নেই শুধু গেঁইয়াদের গল্প শিরোনামটা!
তাজ্জব কাণ্ড! গালে হাত দিয়ে বসে রইলেন ভূত-শিকারি ইংরেজ। কায়াহীন বড় রসিক তো! হেডলাইনটাকেই উড়িয়ে দিয়েছে।
উপদ্রব শুরু হল সেইদিনই সন্ধে থেকে। উপদ্রবের পর উপদ্রব। উৎসব শুরু হয়ে গেছে যেন অতিপ্রাকৃত দুনিয়ায় অসম্ভব কাণ্ড ঘটাতে লেগেছে কোমর বেঁধে।
দোতলার ঘরে বসেছিলেন ভূত-শিকারি। বড় ঘর। এক কথায়, হলঘর। আড্ডা মারবার জন্যে তৈরি। খানদানি সাহেববাড়ি আর জমিদারবাড়িতে এই ধরনের বড়-বড় ঘর দেখা যায়। বিলাসী জমিদারবাবুরা নাচঘর বানাতেন এই কায়দায়। গোটা ঘর মোড়া থাকত দামি কাশ্মিরী কার্পেটে।
সেসব দিন গেছে। চন্দননগরের এই ফরাসি যাজক বোধহয় সেই বাবুয়ানির রেশ টেনে আনতে চেয়েছিলেন বিশাল এই ঘরখানায়। গাঁয়ের লোকদের মুখে কানাঘুষোয় অনেক গল্পকথাও শুনে এসেছেন ভূতশিকারি। ষোড়শ শতকের পাদরির কিঞ্চিৎ নারীঘটিত দোষ ছিল। মঠের মেয়েদের মাঝেমাঝে এই ঘরে নিয়ে আসতেন। যে মেয়েটি অশরীরী হয়ে আজও টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, তাকেও কবজা করতে চেয়েছিলেন। রূপে সে ছিল তিলোত্তমা, স্বভাবে সরস্বতী। যাজকের কামনার ইন্ধন জোগাতে মন চায়নি। প্রেমের আগুনেই পুড়ে মরেছে। মঠেরই সন্ন্যাসীকে নিয়ে চম্পট দেওয়ার চেষ্টায় শাস্তি হয়েছে ভয়াবহ। কুটিল পাদরি একটা দৃষ্টান্ত খাড়া করতে চেয়েছিলেন। ভবিষ্যতে কেউ যেন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাওয়ার দুঃসাহস না দেখায়।
বিরাট এই ঘরেই রেভারেন্ড অ্যান্টনি গোমেজের সঙ্গে বসেছিলেন এডগার লুসি। ছিলেন মায়া গোমেজরেভারেন্ডের সাতপাকে বাঁধা বউ। হিন্দুমতে বিয়ে। মায়া চন্দননগরের সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের মেয়ে। ভয়ানক রূপসী। রং যেন ফেটে পড়ছে। চোখে যেন বিদ্যুৎ জ্বলছে–রেগে গেলে মনে হয় মা দুর্গা মহিষমর্দিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণা হতে চলেছেন।
মায়া বিদূষী মেয়ে সুবর্ণবণিক মেয়েদের মতো লবঙ্গলতিকা নয়। পড়াশুনা শেষ করেছিল কনভেন্টে। তারপর রেভারেন্ডের টানটান বপু, মিষ্টি-মিষ্টি হাসি আর চোখাচোখা বুলি শুনে তাকেই বিয়ে করে ফেলে। সাতগেঁইয়া নিষেধের তোয়াক্কা রাখেনি।
লুসির সঙ্গে খোশগল্প চালিয়ে যাচ্ছে এই মায়া। ঘরে জ্বলছে তেলের প্রদীপ আর মোমবাতি। ১৯২৯ সালেও এই হানাবাড়িতে বিদ্যুতের লাইন আনাননি রেভারেন্ড। মায়া-ই আনতে দেয়নি। বাড়িটার সাবেকিয়ানা তাহলে যে গোল্লায় যাবে। এ বাড়িতে থাকার মাধুর্যই যে নিষ্প্রদীপের রোমাঞ্চ!
বোগাস! বলেছিলেন লুসি। এইরকম একটা বুড়ো বাড়ি আর বাগানকে যদি আলো অন্ধকারের ছায়ামায়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়, তাহলে গা ছমছম করবে আপনা হতেই বিদেহিনীকে কষ্ট করে প্রেতলোক থেকে জার্নি করতে হবে না।
কথাটা সবে বলেছেন লুসি সাহেব বলেই হো-হো করে অবশ্য হেসেছিলেন–এমন সময়ে ঘটল সেই কাণ্ড।
পেল্লায় একটা শামাদান হেলেদুলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে দরজা দিয়ে ঢুকল ঘরে।
দেখেই আতীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠেছিল বেনের মেয়ে মায়া, এ কী ম্যাডাম! আমার বাবার দেওয়া বিয়ের জিনিস! এই নিয়ে এ কী ইয়ার্কি!
শামাদানটা বিলকুল বেলজিয়ান কাঁচ দিয়ে তৈরি। লম্বা স্ট্যান্ডের ওপর পাঁচখানা মোমবাতি বসানো যায়। চিলেকোঠার ঘরে ঠাকুরঘর বানিয়ে মায়া এই দীপাধার রেখে দিয়েছিল সেখানে। বিলিতি পন্থায় পঞ্চপ্রদীপের আরতি করবার জন্যে।
আশ্চর্য সুন্দর গুরুভার সেই বাতিদানই বাতাসে ভেসে এসে ঢুকল হলঘরে।
দমাস করে আছড়ে পড়ল লুসির পায়ের কাছে।
বলা বাহুল্য, ওইরকম একটা আছাড় খাওয়ার পর কাঁচের শামাদান আর আস্ত থাকতে পারে না। খানখান হবেই। প্রায় ডুকরে কেঁদে উঠেছিল মায়া মল্লিক, থুড়ি, গোমেজ।
তড়াক করে সটান দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন ভূত-শিকারি ইংরেজ মহাশয়। এসব ভেলকি তিনি অনেক দেখেছেন। কিছু ভূত অবশ্য বিশেষ এই ক্ষমতার অধিকারী হয় বটে, কিন্তু চন্দননগরের মতো নেটিভ জায়গায় এহেন ভৌতিক ক্রীড়া আশা করা যায় না।
অতএব তিনি স্বজাতীয় ভাষায় তীব্র কণ্ঠে জানতে চাইলেন–এইসব গাড়োয়ানি ফচকেমির মানেটা কি?
বলেই, তার খেয়াল হয়েছিল তিনি বসে আছেন ফরাসি মঠে। এখানকার জড়পদার্থের অণু পরমাণুতেও ফরাসিয়ানা বিধৃত রয়েছে।
সুতরাং গমক মারা যাক ফরাসি ভাষায়। তাই করেছিলেন।
পরিণামটা হল আরও ভয়ানক।
রাশি-রাশি নুড়ি উড়ে এল দরজা দিয়ে কড়াংকড়াং দুমদাম ঠকঠকাস করে আছড়ে পড়ল লুসি সাহেবের পায়ের কাছে। কখনও একটা, কখনও একাধিক শূন্যপথে ধেয়ে এসেই পড়ছে। সাহেবের সামনে।
চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল সাহেবের। এ নুড়ি তিনি চেনেন। বাগানের পথে রয়েছে বিস্তর।
আচম্বিতে বন্ধ হয়ে গেল নুড়ির স্রোত। লুসি সাহেব তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ পাকিয়ে চেয়ে আছেন দরজার দিকে। লম্বায় তিনি প্রায় সাড়ে ছফুট। বাঁশের মতো শক্ত সিধে শিরদাঁড়া। লম্বা নাকের নিচে গোঁফজোড়া ঝোঁপের মতো এলোমেলো করে রাখেন ইচ্ছে করে বুজরুকরা দেখলেই যাতে ভয় পায়।
সেই গোঁফ এখন খাড়া হওয়ার উপক্রম হল বিদেহীদের পরবর্তী বিটলেমি দেখে।
বাগানের কুয়োর ধারে পাড়ে পড়ে থাকে বিস্তর ভাঙা ইট আর পাথর। বেশ কয়েকটা আধলা নিশ্চয় সাড়া দিয়েছে কায়াহীনদের আহ্বানে। শ্যাওলামাখা নোংরা আধলাগুলো সগৌরবে দরজা দিয়ে ধেয়ে এসে দমাদম করে আছড়ে পড়ল সাহেবের পদতলে।
