বিড়িটা নামিয়ে গিরধর বললে, তা হলে নব্বইতে রাজি তো?
আরে হা হা, চোখেমুখে কথা কয়ে উঠল ফিকির।
দাঁড়া, টাকা নিয়ে আসি ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে।
তোর কাছে নেই?
না। দাঁত বার করে হাসল গিরধর। কাল রাত্তিরে উড়িয়ে দিয়েছি। দাঁড়া, আসছি।
অ্যানাটমির ডিমন্সট্রেটর ডক্টর রক্ষিতকে এক নিশ্বাসে আপন সন্দেহের কথা বিবৃত করল গিরধর। ডক্টর রক্ষিত প্রবীণ, বিচক্ষণ এবং বহুদর্শী। ভূকুঞ্চিত ললাটে শুনলেন গিরধরের সন্দেহের কাহিনি। টাটকা বডি, চোট লাগেনি কোথাও–অথচ খটকা লেগেছে শুনে এলেন ওর সঙ্গে।
মেঝের ওপর আঁকা, আঁকার পাশে শুন্য বস্তা এবং গতায়ু বালকের দেহসুষমার পানে ক্ষণেক চাইলেন ডাক্তার। চোখের কোণ দিয়ে দেখলেন ফিকির আর ফকিরের নির্ভীক মুখচ্ছবি। হেঁট হয়ে ডেড বডির হাত-পা তুলে নেড়ে আড়ষ্টতা পরখ করলেন, চোখের পাতা টেনে অক্ষি-তারকা লক্ষ করলেন।
লাশের ওপর চোখ রেখে সহজ গলায় জিগ্যেস করলেন, কত দিতে হবে?
নব্বই, জবাব দিল ফকিরচাঁদ।
দাঁড়াও–আনছি টাকা, বলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। পেছনের দরজা দিয়ে মর্গের বাইরে গিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে সোজা হাজির হলেন থানায়।
থানার ছোট দারোগা একনাথ রায় নিবিষ্ট চিত্তে শুনলেন ডক্টর রক্ষিতের সন্দেহ কাহিনি। সামনের দিকের খানকয়েক চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে-চালাতে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধু একটা প্রশ্নই করলেন, গিরধরলালের কথা বাদ দিন। আপনার সন্দেহ হল কেন?
পাঁচটি কারণে। মুখটা ফোলাফোলা, চোখ দুটোয় রক্তজমা, দেহটা টাটকা আর হাত-পা আড়ষ্ট।
সূচীতীক্ষ্ণ চেয়ে রইলেন পুলিশকাকা একনাথ রায়। ঈষৎ ঝুঁকে কর্কশ কণ্ঠে বললেন, পঞ্চম কারণটা বললেন না তো?
সেটা আপনি নিজে দেখবেন। দেখলেই বুঝবেন।
চোখে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল একনাথ রায়ের। ঘণ্টা বাজিয়ে সেপাইকে ডাকলেন। ডাক্তারকে বললেন, আপনি গিয়ে ওদেরকে আটকে রাখুন। আমি আসছি।
থানা থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে এসে পেছনের দরজা দিয়ে সটান ডিসেক্টিং রুমে ঢুকলেন ডক্টর রক্ষিত। ঢুকেই লক্ষ করলেন, ঘরের আবহাওয়া পালটে গিয়েছে।
চঞ্চল হয়েছে ফকির আর ঘনঘন আঙুল মটকাচ্ছে ফিকির। অন্য দুই ব্যক্তি আঁকা নিয়ে উশখুশ করছে যাওয়ার জন্যে।
এক লহমার মধ্যেই ডক্টর রক্ষিত উপলব্ধি করলেন, তার অবর্তমানে বেস কিছু বলেছে গিরধরলাল।
কিন্তু নিরতিশয় চতুর তিনি। তাই কিছুই যেন লক্ষ করেননি, এমনিভাবে বললেন ফকিরচাঁদকে, বড় মুশকিলে পড়লাম।
চকিত চাহনি নিক্ষেপ করল ফকিরচাঁদ।
কিন্তু উত্থান পতন নেই ডাক্তারের কণ্ঠে। বললেন, একশো টাকার নোট ছাড়া কিছুই নেই। ভাঙাতে পাঠিয়েছি রামলক্ষ্মণকে।
ফিকির ঠোঁটটা কামড়ে ধরেই ছেড়ে দিল–বলল শুষ্ককণ্ঠে, দশটা টাকা আমার কাছেই ছিল।
–তাই নাকি? দেখো দিকি, খামোকা দাঁড় করিয়ে রাখলাম। থাগ্নে, রামলক্ষ্মণ এসে পড়বে এখুনি।
গিরধর জানল না–ডাক্তারবাবু এই অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ ফাঁড়ি ঘুরে এসেছেন। মুখগোঁজ করে দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। ফাঁক পেয়ে বলে উঠল, ডাগদর সাব, ফকির বলছে ছালা থেকে ফেলতে গিয়ে রগ কেটে গেছে লাশের
ঠিকই বলছি, তেড়ে উঠল ফরিকচাঁদ।
আহা, তাতে হয়েছে কী? ডাক্তার যেন বড় বিড়ম্বিত বোধ করলেন ফকির-গিরধরের ঝগড়ায়। বললেন, রগটা সামান্য কেটেছে বই তো নয়।
কিন্তু–গিরধর নাছোড়বান্দা।
তুই থাম, ধমকে উঠলেন ডক্টর রক্ষিত।
থতমত খেল গিরধর। ডক্টর রক্ষিতের মহৎ গুণ–তিনি রাগতে জানেন না–মোটেই গলা চড়ান না। মাটির মানুষ। অথচ এমন তেড়ে উঠলেন–বিশেষ করে বাইরের লোকের সামনে..
মনে বড় লাগল গিরধরের। কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
ফিকির আর ফকির গিরধরলালের তাড়না দেখেও হৃষ্ট হয়নি। চকিত দৃষ্টি বিনিময় ঘটল দুজনের মধ্যে। ফিকির গলা ঝাড়া দিয়ে বললে, বড্ড তাড়া ছিল। আজ আসি, ডাক্তারবাবু–
ডক্টর রক্ষিত তো অবাক, সে কি রে! টাকা না নিয়ে যাবি কোথায়?…রামলক্ষ্মণকে বলিহারি যাই। নোট ভাঙাতে ট্যাকশালে গেল নাকি? ও বাবা গিরধর দেখ না গিয়ে গেল কোথায়?
গিরধরলাল অগ্রসর হওয়ার আগেই ফিকির-ফকির দরজার দিকে এগোল। যেতে-যেতে বললে ফিকির, আজ বড্ড তাড়া আছে স্যার। কাল আসবখন।
উঠে দাঁড়িয়েছিলেন ডক্টর রক্ষিত। কিন্তু পরক্ষণেই বসে পড়লেন।
একনাথ রায় কখন জানি আবির্ভূত হয়েছেন নিঃশব্দে–আখাম্বা চেহারার পাহারালাকে নিয়ে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন।
মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গিয়েছিল ফিকির-ফকির এবং আঁকামুটে দুজন। সবার আগে সংযত হল ফিকির। পেচকচক্ষু সঙ্কুচিত করে হিসহিসিয়ে উঠল, এ কী! পুলিশ কেন!
একনাথ রায় জবাব দিলেন না। ধীরেসুস্থে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ডেড বডির পাশে। ক্ষণকাল স্থির নেত্রে কি দেখলেন।
তারপরই ঘুরে দাঁড়িয়ে হুকুম দিলেন কাঠ-চেরা গলায়, লাগাও হাতকড়া।–মার্ডার!
.
এই পর্যন্ত বলে পুলিশ কাকা বাড়ি কাঁপিয়ে খানিকক্ষণ হাঁচলেন। আমি তড়বড় করে জিগ্যেস করলাম, কি দেখে বুঝলেন মার্ডার?
একনাথ বললেন নীরসকণ্ঠে, এই সহজ জিনিসটাও মাথায় এল না? গিরধর পর্যন্ত ধরে ফেলেছিল!
.
ময়নাতদন্ত রিপোর্টটা আসতেই বারবার অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়লেন একনাথ রায়। তারপর উঠে দাঁড়ালেন সশব্দে। ঘরময় পায়চারী করলেন কিছুক্ষণ। অনেক ভাবলেন। কুল কিনারা পেলেন না।
