ক্রমে ক্রমে মড়া চালান একটা ব্যবসায়ে দাঁড়িয়ে গেল। জোগান দিতে লাগল কলকারখানার কুলিমজুর এবং অন্যান্য গরিবরা আত্মীয়স্বজন মরলে চিতায় তোলবার বা গোর দেওয়ার খরচও যাদের নেই। মড়ার দালালদের হাতে মড়া চালান দিয়ে সে খরচ তো বাঁচছেই উপরন্তু দু-পয়সা আসছে।
আরও একটা পথে ডেড বডি জোগাড় করত দালালরা কবর খুঁড়ে!
অর্থাৎ মড়া চুরি। রাত বিরেতে এরা কবরখানায় দিত হানা। কেউ জানতেও পারত না– মাটির তলা থেকে সদ্য মরা মানুষটা চালান আসত কলেজ হাসপাতালের শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষে।
ডেড বডি বিক্রি আইনের চোখে দোষনীয় নয়। কিন্তু গোরস্থানের লাশ লুঠ বেআইনি।
যে ব্যবসায়ে লাভ বেশি, বদলোক সেখানে জুটবেই–লাভের অংশ আরও বাড়ানোর ফিকিরে দু-ভাবে তা সম্ভব।
ডেড বডি সংগ্রহের খরচ আরও কমিয়ে দিয়ে।
অথবা, একেবারে না খরচ করে!
কি দরকার খামোকা দালালদের পেছনে টাকা খরচ করার? ডেড বডি যে কিনতেই হবে, এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। গোরস্থান থেকে লুঠ করারই বা দরকার কী? তাতেও অনেক খরচ, অনেক হাঙ্গামা।
সব খরচের সাশ্রয় সম্ভব একটিমাত্র পন্থায়।
মড়া বানিয়ে নেওয়া।
ডেড বডি জোগাড় করার ঝক্কি অনেক–কিন্তু মড়া তৈরি করার কোনও ঝক্কি নেই। বাউন্ডুলে, ভবঘুরে, ভিখিরে অনেকেই আছে। এদের ঠিকানা নেই। নিখোঁজ হলে কারও মাথাব্যথাও নেই। মরলেও কিছু এসে যায় না। বডি পিছু গড়ে দেড়শো টাকা নীট লাভ করো।
অতীব লাভজনক ব্যবসা। কিন্তু হুঁশিয়ারি প্রয়োজন। বডি দেখে যেন সন্দেহ না হয় যে আনন্যাচারাল ডেথ।
ফৌতি ব্যবসার বিপদ এইখানেই।
.
শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষ।
গিরধরলাল টুলে বসে পা দোলাচ্ছে। দেবী চামুণ্ডার পদতলে নিক্ষিপ্ত অসুরের মতন মাংসপুষ্ট বপু। মিশমিশে কালো। চোখ দুটি ঘোর রক্তবর্ণ। নগ্ন গা। কটি দেশে ক্ষীণ বস্ত্রাবরণ।
গিরধর পূর্বজন্মে শুম্ভ অথবা নিশুম্ভ ছিল বোধ হয়। ইহজন্মে সে একাধারে ডোম ও মুদ্দোফরাশ। জাতিতে চণ্ডাল।
গিরধর বিপত্নীক। অতিকোপনা বউয়ের সঙ্গে বছর দুই ঘর করেই নিষ্কৃতি পেয়েছে–ও পথ আর মাড়ায়নি। কিন্তু দেবী ধান্যেশ্বরীর সেবা চলে নিয়মিত। আর তার সঙ্গে দেবী সূর্যমুখীর প্রসাদে সে তুরীয় আনন্দে আছে।
টুলে বসে বিড়ি টানতে-টানতে সেই কথাই ভাবছিল গিরধর।
কালরাতের মৌজ এখনও কাটেনি। উপরি পয়সা হাতে এলে এটু ফুর্তি না করে পারে না সে।
হাসপাতালের স্টুডেনবাবুরা দিলদরাজ। শুধু মুখে খোশামুদ নয়, হাতে সিকি-আধুলি গুঁজে দিয়ে যায় বায়নাস্বরূপ। বডির বায়না।
ডেড বডি জোগাড় কি চাট্টিখানি কথা? তাকে অবশ্য কিছুই করতে হয় না। দালালরাই বড়ি পৌঁছে দিয়ে যায় ঘরে। কম দামে কিনে চড়া দামে বেচে দেয় গিরধর। তাকেই সব করতে হয়। মড়া নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও কেনাবেচার সময়ে কোনও ডাক্তারবাবুই থাকেন না।
খোলা দরজায় উঁকি মারল দুটি মুণ্ড। একজনের মুখ তরতরে, চোখেমুখে কথা কয়। অপরজনের চোখ পাচার চোখের মতন বকুটিল, টেপা-ঠোঁট, শুকনো মুখ।
বিড়িটা দাঁতে কামড়ে বললে গিরধর, ফিকির-ফকির যে! এত সকালে?
চৌকাঠ পেরিয়ে এল তারা। তরতরে মুখ যার, সে বেশ ঢ্যাঙা, ডিগডিগে। পেচক-চক্ষু গাঁট্টাগোট্টা। প্রথম জন ফকিরচাঁদ, দ্বিতীয় জন ফিকিরলাল। দুজনেই লাশ চালানি। গিরধরলালের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়।
ফকিরচাঁদ হেসে বললে, মাল আছে।
হাত নেড়ে গিরধরলাল বললে, দরকার নেই। কাল একটা পেয়েছি।
একটু দমে গেল ফকির। কিন্তু ফিকিরের মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না।
ফকিরচাঁদ বললে, সস্তায় দিব। লিয়ে লাও।
অর্থাৎ সস্তায় কিনে কাঠের বাক্সের মধ্যে বরফচাপা দিয়ে রাখলেই হবে। স্টুডেনবাবুরা কালকেই বডি চাইবে।
বিড়ি কামড়েই বলল গিরধর, কত?
সোয়া-শ।
যা, ভাগ।
কত দিবি বলবি তো?
সত্তর।
শেষ পর্যন্ত রফা হল নব্বই টাকায়। বডি আনতে চলে গেল ফিকির আর ফকির। মনে মনে হিসেব করে দেখল গিরধর। একদিনেই ষাট টাকা লাভ। সূর্যমুখীর নাকছাবির খরচটা তো উঠে গেল।
ঘণ্টা তিনেক পরে ফিরে এল ফিকির আর ফকির। সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তি। মাথায় করে এনেছে একটা ঝকা। চারজনে ধরাধরি করে মেঝেতে নামাল ঝাঁকাটা।
ঝাঁকার মধ্যে একটা মুখবাঁধা বস্তা। মুখের দড়ি খুলে দিল ফিকির আর ফকির। বস্তার পেছনের কোণ দুটো ধরল শক্ত মুঠোয়। তারপর হ্যাঁচকা টানে বস্তা উপুড় করে দিল মেঝের ওপর।
ধপ করে বস্তার মধ্যে থেকে ছিটকে এল একটা কিশোর বালকের প্রাণহীন দেহ।
চোখ কুঁচকে বস্তা উপুড় করার ধরনটা দেখছিল গিরধরলাল। মানুষে মরে গেলেও এইভাবে কেউ তাকে ছুঁড়ে ফেলে না। ডেড বডি নিয়ে এত হেলাফেলা বড় বেশি দৃষ্টিকটু।
এবার চোখ ফিরল বডির দিকে।
এবং ফেরাতে পারল না বেশ কিছুক্ষণ।
ছেলেটি সুদর্শন। বছর চোদ্দো-পনেরো বয়স। গায়ের রং তামাটে। কিন্তু নাকমুখ বেশ ধারালো। মৃত্যু এখনও তার সতেজ লাবণ্য কেড়ে নিতে পারেনি। বাঁ-রগটা সামান্য কেটে গেছে এবং রক্ত ক্ষরণের দাগ রয়েছে।
অনিমেষে চেয়ে রইল গিরধর। বিড়িটা ধরা রইল দাঁতের ফাঁকে। ভুলে গেল টানতে। কোথায় যেন একটা খুঁত রয়েছে ধরতে পারছে না সে।
স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই তো মনে হচ্ছে। বল প্রয়োগের এতটুকু চিহ্ন নেই…অথচ কোথায় যেন একটা গলদ রয়েছে… ।
…না! ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক হবে না। মনে খটকা যখন লেগেছে…
