বাকরহিত হয়ে গেছেন এখন তিনজনেই। সাহেব প্রত্যক্ষ করছেন অবিশ্বাস্য দৃশ্য–রেভারেন্ড গোমেজ এবং তদীয় স্ত্রী অবলোকন করছেন শিষ্ট ভূতপ্রেতের অশিষ্ট আচরণ। তারা বিলক্ষণ বিক্ষুব্ধ। অতিথি আপ্যায়নে এহেন ত্রুটি বরদাস্ত করা যায় না।
কিন্তু ভূতপ্রেতের দল কি সহসা ক্ষিপ্ত হয়েছে? মস্তিষ্ক কি তাদের উত্তপ্ত হয়েছে? এত কাণ্ডের পরেও কি তাদের কি ক্ষ্যামা দেওয়া উচিত ছিল না? ঢের হয়েছে–এই বলে রঙ্গ বন্ধ করা উচিত ছিল না?
তা না করে, তারা এবার গাছের শুকনো পাতা বাগান থেকে এনে উড়িয়ে দিয়েছে ঘরময়।
ঘরে হাওয়া নেই। শীতের সন্ধে। জানলা বন্ধ। অথচ যেন হাওয়া ঘূর্ণিপাক রচনা করে চলেছে বিশাল হলঘরে। ঘুরে-ঘুরে নাচের ছন্দে উড়ছে ঝরাপাতার দল।
ক্লাইমাক্সটা ঘটল তারপরেই। নাটকীয় সেন্স না থাকলে এমন চরম কাণ্ড ঘটানো যায় না।
ঢং-ঢং-ঢং-ঢং করে বেজে উঠল একতলার দরজা-ঘণ্টা। সাবেকি বাড়ির সব হালচালই বজায় রেখেছিল বেনের মেয়ে মায়া। সদর দরজায় অতিথি-ঘণ্টা বাজালে অদ্ভুত আভিজাত্যে বাড়ি গমগম করে ওঠে।
সেই ঘণ্টাই এখন বাজছে অশরীরীদের হাতে। মাংসহীন অস্থিহীন করপল্লবে ঘণ্টার দড়ি ধরে বোধহয় ফরাসিনী প্রেতিনী হ্যাঁচকা টান মারতে মারতে নাটকীয়ভাবে জানান দিয়ে যাচ্ছে তার অস্তিত্বের, আমি আছি! আমরা আছি। ও সাহেব লিখে রাখো আমরা ছিলাম, আছি, থাকব!
এই জাতীয় বেল্লিকপনা কোনও সাহেব ভদ্রলোক সইতে পারে? সকালে উঠে খটকা লেগেছিল ডাইরির পাতা থেকে হেডলাইন অদৃশ্য হওয়া দেখে সন্ধে হতেই হানা দিল অদৃশ্য কারিগররা? এইভাবে?
সেই রাতেই তন্নতন্ন করে অভিযান চালালেন লুসিসাহেব। নিচের দরজা বন্ধ ছিল ভেতর থেকে–নেমে নিয়ে দেখলেন বন্ধ রয়েছে তখনও। ঝি-চাকররা কেউ রাত কাটায় না এ বাড়িতে হাজার বখশিস দিলেও। বাড়িখানাও এককালে মঠবাড়ি ছিল বলে এমন কায়দায় নির্মিত যে, সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িতে প্রবেশের আর কোনও পথ থাকে না।
তা সত্ত্বেও বাগানের পাথর আর নুড়ি, কুয়োর ইট আর পাথর, গাছতলার ঝরাপাতা তারা বোধহয় ঝুড়ি ভরতি করে দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে কি এক অলৌকিক পন্থায় পাচার করেছে বাড়ির ভেতরে।
তদন্ত সম্পন্ন হল রাতেই। আর কোনও নাটক দেখায়নি বিদেহীরা। বোধহয় সারারাত হেসেই কুটিপাটি হয়েছে।
পরের দিন পিঠটান দিলেন এডগার লুসি। খিদিরপুরে গিয়ে জাহাজে চেপে লন্ডন। লন্ডনে পৌঁছেই লম্বা কাহিনি ছাপিয়ে দিলেন ডেলি মিরর কাগজে। হইহই পড়ে গেল গোটা কন্টিনেন্টে এবং এই উপমহাদেশেও। ভূত-শিকারির বিশ্বাস জেগেছে যে হানাবাড়িতে রাত্রিবাস করে সে বাড়ি তো একবার দেখে আসা দরকার।
হুজুগে মানুষের অভাব কোনও দেশেই নেই। বিলেত-আমেরিকার মানুষ দলে-দলে তো এলই–এল ভারতের নানান অঞ্চলের মানুষও। বেশি এল কলকাতার মানুষ। হুজুগের চাটনি ছাড়া যাদের ভাত হজম হয় না।
ফলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়াল মায়া আর রেভারেন্ডের। নির্জনে রোমান্স আর রোমাঞ্চর ডবল লাভের আশাতেই ঘর বেঁধেছিলেন তারা এই পোড়োবাড়িতে। দিনগুলো যাচ্ছিল ভালোই। সূক্ষ্মশরীরীরা ঈর্ষায় জ্বলে গেলেও স্থূলশরীরী দুজনের পাকাধানে মই দেয়নি এতদিন। এখনও দিল না। তবুও বাড়ি ছেড়ে সরে পড়তে হল গোমেজ দম্পতিকে। ভূতের উৎপাতে নয় দর্শনার্থীদের উপদ্রবে। দিবারাত্র খালি লোক আর লোক। বাগানে লোক, বাগানের বাইরে লোক, ঘরে লোক। ঘণ্টা বাজছে যখন-তখন। পিলপিল করে আসছে উৎসুক মানুষ–চন্দননগরের সস্তা সুপেয় পানীয় পান করছে এবং ঢংঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দেখছে–বিদেহীদের হাতে কতখানি শক্তি থাকলে তবে এই ভারি পেতলের ঘণ্টার কণ্ঠা নাড়ানো যায়।
তাই পালিয়ে গেলেন রেভারেন্ড দম্পতি। লুসিসাহেব যেদিন কাষ্ঠ হেসে বিদায় নিলেন, ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে, বাড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে, বিদেহীদের উদ্দেশে টা-টা, অ-রিভয়ের, অ্যাডিউ বলে গেলেন তার একমাস পরেই ছলছল চোখে মায়াও খ্রিস্টান স্বামীর হাত ধরে চলে এল শ্রীরামপুরে।
তারপর কেটে গেছে আঠারোটা মাস। পরিত্যক্ত থেকেছে পোড়োবাড়ি।
১৯৩১-এর নভেম্বরে আর এক কাঠগোঁয়ার রেভারেন্ডের ইচ্ছে হল ওই বাড়িতে থাকবেন। বিলিতি শিক্ষার একটু ছোঁয়া পেলেই দেশীয় বিশ্বাসগুলোকে কুসংস্কারের বাতি জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়ার মহান উদ্দেশ্য প্রজ্জ্বলিত তখন অনেক মহাশয় ব্যক্তির মধ্যে। রেভারেন্ড রামকানাই বিশ্বাস তার ব্যতিক্রম নন। ইনিও এলেন তার বাঁজা বাঙালি বউকে নিয়ে। সন্তান-টন্তান না হলে মেয়েদের মাথায় বোধহয় ছিট গজায়–সবকিছুর মধ্যেই বাতিক দেখা যায়। বাঁজা বউটির নাম ময়নামতী। খাসা নাম। রামকানাই এই নাম শুনে আর শ্যাম অঙ্গ দেখে ময়নামতাঁকে সহধর্মিণী বানিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর বুক ফুলিয়ে একদিন উঠে এলেন পোড়োবাড়িতে।
বুক চুপসে গেল দুদিনেই। অপদেবতারা মানুষের অহঙ্কার দু-চক্ষে দেখতে পারে না। চোখের ঘুম উড়ে গেল রামকানাই আর ময়নামতীর। রাতের শয়ন পর্যন্ত নির্বিঘ্ন রইল না।
রামকানাই পড়েছিলেন এডগার অ্যালান পো-র ব্ল্যাক ক্যাট গল্পটা। দেওয়ালে জ্যান্ত কবরস্থ হয়েছিল কালো বেড়াল বাড়ির বউয়ের ডেডবডির সঙ্গে। তাই তিনি মঠের সমস্ত দেওয়াল ঠুকে ঠুকে দেখতেন ফোঁপরা দেওয়াল কোথাও পাওয়া যায় কিনা।
