একনাথ ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এসে বসলেন ভাটিখানায়। তিনি নেশা করেন না। অথচ নেশার ভান করলেন এক ভঁড় তাড়ি সামনে রেখে। ঝিমোতে লাগলেন কৃত্রিম নেশার ঝেকে কান আর চোখ রইল সজাগ।
গতকাল পুলিশ হানা দিয়েছিল তাড়িখানায়। সঙ্গে রামশঙ্করও ছিল। ফকিরচাঁদ এবং ফিকিরলাল নাকি পুলিপোলাও খাচ্ছে থানা হাজতে খুনের চার্জে। তাড়িখানা সরগরম সেই প্রসঙ্গ নিয়ে।
লাও বাবা, হেঁচকি তুলতে তুলতে বলছিল একজন ধুনুরি।
কেন খুন হল, তা তো বলবি।
কে আবার, সেই ছোঁড়াটা, চানা চিবুতে চিবুতে বলল কয়লাওলা মিশির।
কৌ ছোকরা?
উত্তীর্ণ হলেন একনাথ। সংগৃহীত টুকরোটাকরা তথ্যগুলি থেকে ধীরে-ধীরে নিহত বালকের বৃত্তান্ত পূর্ণ রূপ নিল।
ছেলেটার নাম আবদুল। থাকতো রাজাবাজারের বস্তিতে। অনাথ। সাদা ইঁদুরের খেলা দেখাত পথেঘাটে। ফিকিরর্চাদের বাড়িতে এই সেদিন তাকে ঢুকতে দেখা গেছে। তখন তার মাথায় লাল রঙের ফেজ টুপি ছিল। কবে?–যেদিন লাশ নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল ফকিরচঁদ, তার আগের দিন–
আরও কিছুক্ষণ বসে রইলেন একনাথ রায়। তারপর তাড়ির ভাড় হাতে নিয়ে টলতে টলতে বেরিয়ে এলেন খাল পাড়ে। ভাড়টা খালের জলে ছুঁড়ে দিয়ে অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।
নিচ্ছিদ্র ষড়যন্ত্র। আবদুলকে ফকিরচাঁদই ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছে বাড়ির মধ্যে খুনও করেছে। কিন্তু কীভাবে? ডাক্তাররাও তা বলতে পারেনি।
.
পরের দিন সকালবেলা উমানাথ ভদ্র তলব করলেন একনাথ রায়কে।
একনাথ স্যালুট করে বসলেন সামনের চেয়ারে।
উমানাথ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাঁকে দেখলেন।
পেনসিল দিয়ে টেবিলের ওপর টকটক শব্দ করে শুধোলেন অবশেষে, ফকিরচাঁদ আর ফিকিরলালের কেস কবে?
আগামী পরশু।
খুনের চার্জ আনবার প্রমাণ পেয়েছ?
না।
রিপোর্ট দাও–মুখে।
একনাথ রায় অল্প কথায় বললেন কীভাবে পদে-পদে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। বললেন, ডেনটিস্টের কথা, রামশঙ্করকে দিয়ে ফকির-ফিকিরের বাড়ি তল্লাশির কথা এবং সবশেষে ভাটিখানায় অভিযানের কথা।
তিনবার তিন পথে তদন্ত পরিচালনা করেছেন–তিনবারই অন্তে শূন্য লাভ করেছেন।
শুনতে-শুনতে উমানাথ থমথমে মুখে শুধু বললেন, ছিঃ একনাথ! তুমি জমাদারকে দিয়ে খানাতল্লাশি করেছ?
কিন্তু স্যার, সে কিছুই পায়নি।
তর্ক করো না। তুমি কি চাও রামশঙ্কর কাল থেকে তোমার চেয়ারে বসুক?যাও।
আরক্তমুখে বেরিয়ে এলেন একনাথ রায়। ঘরে বসে টেবিলে মাথা গুঁজে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। ধীরে-ধীরে আত্মস্থ হলেন। উমানাথ ভদ্র তাঁর উপকারই করেছেন। পুরস্কারের সঙ্গে তিরস্কারেরও প্রয়োজন।
.
আধঘণ্টার মধ্যে লোকজন নিয়ে বেলেঘাটার হাজির হলেন একনাথ রায়।
খালের পশ্চিম পাড়ে ভাটিখানা। তার একশো গজ দূরে ফকিরর্চাদের বাড়ি। পেছন দিকে খানিকটা বাগান। তারপর মস্ত পুকুর। রেললাইন চোখে পড়ে বাগানে দাঁড়ালে।
বাড়িটার সামনের দিকের দেওয়াল ইটের তিন দিকের দেওয়াল দরমা আর মাটির। কুলুঙ্গীর আকারে অতি ছোট জানলা। ছাদ লাল টালির। হেঁট হয়ে না ঢুকলে দরজায় মাথা ঠুকে যায়।
বাড়ির সদর দরজা থেকে প্রতি ইঞ্চি জায়গা দেখতে-দেখতে ভেতরে প্রবেশ করলেন একনাথ রায়। দেওয়ালে চোরা কুলুঙ্গী আছে কিনা পরখ করলেন, মেঝের নিচে পাতালকুঠরি আছে কিনা যাচাই করলেন, রান্নাঘরের উনুনের ছাই ঘাঁটলেন, মাচার জিনিসপত্র সব নামিয়ে আনলেন। খাঁটিয়া ঠুকে দেখলেন। একটিমাত্র টিনের তরঙ্গ খুলে জিনিসপত্র লাটঘাট করে ফেললেন।
রামশঙ্করকে হুকুম দিলেন–যা কিছু পাওয়া গেল তার ফর্দ বানাতে।
নিজে টহল দিয়ে এলেন বাগানে। উঁকি মারলেন কোণের কুয়োর ভেতরে। গাছপালাগুলো অযত্নবর্ধিত। সামান্য একফালি জমিতে আবর্জনার ভঁই। ভাঙা ক্যানেস্তারা আর হাবিজাবি জিনিস ছড়ানো। কুয়োর পর কাটাগাছের বেড়া। তারপর পুকুর।
এসে দাঁড়ালেন বাড়ির মধ্যে। একখানাই ঘর। পাশে রান্নাঘর। কলতলা খোলা উঠোনে।
কোথাও আবদুল হত্যার কোনও সূত্র নেই।
অন্যমনস্কভাবে চেয়ে রইলেন মাচা থেকে নামানো পাঁচমিশেলী জিনিসের দিকে। কোদাল, খোন্তা, শাবল, ছেঁড়া ন্যাকড়া, অনেকগুলো খালি বোতল, একটা টুপি…
চোখ সরাতে পারলেন না একনাথ রায়।
ফেজ টুপি! লাল রঙের! এইরকম টুপি মাথায় আবদুলকে দেখা গিয়েছিল ফকিরচাঁদের বাড়ি ঢুকতে!…
ভেতরে-ভেতরে নতুন উৎসাহ, নতুন উত্তেজনা অনুভব করলেন একনাথ। পাওয়া গেছে…একটা প্রমাণ অন্তত পাওয়া গেছে…আবদুল যে ফকিরদের বাড়িতে প্রবেশ করেছিল সে প্রমাণ পাওয়া। গেছে।
তারপর? খুন হল কীভাবে? পরে ভাবা যাবেখন। দেখা যাক, মাচার জঞ্জালের মধ্যে আর কি আছে।
নতজানু হয়ে নিজেই আবর্জনা হাঁটকাতে শুরু করলেন একনাথ রায়।
এবার পেলেন একটা হাফপ্যান্ট।
ছোট ছেলের নীল হাফপ্যান্ট। রক্তাক্ত। প্যান্টে কালচে রক্ত চামাটি ধরে রয়েছে।
নির্নিমেষে চেয়ে রইলেন একনাথ রায়। রক্তমাখা প্যান্ট। আবদুলেরও হতে পারে। কিন্তু আবদুলের গা থেকে এত রক্তপাত ঘটল কোন ক্ষত মুখে? রগ সামান্য কেটে গিয়েছিল–এত রক্ত রগ থেকে বেরোয়নি। তবে?
একটা ঘোর সন্দেহ দেখা দিল মনে।
আবদুল ছাড়াও এ বাড়িতে খুন হয়েছে আরও একটি ছেলে–এ প্যান্ট তার!
পুলিশ ফাঁড়ি।
একনাথ রায়ের ঘর। টেবিলে সাজানো লাল ফেজ টুপি, আর রক্তমাখা নীল প্যান্ট।
