জিনিসটাও। ম্যাগনিফাইং গ্লাসে দেখেছি। শার্লক হোমস-এর মতো।
এবারের খোঁচাটা যেন শুনতেই পেল না ইন্দ্রনাথ, বস্তুটা ধার দেবেন?
স্বচ্ছন্দে। আমরা প্র্যাকটিক্যাল ডিটেকটিভ। নাইনটি পারসেন্ট পার্সপিরেশন–টেন পারসেন্ট ব্রেন ওয়ার্ক। আচ্ছা আসুন, নমস্কার।
.
জগদীশ গুপ্ত সত্যিই আদর্শবান পুরুষ। এত বড় শিল্পপতি–অথচ তিনতলা বাড়িটাকে বানিয়েছেন মধ্যবিত্তের মতো।
দোতলার বৈঠকখানা ঘরে বসে তিনি বললেন, আপনাকে তো বলেইছি, ময়নার নীতির বালাই ছিল না। দেদার ছেলে-বন্ধু।
মেয়ে-বন্ধু?
কম।
বিশেষ কারও নাম?
রিসিভারের দিকে হাত বাড়ালেন জগদীশবাবু, কমলি, স্কুটারটা আছে? নিয়ে চলে আয়। দশ মিনিটের মধ্যে।
.
কমলির পরনে কমলা রঙের সালোয়ার কামিজ। কালো বডিখানা স্টিলের তলোয়ার বললেই চলে।
বললে, একটা ছেলেই বড় হ্যাংলামো করত ময়নার সঙ্গে। আমাদের সঙ্গেও করেছে। একটু বেশি চায়। ও দাদু, আপনি কানে চাপা দিন।
ইন্দ্রনাথ বললে, তার কি সবুজ গাড়ি আছে?
চোখ বড় হয়ে গেল কমলির, মারুতি।
কোথায় পাব তারে?
গ্রেট ইন্ডিয়ান রেফ্রিজারেশন কোম্পানির মালিকের একমাত্র ছেলে তার চেম্বারে বসে বললে, হ্যাঁ, আমার মারুতি আছে। সবুজ রঙের। চন্দননগরের ডিসুজাসাহেবেরও পার্সোনাল গাড়িটা মারুতি। সবুজ রং। চেনেন ডিসুজাকে? থানাদার ডিসুজা?
এখুনি এলাম তার কাছ থেকেই।
থানায় গেছিলেন? গাড়িটা দেখেননি? ওর অফিসের সামনেই থাকে।
আপনার গাড়িটা কোথায়?
এই জানলা দিয়ে তাকান। ওই দেখুন।
ইন্দ্ৰনাথ উঠে গেল জানলার কাছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছে ছেলেটাও। মিঠুন চক্রবর্তীর কায়দায় চুলের ছাঁট। পাতলা নাক, একটু টিকোলো। শান্ত সুন্দর চোখের চাহনি–অনেকটা ইন্দ্রনাথের মতোই। লম্বায় দুজনেই সমান। দেখতেও সমান সুন্দর। শুধু পোশাক আলাদা। ধুতি-পাঞ্জাবির পাশে সাফারি সুট।
এখন ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। চোখে-চোখে তাকিয়ে।
আপনি তাহলে যাননি ময়নার সঙ্গে?
না।
কোথায় ছিলেন?
এখানে।
তার প্রমাণ? আপনি মালিকের ছেলে। হাজিরার খাতা আপনার জন্যে নয়।
কাঁধ আঁকাল সুদর্শন তরুণ, বিশ্বাস করুন।
.
জয়ন্তকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে ফিরলাম ইন্দ্রনাথের ডেরায়।
জয়ন্ত, বললে ইন্দ্রনাথ, থানাদার ডিসুজার মারুতি আর সুরেশ লাম্বার মারুতি–দুটোই এখন সন্দেহের আওতায় চলে এসেছে।
সুরেশ লাম্বা সুদর্শন ওই ছেলেটার নাম। চেহারায় নবাবপুর। স্বভাবে মেয়েঘেঁষা। মাড়োয়ারি জন্মসূত্রে শিক্ষায়-দীক্ষায় বাঙালি।
জয়ন্ত বললে, থানাদারের গাড়ি তোলা পরে হবেখন। সুরেশের গাড়ি তুলিয়ে নিচ্ছি। আর কী হুকুম?
জবাব না দিয়ে টেলিফোন তুলল ইন্দ্রনাথ। নিমেষে তারের ও-প্রান্তে এসে গেল প্রেমাদ– প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কর্ণধার। দিল্লি যার হেড অফিস।
দিল্লি আর কলকাতায় কথা হয়ে গেল এইভাবে :
ইন্দ্র বলছি। হেল্প চাই।
ফরমাইয়ে।
সরকারি ফোরেনসিক ল্যাবের দুরবস্থা তোর অজানা নয়।
সেইজন্যেই তো ইমপোরটেড ইকুইপমেন্ট দিয়ে সাজিয়েছি আমার ফোরেনসিক ডিপার্টমেন্ট। সেটাও তোর অজানা নয়।
কাল সকালে ক্যালকাটা অফিসের ইনচার্জকে পাঠিয়ে দে।
তোর কাছে? কী মতলবে?
এক টুকরো রং পাঠাব..না, না, দুটো টুকরো। দুটোই সবুজ রঙের।
বেশ?
স্পেকটোগ্রাফিক অ্যানালিসিস করতে হবে।
প্রতিটি নমুনায় কী কী উপাদান আছে জানতে হবে? মিলে যাছে কিনা বলতে হবে?
ইয়েস, মাই বয়।
হেল উইথ ইউ। ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে এইভাবে কেউ কথা বলে?
প্রেম, স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোসকোপ আছে? যা দিয়ে এক্স-রে অ্যানালিসিস করা যায়?
কী নেই বন্ধু? দিস ইজ প্রেমাদ প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি—
রঙে কটা স্তর আছে, বলতে হবে।
আর কী?
লেজার এনার্জি দিয়ে এক-একটা রঙের স্তরকে ভেপার করে দেওয়ার প্রসেসটার কী যেন নাম?
লেজার মাইক্রোপ্রোব। ভেপারকে অ্যানালাইজ করতে হয় এমিসন স্পেকট্রোগ্রাফি দিয়ে। রঙের প্রত্যেকটা উপাদানের ওয়েভ লেন্থ জানা যায়। এত দরকার আছে কি?
আছে। অকাট্য প্রমাণ ছাড়া মাল ফসকে যাবে। টাকার মালিক। পলিটিক্যাল কানেকশন আছে নিশ্চয়। আমি চাই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। হেল্প মি।
ডোন্ট ওয়ারি।
অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম। কবিতা সারাদিন হেদিয়ে মরেছে। ভাগ্যিস ইন্দ্র সঙ্গে আসেনি। ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিত কবিতা।
কথার তোড় নীরবে শুনে গেলাম। তারপর বললাম সারাদিনের কাহিনি। সবশেষে বললাম, সুরেশ লাম্বাই গেছিল ময়নার সঙ্গে হানাবাড়িতে।
জানলে কীভাবে?
বাগানের নুড়ি চাকায় লেগে ছিটকে গিয়ে লেগেছিল ড্রাইভারের দরজার প্যানেলে। রং চটে গিয়েছিল নুড়িতেই। ডিসুজা কূর্ম অবতার-থানাদার হলেও এই একটি উত্তম কাজ করেছে। কুচি
রং হুবহু মিলে গেছে চটা রঙের জায়গায়। নিজের চোখে দেখে এলাম।
হুম করে দম ফেলে কবিতা বললে, ঠাকুরপোর ব্রেন আছে বটে। ডিটেকশনে ডক্টরেট। এখন মাইক্রোসকোপিক এগজামিনেশন করে মিলিয়ে নেওয়া বাকি। ফাইন! লাম্বা ছোঁড়া কি লম্বা দিয়েছে?
তাকে বাড়ি ছেড়ে নড়তে বারণ করে এল ইন্দ্রনাথ। লোকাল থানাদারও নজর রেখেছে।
নজর রাখাই সার হয়েছিল।
.
পরের দিন সকালেই টেলিফোন এসেছিল ইন্দ্রনাথের, মৃগ চলে আয়। লাম্বা-লম্বা দিয়েছে।
গেলাম লাম্বার বাড়ি। ঊষালগ্নে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠেছিল ঘন-ঘন গুলির আওয়াজে। গুলি চলছে সুরেশ লাম্বার ঘরে। আধ মিনিটেই থেমে গেছিল শব্দ।
