মঠে ছিল সন্ন্যাসিনীদেরও আস্তানা। ফ্রান্সের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় মব্লা, যেখানে ইতালির সঙ্গে সীমান্ত রচনা করেছে, দুর্গম সেই পাহাড়ি অঞ্চলের একটি মেয়ে ছিল মঠে। গঙ্গার রূপ দেখত সে সকাল-সন্ধে, ১৫,৭৮১ ফুট উঁচু মব্লাঁ-র রূপও ভাসত চোখের সামনে। বিশাল পাহাড় আর বিরাট নদী নিশ্চয় আকুল করেছিল তার অন্তর। বড় বেশি নিঃসঙ্গ মনে হয়েছিল নিজেকে।
প্রকৃতির হাতছানি যখন প্রবল হয়ে ওঠে মনের মণিকোঠায়, তখন কিন্তু শিথিল হয়ে পড়ে নিয়মের নিগড়।
রূপসী, তরুণী, একাকিনী এই সন্ন্যাসিনীর অন্তরে প্রেমের তুফান রচিত হয়েছিল তখন থেকেই। মনের দিক দিয়ে একাকিনী। তাই অন্বেষণ করেছিল মনের মতো দোসর।
পেয়েও ছিল।
মঠেরই এক সন্ন্যাসীকে।
প্রথমে মিটেছিল চোখের তৃষ্ণা। দূর থেকে দুজনে দুজনকে দেখে মিটিয়েছিল হৃদয়ের আশ। মন কিন্তু ইন্ধন জুগিয়ে গেছিল শরীরকে। তিল তিল করে কামনা সঞ্চিত হয়েছিল প্রতিটি রক্তবিন্দুতে। লোমকূপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমেছিল বারুদ শরীরী-তৃষ্ণার বিস্ফোরক। দেহমিলনেই যার পরিসমাপ্তি– আর কিছুতে নয়।
তাই একদিন দেখা গেছিল অভাবনীয় সেই দৃশ্য। তামাটে রঙের দুটি ঘোড়া পবনবেগে টেনে নিয়ে চলেছে একটা শকটকে। মাথায় ছাদ নেই। লাগাম ধরে বসে আছে তরুণ সন্ন্যাসী। হাওয়ায় উড়ছে তার লম্বা সোনালি চুল। পাশে বসে মুক্তির আনন্দে ঝকমকে চোখে শেষবারের মতো মঠ দেখবে সন্ন্যাসিনী। ফ্রান্সে তাদের একজনের জন্ম ইতালির সীমান্তে, আরেকজনের স্পেনের সীমান্তে। পাহাড় আছে দু-জায়গাতেই। গঙ্গা খুঁচিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের আহ্বানকে।
আচমকা মুখ শুকিয়ে গেল মেয়েটির। অশ্ব নীরবে চলতে শেখেনি–বিশেষ করে ছোটবার সময়ে। যুগল অশ্বের খুরধ্বনিতে মুখর হয়েছিল নির্জন বন। সেই সঙ্গে চাকার ঘড়ঘড় আওয়াজ। মঠের মানুষরা তো সচকিত হবেই।
তাই তারা বেরিয়ে এসেছে দলে-দলে। তাদেরও বাহনের অভাব নেই। ধেয়ে আসছে দুই পলাতককে পাকড়াও করবে বলে।
ধরা পড়েছিল তিনশো বছর আগের সেই রোমিও আর জুলিয়েট। প্রেমের পূতশিখায় জীবন উজ্জ্বলতর করে নেবে ভেবেছিল তারা। কিন্তু তা হল না। বিচার হয়ে গেল দুজনের। শাস্তি একটাই। মৃত্যু।
লনের একটা গাছ থেকে দড়ি ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হল তরুণ সন্ন্যাসীকে।
নির্মমতম মৃত্যুর স্বাদ দেওয়া হল তরুণীকে।
জীবন্ত কবর দেওয়া হল মঠেরই দেওয়ালে–দাঁড়ানো অবস্থায়।
সেই মঠ এখন পরিত্যক্ত। ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাদেরকে যমালয়ে পাঠানো হয়েছে সূক্ষ্ম শরীরে আজও তারা টহল দিচ্ছে মঠের সর্বত্র। আজও দেখতে পাওয়া যায়, গাছতলা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিষণ্ণবদনা এক নারীমূর্তি। হাওয়ায় উড়ছে তার শ্বেতবসন, উড়ছে স্বর্ণকেশ। মুখ তার ফ্যাকাসে, চক্ষু নিবদ্ধ পথের দিকে।
দেখা যায় ঘোড়া দুটিকেও। গায়ের রং তাদের ঘোর তামাটে। বায়ুবেগে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে সেকেলে শকট। মঠের বাগানেই তার আবির্ভাব ঘটে, মিলিয়ে যায় সেখানেই।
ষোলো শতক থেকেই নাকি চলছে এই কাণ্ড। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সবকটা ফরাসি উপনিবেশ ইংরেজদের অধিকারে চলে যায়। ফিরে পায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা চুক্তির শর্ত অনুসারে।
অশরীরীরা কিন্তু থেকে যায় এই সময়েও। পার্থিব সম্পত্তির হাত বদলে তারা নির্বিকার। অপার্থিব আকৃতি নিয়ে মঠকে দখলে রেখে দিয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
প্রেতলোকের বাসিন্দাদের সঙ্গে সহাবস্থান সম্ভব হয়নি মঠের মানুষদের। যদিও বিদেহীরা কক্ষনও কারও ক্ষতি করেনি–শুধু বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার। দেখা গেছে, দু-হাত বাড়িয়ে সাদা পোশাক পরা দুটি মূর্তি পায়ে-পায়ে এগোচ্ছে পরস্পরকে বুকে টেনে নেবে বলে– কিন্তু মিলিয়ে যাচ্ছে মুখোমুখি হয়েই।
দিনের-পর-দিন, রাতের-পর-রাত এ দৃশ্য কি দেখা যায়? চম্পট দিয়েছে মঠের সবাই।
বনাকীর্ণ হানাবাড়ি নিয়ে কেউ আর তেমন মাথা ঘামায়নি। বাঙলার মানুষ বাঘ আর ভূতের সঙ্গে ঘর করে অভ্যস্ত। সাপ আর মশা তাদের গা-সওয়া।
সাড়া পড়ে গেল কিন্তু ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে। তখনও চন্দননগর ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে আসেনি–এসেছিল ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে। ভারতের মাটিতে ফরাসি উপনিবেশ দেখতে ছুটে আসত সাহেব-মেমরা। পণ্ডিচেরি আর কারিক, মাহে আর ইয়ানাম তাদের বুকে যত না স্পন্দন জাগিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তাল করেছে হুগলি জেলার এই চন্দননগর।
কারণ এখানে রয়েছে একটা ভূতের বাড়ি। সত্যি ভূতের বাড়ি। ফরাসি বর্বরতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে বিদেহীরা। কখনও মানুষের চেহারায়, কখনও ঘোড়ার চেহারায়।
পর্যটকরা চাঞ্চল্যকর সংবাদটা পৌঁছে দেয় লন্ডন শহরে। লুফে নেয় ডেলি মিরর দৈনিক পত্রিকা। হেডলাইন দিয়ে ছেপে দেয় চন্দননগরে হানাবাড়ির লোমহর্ষক সমাচার আর তিনশো বছর আগেকার ফরাসি বর্বরতার মুখরোচক কাহিনি।
খবরটা পড়েই লম্ফ দিয়ে ভারতে ছুটে আসেন বিখ্যাত ভূত-শিকারি এডগার লুসি। ভূতের বাড়ির খবর পেলেই ভদ্রলোক ছুটে যেতেন। সত্যি ভূত হলে তাদের রিপোর্ট লিখে বই ছেপে ফেলতেন। মিথ্যে ভূত হলে তাদের জালিয়াতি ধরিয়ে দিতেন।
ভূত-শিকার ছিল তার নেশা। নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পেশা। ভূত ধরার কাহিনি কে না পড়তে চায়। বই বিক্রি হত দেদার। রোজগার হচ্ছিল ভালোই।
