আর যায় কোথাও ভয়ানক খেপে গেছিল প্রেতিনী আর তার হবু বর। বাগানের নুড়ি ছুঁড়ে জানলার কাঁচ গুঁড়িয়েছে, ঘণ্টা বাজিয়ে কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। তাতেও যখন পোড়োবাড়ি ছেড়ে পাদমেকং ন গচ্ছামি পণ করেছে রেভারেন্ড দম্পতি–তখন আরও উৎপাত শুরু করেছে ফরাসি ভূতপেতনি।
ময়নামতী এক সন্ধ্যায় বায়ুসেবন করছিল বাগানের পথে। আচমকা একটা আধলা ইট তেড়ে এসেছে তাকে লক্ষ্য করে। অদৃশ্য হাতে ইটের আবির্ভাব ঘটেছে দেখে বুদ্ধিমতী ময়নামতী পিছু ফিরেই দৌড়েছিল সদর দরজার দিকে। বেরসিক বিদেহী তখন সেই ইট আছড়ে মেরেছে তার পিঠে।
বউয়ের গায়ে হাত! রেগে লাল হয়েছিলেন রামকানাই রেভারেন্ড। চিঠি লিখেছিলেন এডগার লুসিকে। এই আঠেরো মাস চন্দননগরের পোডড়াবাড়ির নামও মুখে আনেননি ভূত-শিকারি। রামকানাইয়ের সনির্বন্ধ অনুরোধ পায়ে ঠেলতে পারলেন না। ফের এলেন বাংলার হুগলি জেলায়।
হাওয়ায় খবর এসে গেছিল পোড়োবাড়িতে তৈরি হয়েই ছিল অশরীরীগণ। চৌকাঠে পা দিলেন এডগার লুসি–ঢংঢং করে বেজে উঠল পেতলের মস্ত ঘণ্টা!
থ হয়ে গেলেন ভূত-শিকারি। আপ্যায়নটা হুবহু আগের মতোই হবে নাকি?
হলও তাই। আবার দোতলার ঘরে উড়ে এল ঝরাপাতা আর নুড়ি–আছড়ে পড়ল আধলা ইট!
ভাবনায় পড়লেন ভূত-শিকারি। এ বাড়ির ভূতপেতনি তাঁকে বন্ধু হিসেবে দেখছে, না শত্রু হিসেবে চোখে-চোখে রেখেছে, আঁচ করতে পারলেন না। তবে ক্ষণে-ক্ষণে রোমাঞ্চিত হতে লাগল তাঁর উসকোখুসকো গুম্ফ।
উঠে গিয়ে টেনে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তুলে দিলেন ছিটকিনি।
তার চোখের সামনেই খট করে নেমে এল ছিটকিনি-ফট করে দু-হাট হল দরজা।
চোয়াল ঝুলে পড়েছিল সাহেবের। আর ঠিক তক্ষুনি হিপপকেট থেকে তাঁর রূপোর চিরুনি উঠে এসে ঠকাস করে মাথায় বাড়ি মেরে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।
সাধের চিরুনি আর খুঁজে পাননি এডগারসাহেব।
ক্ষিপ্ত অশরীরীদের ঠান্ডা করার জন্যে ধূপ জ্বালিয়েছিল ময়নামতী। নিভে গেছিল সেই ধূপ। ভূত-শিকারির মাথায় এসেছিল বদবুদ্ধি। মেয়েভূতকে বশ করার জন্যে ল্যাভেন্ডারের শিশি খুলে ঘরময় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সুগন্ধি।
দক্ষিণ ফ্রান্সের হালকা সুবাস কিন্তু পাগল করে দিয়েছিল ফরাসি ভূতপেতনি দুজনকে। মুহুর্মুহুঃ বেজে গেছিল পেতলের ঘণ্টা, দেওয়াল থেকে আছড়ে-আছড়ে পড়েছিল ছবির-পর-ছবি।
তিন দিনের বেশি হানাবাড়িতে থাকতে পারেননি এডগারসাহেব। আগে যা হয়নি–এবার তা হয়েছে। ইট আর পাথর ছোঁড়া হয়েছে তাকে টিপ করে। বুকে আর পিঠে।
তিন দিন পর, সটান বিলেতে ফিরে গেলেন ভূত-শিকারি। লিখলেন ইন্ডিয়ার সবচেয়ে কুখ্যাত হানাবাড়ি নামে একখানা বই। সেই বই ছেপে বেরোতে-বেরোতে গেল একটা বছর।
এই এক বছর কিন্তু হানাবাড়িতেই থেকেছেন রেভারেন্ড রামকানাই এবং তার ভার্যা। লিপিবদ্ধ করেছেন প্রায় দুহাজার অলৌকিক ঘটনা। তার মধ্যে আছে শূন্য থেকে মদের বোতলের আবির্ভাব চেয়ারে আছড়ে পড়ে গুঁড়িয়ে যাওয়া। অবশ্যই তা চন্দননগরের বিখ্যাত সরাব। সাদা দেওয়ালে অদৃশ্য হাতে লিখন। একটাই নাম বারবার লেখা হয়েছে দেওয়ালে। মেরিয়ানা সেই নাম।
রামকানাই প্রতি ঘটনা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন এডগার লুসিকে। বইতে ঠাই পেয়েছিল সমস্ত ঘটনা।
বইটা বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িময় যেন তাণ্ডব নৃত্য আরম্ভ হয়ে গেছিল। ময়নামতীর সাধের কাঁচের বাসনপত্র যখন চুরমার হতে লাগল, গয়নার বাক্স আলমারি থেকে উধাও হয়ে পড়ে রইল লনে–তখন স্বামী-স্ত্রী লম্বা দিলেন বাড়ি ছেড়ে।
জগদীশ গুপ্তর একটা হাস্যকর মুদ্রাদোষ আছে। তিনি তোতলা নন, কিন্তু কথা শুরু করার আগে প্রথম অক্ষরটা জোর দিয়ে বার কয়েক উচ্চারণ করেন। দীর্ঘকাহিনি তিনি নিবেদন করলেন এইভাবেই। বলার ভঙ্গিমা অতিশয় বিরক্তিকর। কিন্তু কাহিনির প্রমাদে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম।
তিনি স্তব্ধ হতেই ইন্দ্রনাথ বললে, বুঝলাম। পার্থিব পন্থায় আপনার নাতনি খুন হয়েছে– পেতনি করেনি–এ বিশ্বাসটা কেন আপনার মাথায় এসেছে, তার জবাব পেলাম।
ক্যা ক্যাক্যানো বলুন তো?
ফরাসি ভূতপেতনী ভয় দেখিয়েছে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলেনি কক্ষনও, বড় অনিষ্ট করেনি।
ঠি-ঠি-ঠিক ধরেছেন। তবে কেন নাতনির খুলি গুঁড়িয়ে গেল?
মানুষের হাত গুঁড়িয়েছে?
হ্যাঁ।
একাই গেছিল?
সেটা আপনি বের করুন। একা যাওয়ার মেয়ে সে নয়। গাদাগাদা ছেলেবন্ধু। শাড়ি কক্ষনও পরেনি। জিনস আর শার্ট। ক্যারাটে জানত। ফায়ার আর্মসয়ে দারুণ ইন্টারেস্ট। চালাতেও জানত। গুলি ফসকায়নি। নীতিবোধ কম। কী বলছি, বুঝছেন নিশ্চয়। দাদু হয়ে আর কী বলব। আমি স্বদেশি করেছি, দেশসেবা করেছি, জীবনে আদর্শ রেখে এতগুলো বছর কাটালাম। এসব আমার ভালো লাগে না। মা নেই, বাবা নেই আমি আর কতদিক দেখব?
বুঝেছি। ভূতের বাড়ির খবরটা পেল কী করে?
জগদীশ গুপ্ত তখন তাঁর ব্যাগের চেন টানলেন। একটা বই বের করলেন। ইন্দ্রনাথের হাতে গছিয়ে দিয়ে বললেন, এই বই পড়ে।
বইটার নাম দ্য মোস্ট হন্টেড হাউস ইন ইন্ডিয়া। লেখকের নাম এডগার লুসি।
চোখ তুলে বললে ইন্দ্রনাথ, পুস্তনিতে তো দেখছি আপনার নাম লেখা রয়েছে।
আমারই বই। এসব ব্যাপার মানি বলেই কিনি। ময়না যে এই পড়ে দৌড়বে, তা ভাবিনি।
