ব্রিটিশ ভারতে ফরাসি উপনিবেশে কায়াহীনরা গাট হয়ে বসে রয়েছে শুনেই তিনি জাহাজের খরচ পকেট থেকে বের করেছিলেন।
এসে দেখেছিলেন হানাবাড়ির দুর্নাম ঘোচানোর জন্যে এক পাদরি সেখানে বসবাস শুরু করেছেন। নাম তার রেভারেন্ড অ্যান্টনি গোমেজ। স্বামী-স্ত্রী থাকেন। বাচ্চাকাচ্চা নেই। ভয়ডরও কম।
ভূত আছে কি? ঘোড়া ভূত?
ভূত-শিকারির প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন পাদরি সাহেব–বিলক্ষণ আছে। একটু-আধটু উপদ্রব করে বটে। কিন্তু অনিষ্ট তো করে না। একসঙ্গে আছি বেশ।
উপদ্রবগুলো কীরকম?
পাদরি সাহেব তখন সব লিখে দিয়েছিলেন। সেই লেখা বগলে নিয়ে ভূত-শিকারি ফিরেছিলেন। লন্ডনে। প্রতিবেদন বেরিয়ে গেছিল ডেলি মিরর পত্রিকায়।
অদ্ভুত কাণ্ডকারখানাগুলো কী ধরনের?
তালা ঝুলছে ঘরের বাইরে থেকে। অথচ আলো জ্বলে ওঠে ঘরের মধ্যে। সেই আলো নড়েচড়ে বেড়ায়। লণ্ঠন নিয়ে কেউ বা কারা যেন ঘরে পায়চারি করছে।
পায়চারি করছে? পায়ের আওয়াজ শোনা যায় না?
নিশ্চয় যায়। পা ঘষটানির আওয়াজ। পা যেন চলতে চাইছে না। ক্লান্ত চরণ। তবুও হাঁটতে হচ্ছে পায়ের মালিক বা মালকিনকে। দুলছে লণ্ঠনের আলো।
ঘোড়ার গাড়ি? সত্যি দেখা গেছে?
স্বচক্ষে দেখেছে বাড়ির ঝি। লনের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে গেছে অশ্বশকট। তারার আলোয় স্পষ্ট বোঝা গেছে গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুটি ঘোড়া। সওয়ার দুজন পাশাপাশি বসে। দুজনেরই গায়ে সাদা পোশাক। বাগান পেরিয়ে ফটক পর্যন্ত গিয়েই আচমকা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ছায়াবাজি।
ছায়াবাজি? চোখের ধাঁধা নয়তো? অথবা ধোঁকাবাজি? ম্যাজিক লণ্ঠনের কারসাজি?
তাহলে ফিসফিস করে কারা অত কথা বলে ঘরে-ঘরে? তালাবন্ধ ঘরে কে তাদের ঢুকতে দিয়েছে? শোনা যায় পুরুষকণ্ঠে বিড়বিড় বকুনিনারীকণ্ঠের চাপা কান্না।
নারীকণ্ঠ? দেখা দেয়নি সেই রমণী?
অবশ্য দিয়েছে। বহুবার দিয়েছে।
গোটা তল্লাট জুড়ে তখন খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছিলেন ভূত-শিকারি। এ ব্যাপারে ভদ্রলোক শার্লক হোমসের কায়দায় ডিটেকটিভগিরি করেন। জোচ্চুরি ফঁস করতে গেলে গোয়েন্দাগিরির মুন্সিয়ানা তো দরকার। জনে-জনে জিগ্যেস করে একটা ব্যাপারে তার বেজায় খটকা লেগেছিল।
যে বাড়িতে এখন ভূতের খেলা চলছে, সন্ন্যাসীদের মঠ আদৌ সেখানে ছিল কিনা–এই একটি ব্যাপারে তো কেউ দিব্যি গেলে কথা দিতে পারছে না। তিনশো বছর আগের ব্যাপার। কেউ বলে, মঠের পুরুত থাকতেন এই হানাবাড়িতে। কেউ বলেন সন্ন্যাসীদের থাকার জায়গাও ছিল এই বাড়ি।
সন্ন্যাসিনীদের আস্তানা? থাকার কথা তো এই মঠের এলাকাতেই। কিন্তু সেরকম কোনও ডেরা দেখতে পেলেন না এডগার লুসি। তবে কি সবটাই কপোলকল্পনা? গ্রাম্য উপকথা?
সন্ন্যাসিনী-প্রেতিনীর সম্ভাবনা তাই উড়িয়ে দিলেন ভূত-শিকারি। গোয়েন্দারা তাই করেন। যার প্রমাণ নেই–তা খারিজ করেন।
কিন্তু তামাটে ঘোড়ায় টানা সেই গাড়িটাকে তো দেখা গেছে বারবার। পনেরো শতকের আগে ঘোড়ায় টানা গাড়ির আবির্ভাব ঘটেনি খাস লন্ডন শহরেও। কিন্তু ষোড়শ শতকে সেই গাড়ি যদি চন্দননগরের ফরাসি মঠে দেখা যায়, তাহলে তো গ্রামের মানুষদের মনে দাগ কেটে যাবেই। বানিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। না দেখলে বলতে যাবে কেন?
তবে হ্যাঁ, সন্ন্যাসিনীরা যত বেয়াদপিই করুক, জ্যান্ত গোর দেওয়ার নজির তো গোটা ইউরোপে কখনও দেখা যায়নি। ইউরোপীয়রা এত বর্বর নয়। এরকম বর্বর ছিল নাকি মোগল পাঠান সুলতান নবাব-বাদশারা। কোমলপ্রাণ পাদরি সাহেব মঠের মেয়েকে মঠের দেওয়ালেই দাঁড় করিয়ে ইট গেঁথে কবর দেবেন–এমন পৈশাচিকতা কল্পনাও করা যায় না।
ভৌতিক কাহিনির এই অংশটুকুও স্রেফ মনগড়া–এই সিদ্ধান্তেই এলেন ভূত-শিকারি সাহেব প্রাথমিক তদন্তের পর।
বেশ, বেশ, গোর দেওয়ার ব্যাপারটা না হয় শোনা কথা। চোখে তো কেউ দেখেনি। রং চড়ানো রটনা হলেও হতে পারে।
কিন্তু বিদেশিনী প্রেতিনীকে তো দেখা গেছে। বহুবার বহু জায়গায়। কখনও লনে, কখনও বাগান, কখনও ঝোঁপের বর্ডার দেওয়া পথে। শুধু রাতে নয়–দিনের আলোতেও।
দিনের আলোয়? সুক্ষ্মশরীরীর পক্ষে তো কায়াগ্রহণ সম্ভব নয়। একটোপ্লাজম জোগাড় করবে কী করে? আলোকতরঙ্গের ধাক্কায় তো শরীরী হওয়া যায় না।
নিছক গল্পকথা নিশ্চয়। তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিলেন ভূত-শিকারি ইংরেজ।
আর তারপরেই শুরু হল তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। প্রেতলোক যেন এই কদিন তর্কে তক্কে ছিল–তার হাস্যকর অনুসন্ধান-পর্বের ইতি হওয়ার প্রতীক্ষায় ছিল। অবিশ্বাসের হাসি হেসে সব বুজরুকি–এই রিপোর্ট যেদিন লিখলেন, তার পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে গেল হানাবাড়ির হট্টগোল।
এবার আরও বেশিমাত্রায়। যেন তাকে তুমুল অভ্যর্থনা জানাতে কোমর বেঁধে লেগেছে সাহেব ভূতপেতনীরা। হাজার হোক, একই মহাদেশের মানুষ তো। এত দূর থেকে, এত পয়সা খরচ করে এসে খালি হাতে ফিরে যাবেন?
গেঁইয়াদের গল্প–এইরকম একটা শিরোনামও লিখেছিলেন লুসিসাহেব তার ডাইরিতে। লিখেছেন রাত্রে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে। সকালে উঠে নাস্তা সেরে ফের কলম বুলোতে গেছিলেন ডাইরিতে।
চক্ষুস্থির হয়েছে তখনি।
গেঁইয়াদের গল্প–এই হেডলাইনটাই নেই। ডাইরির যেখানে লিখেছিলেন সেখানটা বিলকুল সাদা। কস্মিনকালেও যেন সেখানে কলমের আঁচড় পড়েনি। ম্যাজিক কালি দিয়ে লিখতেও তো নিব চেপে বসার দাগ থাকবে। তাও নেই। ম্যাজিক কালির প্রশ্ন অবশ্য ওঠে না। একই দোয়াতের কালি দিয়ে বাকি অংশটা লিখেছেন–তা যেমন তেমনই রয়েছে।
