নিরেট রহস্য! ছিদ্র কোথাও নেই। বড় আশা ছিল, পোস্ট মর্টেম হলেই মৃত্যুর কারণ ধরা পড়বে। সেই রিপোর্টের বশে চারটেকে চালান দেবেন।
কিন্তু ময়নাতদন্তে কিসসু ধরা পড়েনি। ছেলেটা নাকি মরবার সময়ে বেশ সুস্থ ছিল এবং কোনও অসুখবিসুখে ভোগেনি। মৃত্যুর কোনও কারণ আবিষ্কার করতে পারেননি ডাক্তাররা। পারেননি বলেই অনুমান করছেন মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়। হ্যাঁ, রগটা খানিকটা কেটে গেছে ঠিকই। কিন্তু তার জন্যে মৃত্যু হতে পারে না। অথচ আর কোথাও চোট লাগার চিহ্ন নেই।
কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্র নন একনাথ। যে চারজনকে ঢুকিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজন মার্কামারা বডি-স্ন্যাচার। বডি-স্ন্যাচারদের আসল কারবার কি, দেশশুদ্ধ লোক জানে। সুতরাং খুনি তারাই।
কিন্তু জুরী তো তা শুনবে না। অমুক লোক অবশ্যই হত্যাকারী বললে ধোপে টিকবে না– প্রমাণ চাই।
অথচ এক কণা প্রমাণও হাতে নেই।
অনেক চিন্তার পর অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে এলেন একনাথ রায়। প্রমাণ ব্যাতিরেকে খুনের চার্জ আনা আদৌ উচিত হবে কিনা, সে পরামর্শ দিতে পারবেন একজনই–থানাদার উমানাথ ভদ্র।
উমানাথ কুশাগ্রবুদ্ধি পুলিশ অফিসার। সঙ্কট মুহূর্তে সুসম পরামর্শদাতা হিসাবে সুনাম আছে। বয়েসে প্রৌঢ়–কিন্তু এখনও খাটতে পারেন প্রচণ্ড খাটাতেও পারেন তেমনি। কৌতুকপ্রিয়। কিন্তু কাজের সময়ে তিনি অন্য মানুষ। তখন অটল গাম্ভীর্য এবং প্রখর ব্যক্তিত্বে সমাচ্ছন্ন। দেখে মনেই হয় না অবসর সময়ে সহকর্মীদের সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি করতে তিনি অদ্বিতীয়।
একনাথ ঘরে ঢুকতে ফাইল থেকে চোখ তুললেন উমানাথ ভদ্র। বললেন, কী সংবাদ বৎস?
কেস আছে।
কী কেস?
সংক্ষেপে রহস্যের জটাজাল বিবৃত করলেন একনাথ রায়।
শিবনেত্র হয়ে সব শুনলেন উমানাথ। শুনতে-শুনতে অন্য মানুষ হয়ে গেলেন।
নিমীলিত নয়নে কিছুক্ষণ একনাথ রায়ের পানে চেয়ে আস্তে-আস্তে বললেন, না, প্রমাণ ছাড়া খুনের চার্জ আনা যাবে না। আসামিদের ছেড়ে দিতে হবে।
চোখে-চোখে চেয়ে আছেন একনাথ রায়। উমানাথও চোখ ফেরালেন না। একরোখা একনাথের অভিপ্রায় তিনি উপলব্ধি করেছেন।
বললেন ধীরকণ্ঠে, কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত যে প্রমাণ নেই? প্রমাণ খোঁজবার কী-কী চেষ্টা করেছ বলো তো?
হঠাৎ একনাথের মনে পড়ল ময়নাতদন্তের রিপোর্টের একটি লাইন। ডাক্তাররা লিখেছেন, মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই নাকি বত্রিশপাটি দাঁত উৎপাটন করে নেওয়া হয়েছে ছেলেটির।
ছোট্ট সূত্র। কিন্তু আঁধারে আলো। তদন্ত শুরু করা যেতে পারে।
.
দিন কয়েক উদয়াস্ত খাটলেন একনাথ রায় এই সূত্র ধরে। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, যেদিন লাশ বিক্রি করতে হাসপাতালে আসে ফিকির আর ফকির, তার আগের দিন বেলেঘাটার একটা তাড়িখানায় তাড়ি খাচ্ছিল ওরা তিনজন–ফিকির, ফকির আর সেই মুটে দুজনের একজন। নাম তার শ্রীশচন্দ্র। রুমালমোড়া একরাশ দাঁত টেবিলে রেখেছিল ফকির। সাফ করছিল মদ খেতে খেতে।
পরবর্তী খবর পাওয়া গেল বৌবাজারের একটা হাতুড়ে চিনা ডেনটিস্টের কাছে। সেইদিনই রাতে অনেকগুলো দাঁত ফকির সেখানে বিক্রি করেছে।
কিন্তু তারপর? ছেলেটাকে যে মার্ডার করা হয়েছে, তার প্রমাণ কই?
লৌহ মনোবলেও চিড় ধরল এবার। নিরাশ হয়ে বসে রইলেন একনাথ অফিস টেবিলে। প্রমাণ নেই! ফিকির-ফকিরের অপরাধ সপ্রমাণ করার কোনও উপাদান তার হাতে নেই। সেকালে মরা মানুষের দাঁত বিক্রি কোনও অপরাধ নয়।
হেনকালে পাহারালা রামশঙ্কর সবুট স্যালুট করল ঘরে ঢুকে।
সপ্রশ্ন চোখে তাকালেন একনাথ রায়।
রামশঙ্কর এই কদিন বিস্তর মেহনত করেছে এই কেসে।
রামশঙ্কর নিবেদন করল যে তাড়িখানায় বসে ফিকির এবং ফকির তাড়ি খেয়েছিল, ফকিরচাঁদের বাসা নাকি তার অনতিদুরে। বেলেঘাটার খালপাড়ে।
–তাতে কী হল? শুষ্ক কণ্ঠে শুধোলেন একনাথ রায়।
–উহ্ মোকান সার্চ করনে সে কুছ তো মিলেগা।
কথাটা আগে মাথায় আসেনি একনাথ রায়ের। বিস্মিত হলেন সেজন্যে। তারপর ভেবে দেখলেন, লাভ কী? নিধন-চিহ্ন নিহত ব্যক্তির দেহতেই থাকে। সে দেহ কাটাছেঁড়া করে দেখা হয়েছে। বাড়ি দেখে কী হবে?
যাই হোক, পাহারালা রামশঙ্করের কাঁধে অপর্ণ করলেন সেই দায়িত্ব–গুরুত্বহীন বলেই।
রামশঙ্কর ফিরে এসে তার মনোমত রিপোর্টই দিল। লাশ-লুঠেরাদের ঘরে কোদাল-গাঁইতি শাবল উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি। মার্ডার কেসে অকাট্য প্রমাণ হওয়ার মতো কিসসু চোখে পড়েনি।
.
কিন্তু ছেলেটি কে?
বসে-বসে সেই কথাই ভাবছিলেন একনাথ। তার গায়ের রং তামাটে, মুখ চোখ সুদর্শন। ফিকির এবং ফকিরের খপ্পরে সে পড়ল কীভাবে? নিবাস কোথায় তার?
এবার একনাথ রায় মনস্থ করলেন–তিনি নিজেই বেরোবেন।
কোয়ার্টারে গেলেন আধ ঘণ্টার জন্যে। কাবার্ড খুলে বার করলেন ছদ্মবেশ ধারণের সরঞ্জাম। দশ-বারো জোড়া বিভিন্ন আকৃতির পাদুকা থেকে বেছে নিলেন মোটর-টায়ার থেকে তৈরি ছেঁড়া চটিজুতো। মলিন ধুতি আর রং-সিমেন্ট মাখা সার্ট নির্বাচন করলেন হ্যাঁঙারে ঝোলানো ছেঁড়াখোঁড়া বেশভূষার মধ্যে থেকে। একনাথ রাস্তায় নেমে এলেন দিন মজুরের ছদ্মবেশে। ফটকে দণ্ডায়মান কনস্টেবল মুচকি হাসল এবং সবুট স্যালুট ঠুকল মজুরবেশী পুলিশ কাকাকে।
বেলেঘাটা খালের ঠিক ধারে ছোট্ট ভাটিখানাটি সন্ধের পর থেকেই জমজমাট হয়ে ওঠে দিনমজুর আর কারখানা শ্রমিকদের পৃষ্ঠপোষকতায়।
