সম্পাদক মশায়, সংক্ষেপে এই হল রাজা কঙ্কর অসামান্য প্রতারণা কাহিনির একটি মাত্র অধ্যায়। একাহিনির উপসংহার কবে টানব, তা জানি না। কারণ, রাজা এখনও রাজা। স্বাধীন। ইন্দিরা গান্ধীর সহস্র প্রচেষ্টাও তার রাজা খেতাব মুছতে পারবে না। কারণ রাজত্ব তার কস্মিন কালেও ছিল না, থাকবে না। কিন্তু রাজা সে থাকবেই। রাজা ঐশ্বর্যের মোহ দিয়ে অন্ধ করে লুণ্ঠনও করবে হবু রাজাদের। এই তার জীবনের ব্রত।
আমি তার ঠিকানা খুঁজছি। মোলাকাতের সখ হয়েছে। রাজার নতুন কীর্তিকলাপের সন্ধান পেলে জানাবেন? আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার অগণিত পাঠকসাধারণের একজনের ধারে কাছে যদি রাজার মতো কেউ আসে রাজকীয় ঠাটবাট নিয়ে, তবে তিনি যেন সাবধান হন। রূপে সে সত্যিই রাজা, বাকতাল্লায় পুঁদে সেলসম্যান। রোলসরয়েস কি মনোপ্লেন দিয়ে হয়তো চোখ ধাঁধিয়ে আগমন ঘটবে তার। ঝোঁপ বুঝে কোপটি মেরেই উধাও হবে অশরীরীর মতো।
উধাও হওয়ার আগেই যদি খবরটা পাঠান আমায়, সমাজের একটা উপকার করতে পারতাম।
নমস্কার জানবেন। ইতি–
প্রীত্যৰ্থী
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
*রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত (জানুয়ারি, ১৯৭১)।
প্রেতিনী কন্যার কাহিনি
আপনি ভূত মানেন?
মানি।
তবে কেন বলছেন, পেতনি খুন করেনি আপনার নাতনিকে?
অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন জগদীশ গুপ্ত। ভদ্রলোক প্রায়-বৃদ্ধ। অথচ বেশ শক্ত সমর্থ। দাড়িগোঁফ ভালোই কামিয়েছেন। কিন্তু চুল আঁচড়াননি। একমাথা সাদা চুল পাখির বাসার মতো ছড়িয়ে রয়েছে মাথা ঘিরে। ফরসা তিনি কোনওকালেই নন। তার ওপর রোদে পুড়েছেন সারাটা জীবন। খদ্দরের ধুতি আর পাঞ্জাবিও লাট খাওয়া। পাঞ্জাবির বোম থেকে কালো কার বেরিয়ে ঢুকে রয়েছে চোরা-পকেটে। নেহাতই সেকেলে মানুষ। এখনও পকেটঘড়ির অভ্যেস ছাড়তে পারেননি।
ইন্দ্রনাথ রুদ্রর বসবার ঘরে বসে অনেক অদ্ভুত কাহিনি শুনেছি। অনেক রোমাঞ্চর স্বাদ পেয়েছি। কিন্তু যে কাহিনিটা আজ বলতে বসেছি তা লিখতে গিয়েও আমার গা শিরশির করছে।
চোখ কুঁচকে জগদীশবাবুর দিকে চেয়ে আছে ইন্দ্রনাথ। আমি বসেছি ওর পাশে। সকালে এইখানেই আমার আড়া। সেই আড্ডায় ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছেন জগদীশ গুপ্ত।
এসেই জানিয়েছেন, তাঁর একমাত্র নাতনিকে পাথর দিয়ে পিটিয়ে মেরেছে একটা পেতনি। তিনি বিপত্নীক। তেল-সাবান কারখানার মালিক। স্বদেশি জিনিস প্রচার করার আদর্শ সামনে রেখে ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন। এখন তার ভেষজ সাবান ভারতের পয়লা সারির সাবান। পয়সা কামিয়েছেন অনেক। দানধ্যানও করেছেন প্রচুর। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন কারখানারই ম্যানেজারের সঙ্গে। প্লেন অ্যাকসিডেন্টে একই সঙ্গে মারা গেছে তার স্ত্রী, মেয়ে আর জামাই। নাতনি ছাড়া দুনিয়ায় কেউ ছিল না। মাত্র ষোলো বছর বয়স তার। বড় দুরন্ত। মা ছাড়া কি বাচ্চা মানুষ করা যায়? নাতনিকে নিয়েও তিনি হিমশিম খেয়েছেন। মেয়ে বলে কথা। মা বেঁচে থাকলে তাকে চোখে-চোখে রাখতে পারত। জগদীশবাবু তা পারেননি। ভূতের বাড়িতে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়েই সেই নাতনিই প্রাণ দিয়েছে। একটা ফরাসি পেতনি পাথর দিয়ে পিটিয়ে তার খুলি ভেঙে দিয়েছে।
ভূতের বাড়িটা চন্দননগরে। তিনশো বছর ধরে হানাবাড়ি হিসেবে কুখ্যাত হয়ে রয়েছে।
তিনশো বছরের হানাবাড়ি? কৌতূহলী হয়েছিল ইন্দ্রনাথ।
জগদীশবাবু তখন শুনিয়েছিলেন গা-ছমছমে সেই কাহিনি। অবিশ্বাস্য অথচ সত্য।
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এসেছিল ফরাসিরা। চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে গড়ে ওঠে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কুঠি বসায় চন্দননগরে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে। তার কবছর পরেই গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠে সন্ন্যাসীদের একটা মঠ। পুরুতমশায়ের দোতলা বাড়িও ছিল এই মঠের এলাকায়।
এই বাড়িই এখন ভূতের বাড়ি দুর্নাম কিনেছে দেশ-বিদেশে। এসেছেন অনেক ভূত-শিকারি। তারাও হতভম্ব হয়েছেন।
বাড়িটা কদাকার। লাল ইট দিয়ে তৈরি। জানলাগুলো লম্বাটে আর সরু। আলো ঢুকতেও যেন ভয় পায়। সবসময়ে যেন ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে সামনের নোংরা লনের দিকে। এ লনে গাছের চাইতে বেশি আছে আগাছা। বড়-বড় ঘাস। কাটাঝোঁপ।
তিনশো বছর বয়েসেও বাড়িটায় চিড় খায়নি–একখানা ইটও খসে পড়েনি। তবে ছাতলা লেগেছে সারা গায়ে। কখনও সবুজ, কখনও কালচে। পেটাই ছাদ নেই। আছে ঢালু টালির চাল। এককালে লাল ছিল এই টালি–এখন তা বহুবর্ণ।
লনের তিনদিকে বড়-বড় ঝুপসি গাছ। বটগাছই বেশি। মোটা ডাল লতিয়ে থাকে মাটির ওপর। বটের ঝুরি বাড়তে বাড়তে পুরো জায়গাটাকে দুর্গম করে তুলেছে।
গঙ্গার দিকেও রয়েছে বড়-বড় গাছ। এই গাছের সারির জন্যেই গঙ্গার বুক থেকে দেখা যায় না হানাবাড়িকে। চোখে পড়ে শুধু একটা জঘন্য জঙ্গল। রাতে সেখানে জোনাকি জ্বলে। পুরো জায়গাটাকে আরও ভয়াবহ মনে হয়।
তল্লাটের সব্বাই জানে, এ বাড়িতে ভূত আছে। তাদের আবির্ভাব বিশেষ একটা লোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই। তিনশো বছর ধরে ঘটনাটা মুখে-মুখে টিকে রয়েছে। বীভৎস কাহিনি। সে ঘটনা না ঘটলে এ বাড়ি নাকি প্রেতপুরী হত না।
এ জন্যে দায়ী তিনশো বছর আগের ধর্মান্ধ কিছু মানুষ। জাতে তারা ফরাসি। ধর্মে খ্রিস্টান। ভারতের মাটিতে উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্যে তাদের অনেকেই ছিল আদিম বর্বর। তাদের এই পৈশাচিকতাই নাকি নিঃশব্দ প্রতিবাদ তুলেছে প্রেতলোকে। আজও তাই রক্ত-জল করা ঘটনার পর ঘটনা চলেছে এই নির্জন নিকুঞ্জে।
