেই, সকাল থেকে চড়া রোদে মাথা মুখ ঝলসে গিয়েছে, মনে চরম নৈরাশ্য; এই মুহূর্তে উধ্বতন অফিসার স্নেহক্ষরিত কণ্ঠে আমন্ত্রণ জানালে মানুষের মনে আবেগের আলোড়ন উপস্থিত হবেই। একনাথ রায় বাহ্যত রুক্ষ কিন্তু ভাবালুতার অতীত তিনি নন। তাই একটা পুঁটলি ঠেলে উঠল গলার কাছে। মাথা হেঁট করে বস-এর পেছন পেছন গেলেন তার কক্ষে ঢুকলেন।
হাতের ইঙ্গিতে একনাথকে চেয়ারে বসালেন উমানাথ। টেবিল ঘুরে গিয়ে বসলেন নিজের চেয়ারে। পেছনে হেলান দিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে নিরীক্ষণ করলেন একনাথ রায়ের নিদ্রাহীন উৎকণ্ঠাক্লিষ্ট মুখ।
