হাজার টাকার নোট!
চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হল নির্বাণকুমারের। দুটো নোটই তখনও ভিজে। টেবিলের ওপর পাশাপাশি নোট দুটো বিছিয়ে ধরল রাজা। দেখল, নির্বাণকুমারের ছানাবড়া চোখে তখনও যেন কিছুটা অবিশ্বাস। তাই বলল সহজ সুরে, এক কাজ করুন। দুটো আলাদা ব্যাঙ্কে গিয়ে ভাঙিয়ে আনুন নোট দুখানা। এক ব্যাঙ্কে একই নম্বরের দু-খানা নোট নিয়ে যাবেন না। কী দরকার খামোকা ওদের কৌতূহল বাড়িয়ে। মাঝখান থেকে আমার গোপন যন্ত্র আর গোপন থাকবে না।
দুরুদুরু বুকে নির্বাণকুমার ছুটল দু-হাতে দু-খানা নোট নিয়ে। ফিরে এল নাচতে নাচতে। দু-হাজার টাকার ভাঙানি দু-হাতে।
রাজা কঙ্ক কিন্তু নির্বিকার। নোটের ভাঙানি তো মিলবেই। দুটো নোটই যে আসল। আগে থেকেই আর একটা হাজার টাকার নোট অদ্ভুত যন্ত্রর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল রাজা। তবে নয়া নোটের নাম্বারে অবশ্য সামান্য কারসাজি করতে হয়েছিল আগেভাগে। বেশি কিছু নয়। ইংরেজি 3 আর ৪ কে সযত্নে কলম বুলোতে হয়েছিল। ফলে হুবহু মিলে গিয়েছিল দুটো নাম্বার।
কিন্তু নির্বাণকুমারের উল্লাস দেখবার মতো। ভুড়ি নাচিয়ে ঘরময় সে কী রক-এন-রোল ড্যান্স! অতি কষ্টে হাসি চেপে চুরুট নিয়ে বসে রইল রাজা কঙ্ক।
কিছুক্ষণ পরে বেদম হাঁপিয়ে কাছে এল নির্বাণকুমার। বলল, রাজাসাহেব, দুনিয়ায় এ মেশিন একটাই আছে, তাই না?
হ্যাঁ। বলে নির্বাণকুমারের মুখে ভাবের খেলা দেখল রাজা। উল্লাস তিরোহিত হচ্ছে–আসছে উদ্বেগ। দেখে মিষ্টি গলায় বলল, অবশ্য সাধুর ঠিকানা আমিই কেবল জানি। দুর্গম পথ। হিমালয় অঞ্চল তো।
শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলোয় নির্বাণকুমার। অধীর আগ্রহে শুধোয়, দেখা হলে আপনার কথা শুনবেন তো?
কী কথা?
মানে…ইয়ে..আর একটা যন্ত্র যদি চান?
চুপ করে রইল রাজা কঙ্ক। সঙ্গে-সঙ্গে কোনও জবাব দিল না। মিনিট কয়েক চুরুট টানার পর সাসপেন্স যখন তুঙ্গে পৌঁছল, তখন ছোট্ট করে বলল, কেন?
আপনার এই মেশিনটা তা হলে আমি কিনে নিতাম।
আবার সাসপেন্স। এমনভাবে চেয়ে রইল রাজা কঙ্ক, যেন সামনে একটা ডাহা উন্মাদ দাঁড়িয়ে। সে কী অভিনয়। দানীবাবুও ছার তার সেই প্রতিভার কাছে।
কিনবেন? অপরিসীম তাচ্ছিল্য দেখাল রাজা। মেশিন কিনবেন? কত টাকা আছে আপনার?
তোতলা হয়ে গেল নিবার্ণকুমার, সঙ্গে তো বেশি আনিনি। তিরিশ হাজার এখুনি দিচ্ছি। ওয়াইফের জড়োয়া সেট দিচ্ছি–দাম লাখতিনেক তো হবেই। তারপরও লাখ টাকা নগদ দেব বোম্বাই গিয়ে। কথা দিচ্ছি। জানি এ মেশিনের দাম টাকা দিয়ে হয় না। কিন্তু বন্ধুর একটি কথা রাখুন… তুবড়ি ছোটাল নির্বাণকুমার। হিসেবি বুদ্ধি গোল্লায় গেল। জুয়োর নেশা চাপলে ঘাড়ে যেমন ভূত চাপে–নির্বাণকুমারেরও হল তাই। ঝাড়া আধ ঘণ্টা সে কী নাকে কঁদুনি মেশিনটার জন্যে। চুরুট মুখে দিয়ে বোবার মতো বসে রইল রাজা কঙ্ক। অনেকক্ষণ পরে পাঁজর গুঁড়োনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল বলল, জলের দাম দিচ্ছেন আপনি।
এরপর শুরু হল বিড়াল তপস্বীর সর্বশেষ চাল। বলল, বন্ধুর মান আমার কাছে সবার আগে। টাকার অভাব আমার নেই। সাধুবাবার সঙ্গে দেখা হলে আর-একটা ব্যবস্থা না হয় করা যাবে। বেশ, কী আছে আপনার এনে দিন। হিসেব করে দেখল রাজা, নোট ডবল হতে ছঘণ্টা লাগে। এর মধ্যেই পগারপার হওয়া যাবে গোয়া ছেড়ে।
সঙ্গে-সঙ্গে লাখ তিনেক টাকার জড়োয়া এল রাজার হাতে। সেই সঙ্গে তিরিশ হাজার নগদ। বিনিময়ে মেশিন সমর্পণ করল নির্বাণকুমারের হাতে। খুঁড়ো শিয়াল আশ্চর্য বাক্স নিয়ে তৎক্ষণাৎ ঊধ্বশ্বাসে দৌড়োল গৃহিণীর কাছে।
আর, ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে রোলসরয়েস নিয়ে চম্পট দিল প্রবঞ্চক-সম্রাট।
প্রবঞ্চনা ধড়া পড়ল কিন্তু ছঘণ্টারও অনেক ঘণ্টা, অনেকদিন পরে। ডবল নোটের সৃষ্টি চোখের সামনে দেখে নির্বাণকুমারের মনে বিশ্বাস বটগাছের শেকড়ের মতোই দৃঢ়মূল হয়ে গিয়েছিল। তাই, রাজা যে তাকে বোকা পাঁঠা বানিয়ে লম্বা দিয়েছে, এই সহজ সত্যটা কিছুতেই মাথায় আনতে পারছিল না বেচারি। ছঘণ্টা পরেও যখন ডবল নোট বেরুল না বাক্স থেকে, তখন ভাবল নিশ্চয় যন্ত্র চালানোয় কিছু ভুল হয়েছে। তাই ফের বসল খুটখাট করতে। এইভাবে নোটের পর নোট ঢুকল ভেতরে। গেল বেশ কয়েকটা সপ্তাহ।
অবশেষে একদিন ধৈর্যচ্যুতি ঘটল খাণ্ডার বউয়ের। তিন লাখ টাকার জড়োয়া গচ্ছা দিয়ে মন করকর করছিল বেচারির! তাই নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনের-পর-দিন বাক্স নিয়ে কস্তাকস্তির হেস্তনেস্ত করল ভদ্রমহিলা এক মিনিটেই।
বিশেষ কিছু না। বাক্সটি নিয়ে সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে। তারপর হাতুড়ি-পেটা করতেই ডালা উড়ে গেল। ভেতরে দেখা গেল তালগোল পাকানো কিছু আস্ত নোট্য নির্বাণকুমার ঠেলে ঠেলে ঢুকিয়েছে ডবল করার প্রচেষ্টায়। আর কয়েকটা রোলার আর একটা খালি টিন।
ব্যস, আশ্চর্য বাক্সর মধ্যে আর কিছুই নেই। আরক, জড়িবুটি, মন্ত্র-তন্ত্র কিছু না।
পলকহীন চোখে চেয়েছিল নির্বাণকুমার। অনেকক্ষণ পরে শুধু বলেছিল, বুঝেছি, আরক শুকিয়ে গেছে। তাই বিগড়েছে মেশিন। ঠিক আছে। রাজার সঙ্গে দেখা হলেই চেয়ে নেওয়া যাবে নতুন আরক। তারপর কামানো যাবে লাখ-লাখ টাকা। গিন্নি, আমি কুবের হব।
কিন্তু আক্কেল দাঁত যে কী জিনিস–জড়োয়া খুইয়ে গৃহিণী তখন তা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছিল। সুতরাং নির্বাণকুমারের কুবের হওয়ার সাধ নাকি খেংরে ঝেড়ে দিয়েছিল ভদ্রমহিলা।
