.
ময়না? আপনার নাতনির নামও ময়না?
ময়নামতী। ওর মায়ের নাম ছিল ইন্দুমতী। তার মায়ের নাম বিন্দুমতী-মানে, আমার স্ত্রী।
চুপ করে রইল ইন্দ্রনাথ। ভাবছে।
বললে, বইখানা আমার কাছে থাক। আপনার নাম-ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে যান।
.
ঘণ্টাখানেক লাগল বাগবাজারে পৌঁছতে। ইন্দ্রনাথ আমাকে ল্যাজে বেঁধে নিয়ে গেল। মান্ধাতার আমলের দোতলা বাড়িটার সরু সিঁড়ি দিয়ে সটান উঠে গেল। চাতালে দাঁড়িয়ে তিন দিকের তিনটে দরজার একটার কড়া নেড়ে বললে, ভূতনাথবাবু, জেগে আছেন, না ঘুমোচ্ছেন?
কর্কশ খিটখিটে বুড়োটে জবাব ভেসে এল ভেতর থেকে, আবার কে আপদ এল? মোক্ষদা…ও মোক্ষদা…বলে দে ঘুমোচ্ছি।
দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। ভেতরে পা দিল ইন্দ্রনাথ। আঠার মতো পেছনে লেগে আছি আমি। ঢুকেই বললে, মানুষ বিপদে পড়লেই আপনার কাছে আসে। আপদ হব কেন?
তক্তপোশে বসে এক বুড়ো। তিনদিকে তিনটে তাকিয়া। শিরদাঁড়া কুঁজো। গায়ে ময়লা গেঞ্জি। একমাথা টাক। গোটা শরীরটার হাড়গুলো চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কোনও মানুষ যে এত রোগা আর কঙ্কালসার হয়, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
চশমাটা চোখে আঁটতে-আঁটতে খিটখিটে বুড়ো বললেন, চেনা-চেনা গলা মনে হচ্ছে…আরে কে ও! ইন্দ্রনাথ…ভূতনাথের চ্যালা..কী জাদু…এতদিন পরে কী মনে করে? ভূতধরা আমি ছেড়ে দিয়েছি। গেট আউট।
অম্লানবদনে তক্তপোশে গিয়ে বসল ইন্দ্রনাথ। আমাকে বললে বসে পড়তে। বুড়োর তেউড়ে যাওয়া ওপরের শিরদাঁড়া টিপে দিতে দিতে বললে, ব্যথাটা তো এই তিনখানা ভার্টিব্রায়?
হ্যাঁ…হ্যাঁ…ন্যাকামো হচ্ছে?
ভূতনাথবাবু, এডগার লুসিকে চেনেন?
দ্যাট ফোর-টোয়েন্টি? চারশো বিশ নম্বর ওয়ান? চন্দননগর নিয়ে যে গুলগাপ্পা ঝেড়েছে?
দ্য মোস্ট হন্টেড হাউস ইন ইন্ডিয়া আপনি পড়েছেন?
হোয়াট! এডগারের নষ্টামি আমি পড়ব না? গেট আউট। শিরদাঁড়া টিপতে টিপতে ইন্দ্রনাথ বললে, আরাম লাগছে?
হুঁ।
এডগার ফোর-টোয়েন্টি কেন?
সব বোগাস। ও বাড়িতে কী আছে, সেটা এখনও গবেষণার বিষয়। আমার শিরদাঁড়াটা বেগড়বাঁই না করলে অ্যাটেম্প নিতাম। তবে এডগার ব্যাটাচ্ছেলে অ্যান্টনি গোমেজ আর রামকানাইয়ের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে সব বানিয়ে লিখেছে। যত না কাণ্ড ঘটেছে, তার বিশ গুণ বাড়িয়েছে। ননসেন্স। স্কাউন্ডেল!
আপনি জানলেন কী করে?
ইউ ফুল! ইউ ড্যাম! আমি জানলাম কী করে? ভূত-শিকারি ভূতনাথকে এ কথা বলবার সাহস তোমার হয়? গেট আউট!
বলুন না।
ইন্ডিয়ার একমাত্র ভূত-শিকারি আমি। ভূতের বাড়িগুলোর বদনাম ঘোচানোর জন্যে কোথায় যাইনি? কিন্তু বদনাম বাড়িয়ে লিখে যে লোক বই বিক্রির ধান্দায় থাকে–সে আমাদের প্রফেশনের কলঙ্ক। এডগার তাই করেছে। টাইমস আর বিবিসি থেকে রিপোর্টার পাঠিয়েছিল ঘটনাগুলোর সত্যি মিথ্যে যাচাই করতে। গোমেজের ওই বউটার নাম যেন কী?
মায়া।
বেনেদের সেই মেয়েটা। ভালো মেয়ে। ইংরেজিটা বেশ জানে। স্বামীর কুকীর্তি চিঠি লিখে আমেরিকাব সাইকিক্যাল রিসার্চ সোসাইটিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ওদের জার্নালে তা ছেপে বেরোয়– ওই তো ওই তাড়ার মধ্যে আছে। খাসা চিঠি। নাম কেনার জন্যে অ্যান্টনি হাত মিলিয়েছিল এডগারের সঙ্গে। মায়ার তা ভালো লাগেনি।
ময়নামতী কিছু বলেনি?
রামকানাইয়ের সেই মিচকেপোড়া বাঁজা বউটা? দুটোই ফোর টোয়েন্টি। নাম আর পয়সা– দুটোরই দরকার ছিল। কম দক্ষিণা লুটেছে?
কিন্তু লোকে তো দেখেছে ভৌতিক কাণ্ড?
ভৌতিক কাণ্ড? স্টুপিড! ওসব ম্যাজিক আমিও জানি। বুড়বকদের বুদ্ধ বানাতে জানতে হয়। সৎ বলেই এই হাল আমার।–এসেছ কেন? মতলবটা কী?
ওই বাড়িতে একটা মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে।
কে মেরেছে?
ভূতে নিশ্চয়। পাথর পিটে খুলি ভাঙা হয়েছে।
খবরদার! খবরদার! মেরিয়ানা খুনি নয়। অভাগিনী মুক্তি পাচ্ছে না বলেই দুষ্টুমি করছে খুন করার ধাত তার রক্তে ছিল না–মনেও ছিল না।
মরে গেলে তো ধাত পালটে যায়?
কোথাকার জ্ঞানদাতা রে? গেট আউট! গেট আউট! পরলোক নিয়ে পকড়-পকড় করতে এসেছে ভূতনাথ শিকদারের কাছে। যা জানতে চাও, সেটা জেনে যাও। মেরিয়ানার প্রেতাত্মাকে কেউ স্কেপগোট খাড়া করতে চেয়েছ। পাথর পিটিয়ে খুলি গুঁড়িয়ে বোঝাতে চাইছে–প্রেতিনীর কীর্তি। কক্ষনও না। মানুষের কীর্তি। মাগী ওখানে গেছিল কেন?
মাগী নয়–মেয়ে। ষোলো বছর বয়স।
আইব্বাস! লভ করতে তো? ওই হানাবাড়ির বাগান তো লভের জায়গা। কলকাতা থেকেও ছোটে ছোঁড়াছুঁড়িরা। এই ছুঁড়িটার লাভার আছে…নিশ্চয় আছে…গেট আউট..আমার খিদে পেয়েছে।
.
চন্দননগর পুলিশ থানা।
থানাদার ডিসুজা সাহেব বেশ খাতির করলেন আমাদের। ইন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি করলেন আমাকে। কারণ আমি লিখি। ট্র্যাকের জোর না থাকলেও আজকাল লেখকরা ইদানীং বেশ কলকে পাচ্ছে এই একটা জোরে। কলমের জোরে।
অ্যালকাথিনের একটা প্যাকেট ইন্দ্রনাথের সামনে রেখে তিনি বললেন, গল্পের গোয়েন্দা আমি নই। হলে তুচ্ছ এই জিনিসটা নিয়ে মাথা ঘামাতাম।
খোঁচাটা হজম করে নিয়ে বুদ্ধদেবের হাসি হাসল ইন্দ্রনাথ। হাসিতে যেন বরাভয় ঝরে পড়ছে। বললে, কোথায় পেলেন?
বাগানের রাস্তায়। পাথর নুড়ির ওপর পড়েছিল। কত ছোট দেখেছেন? আলপিনের ডগার চেয়ে একটু বড়।
রঙটা সবুজ।
