দরজা ভেজানো ছিল। মেঝেতে লুটিয়ে আছে সুরেশ। হাতে রয়েছে দুশমন আকৃতির একটা হ্যান্ডগান। ভোদা, কালচে। চিক্কণ নয় মোটেই। খাদা চোঙা লম্বায় মোটে দুইঞ্চি। দেখলেই গা হিম হয়ে যায়। স্টার ওয়ার্স সিনেমার ডার্থ ভেডার-এর রশ্মিবন্দুক বললেই চলে।
আমেরিকার কুখ্যাত কোবরে M-11/9–যার ম্যাগাজিন থেকে বত্রিশটা নাইন মিলিমিটার সাইজের তামার গুলি বেরিয়ে যায় পরপর–একবার ট্রিগার টিপে ধরলেই।
সুরেশ তার নিজের ব্রেন আঁঝরা করেছে বত্রিশটা মৃত্যুদূতকে দিয়ে।
তার আগে লিখে গেছে ছোট্ট চিঠি। পরিষ্কার বাংলায়:
আমার অপরাধ আমি মারোয়াড়ির ছেলে। ময়নাকে এত ভালোবেসেও তার মন পেলাম না। ও আমাকে চায়নি। চেয়েছিল আমার কোবরেকে। হানাবাড়িতে গেছিল কোবরের শক্তি যাচাই করতে। খালি করেছিল ম্যাগাজিন। তারপর সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি দিইনি। কেড়ে নিতে গেছিল। পারেনি। ক্যারাটে চপ মেরেছিল আমার কণ্ঠা টিপ করে। আমি থার্ড গ্রেড ব্ল্যাক বেল্ট ও নই। ঘুরে গিয়ে বেঁচে গেছিলাম। হাতের কোবরেও ঘুরে গিয়ে ওর মাথায় মেরেছিল। ভীষণ ভারি। মারা যায় তক্ষুনি। বাঁটের খাঁজ ছিল চোট-এর জায়গায়। লেভেল করে দিয়েছিলাম পাথর দিয়ে। ময়না নেই। আমি চললাম। রইল অভিশপ্ত কোবরে। আর যেন কাউকে ছোবল না মারে।
* নবকল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা, ১৪০০)।
ফকিরচাঁদের ফৌতি ব্যবসা
চোখের সামনে থেকে খবরের কাগজটা নামিয়ে গুলি-গুলি চোখে আমাকে নিরীক্ষণ করলেন পুলিশ কাকা।
তারপর চেরা-চেরা গলায় শুধোলেন–হঠাৎ কী মনে করে?
কাষ্ঠ হেসে বললাম, পুলিশের গোয়েন্দাগিরি…
এমন সময়ে হাঁচি এল কাকার। এই এক ব্যায়রাম তাঁর সাইনাসাইটিস। দক্ষ পুলিশ কর্মচারী ছিলেন ব্রিটিশ আমলে। সাব ইন্সপেক্টরের পদ থেকে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার হয়েছিলেন। বড়লাটের হাত থেকে সোনার মেডেল নিয়েছেন। দোষ একদম ছিল না। পান-তামাক বিড়ি-সিগারেট-চা-কফি-নস্যি কোনও নেশা নেই।
দোষের মধ্যে ওই হাঁচি আর নাক ঝাড়া।
হচ্চো করে হাঁচতেই আমি থেমে গেলাম। তারপর বললাম, নিয়ে কিছু…
হ্যাঁচ্চো! গল্প লেখবার…
হ্যাঁচ্চো! ফরমাশ এসেছে।
ফোঁৎ-ফোঁৎ! এবার শুরু হল নাকঝাড়া।
আমি আবার গোড়া থেকে আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি, উনি হাত তুলে নিরস্ত করলেন। রুমালের পাট খুলে নাক ঝাড়লেন, এবং পাট মুড়ে রেখে আমার দিকে ফের গুলি-গুলি চোখে তাকালেন।
বক্রসুরে বললেন, শুনেছি। পুলিশ আবার গোয়েন্দাগিরি করে নাকি?
নার্ভাস হয়ে গেলাম। চিরকাল হয়েছি। পুলিশ কাকার স্বভাব রুক্ষ, চেহারা রুক্ষ, কথাবার্তাও রুক্ষ। চুল ছাঁটেন মল্লবীরের মতো। সামনের দিকে তিন বর্গইঞ্চি পরিমিতো স্থানে ইঞ্চিখানেক লম্বা কয়েকগাছা পাকা চুল–বাকি মাথা ক্লিপ দিয়ে মুড়িয়ে ছাঁটা। গড়ুর পাখির ঠোঁটের মতন বেঁকানো নাক, পুরু ওষ্ঠ এবং দৃঢ় চিবুকের মধ্যে কঠোর মনোবল, ধীশক্তি এবং একগুঁয়েমির লক্ষণ। সন্দেহ কুটিল চাহনি সারা জীবন ক্রিমিন্যাল ঘেঁটে কাউকেই যেন আর বিশ্বাস করেন না।
জোর করে হেসে বললাম, আগে ইন্ডিয়ান পুলিশ জার্নাল বেরোত–আপনারা রিটায়ার করলেন–সে সবও বন্ধ হয়ে গেল। তাই…
ওষুধ ধরল। সাদা চুলভরতি বুকে হাত বুলোতে-বুলোতে কাকা বললেন, কে আর বলবে? ক্যালকাটা পুলিশ জার্নালও যদি একটা থাকত–
কথাটা অসমাপ্ত রাখলেন কাকা। নত-চক্ষে কি যেন ভাবলেন। তারপর ভ্রুকুটি-ঘন চোখ তুলে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করলেন আমাকে–যেন মনে-মনে তৌল করলেন আমার অন্তরের অভিপ্রায়। অবশেষে বললেন স্বভাবকর্কশ গলায়, আমাদের কালে ফোরেনসিক সায়েন্সের এত রমরমা ছিল না। সায়েন্টিফিক ডিটেকশন যখন শুরু হয়নি, যখন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের ওপর আমরা বেশি গুরুত্ব দিতাম–তখনকার একটা কেস মনে আছে।
আমি নড়েচড়ে বসলাম।
কেসটা স্রেফ সারকন্সট্যানসিয়াল এভিডেন্সের ওপর খাড়া করেছিলাম। কিস্ এভিডেন্স পাইনি–প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না।
প্রমাণ?
তাও ছিল না। ছিল শুধু একটা সূত্র। খুব সামান্য। বাকিটা ব্যাক ক্যালকুলেশান করে মনে মনে কল্পনা করেছিলাম।
পুলিশ কাকা অঙ্কে সোনার মেডেল পেয়েছিলেন এম. এস. সি. পরীক্ষায়–ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। পিছুহটা অঙ্কতে রপ্ত থাকবেন বইকী। কিন্তু
জিগ্যেস করলাম, কোর্টে কেস টিকেছিল?
বলেই বুঝলাম ভুল করেছি। নির্দয় চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন পুলিশ কাকা। তারপর প্রচণ্ড শব্দে নাক ঝাড়লেন গুনে-গুনে তিনবার। রুমালটা পাট করে রেখে কর্কশকণ্ঠে বললেন, ফাঁসি হয়ে গিয়েছিল ফকিরচাঁদ, ফকিরলাল আর শ্রীশচন্দ্রের লাটে উঠেছিল ফৌতি ব্যবসা।
আমি কিছুক্ষণ কাঠ হয়ে বসে রইলাম। তারপর শুধোলাম ভীরুকণ্ঠে, ফৌতি ব্যবসা কী?
মার্বেল-চোখে এক পশলা তাচ্ছিল্য বর্ষণ করলেন কাকা। একটা উদগত হাঁচিকে সংবরণ করে নিয়ে বললেন ঠোঁট বেঁকিয়ে, মড়া…ডেড বডি নিয়ে কারবার।
.
তখন বডি স্ন্যাচারদের স্বর্ণযুগ।
সোনা-দানা-মণিমুক্তো নয়–স্রেফ লাশ লুঠ করেও দু-পয়সা পিটছে একদল লোক।
কলেজ হাসপাতালের শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষে দারুণ চাহিদা রয়েছে মরা মানুষের। মড়াপিছু দেড়শো থেকে দুশো টাকা। মড়া কেটে জ্ঞানার্জন করতে চায় ছাত্ররা। অত মড়া হাসপাতাল থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। চালান আসত বাইরে থেকে।
