রাজা কিন্তু নির্বিকার। বাক্স আগলায় যকের ধনের মতো। দিন নেই, রাত নেই সর্বক্ষণ কদাকার চেহারার বাক্স রয়েছে সঙ্গে। যেন নয়নের মণি, যেন সাত রাজার ধন, যেন সাগরসেঁচা মাণিক। ব্যাপারস্যাপার দেখে নির্বাণকুমার তো হতবাক। দু-একবার কথা পাড়তে গিয়েও বেকুব হল। রাজা কঙ্ক বাক্স প্রসঙ্গের ধার দিয়েও গেল না।
অবশেষে সময় এল। কথা হচ্ছিল ব্যালকনিতে। টাকাকড়ি নিয়ে আলোচনা। কথায় কথায় নির্বাণকুমার ব্যক্ত করল তার মনোভাব। আহারে! কী সুখেই না রয়েছেন রাজা কঙ্ক! টাকার পাহাড়ে বসে কী নিরবচ্ছিন্ন শান্তি! ধমনীতে বইছে নীলরক্ত মানে ব্লু ব্লাড। খানদানি রক্ত। কোষাগারে কাঁড়ি কাঁড়ি ধনরত্ন। কাজেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা রোজগারের কোনও ভাবনাই নেই রাজা কঙ্কর।
সুযোগ বুঝে রাজা কঙ্ক শুরু করল আত্মকাহিনি। বলা বাহুল্য সবটাই গাঁজার দম। বলল, দেশবিভাগের আগের ঐশ্বর্য। সবই তো পড়ে পাকিস্তানে। জমিজমা-সোনাদানাস–ব। প্রথম-প্রথম কী কষ্টেই না দিন গেছে। বাইরে লণ্ঠন, ভেতরে ঠনঠন। ঠাট বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া!
তবে উদ্যোগী পুরুষের হাতেই দুনিয়া আসে। রাজা কঙ্কও বিস্তর মেহনত করে সংগ্রহ করেছে এমন একটা যন্ত্র, যা দিয়ে দুনিয়াটাকে কেনা যায়।
শুনে তো চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হল নির্বাণকুমারের। আশ্চর্য যন্ত্রর কাহিনি তাকে শুনতেই হবে। অনেক কঁদুনির পর নিমরাজি হয়ে রাজা কঙ্ক নিবেদন করল অদ্ভুত যন্ত্রর বিচিত্র উপাখ্যান।
বলল, এ মেশিন আমার হলেও আবিষ্কারটা আমার নয়। আধুনিক বিজ্ঞান তাকে মেশিনই বলবে। কিন্তু কলকজার বাহাদুরি বিজ্ঞানের নয়।
কীসের?
তন্ত্রের।
তন্ত্রের?
হ্যাঁ, তন্ত্রের। এক তান্ত্রিক-সাধকের সাক্ষাত পেয়েছিলাম কখলে। বস্তুবিজ্ঞান তন্ত্রসাধকের কাছে কতখানি অকিঞ্চিৎকর, তারই প্রমাণ দেওয়ার জন্যে তিনি যন্ত্রটা বানিয়েছিলেন আমারই সামনে। ভেতরে আছে অদ্ভুত-অদ্ভুত কতকগুলো আরক আর জড়িবুটি। আশ্চর্য এদের ক্ষমতা। যে-কোনও টাকার নোটকে ডবল করে দিতে পারে! এক টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার নোট পর্যন্ত। হুবহু কপি করে দেয়।
কী করে? হাঁ বন্ধ করে শুধোয় নির্বাণকুমার।
মন্ত্রের ক্ষমতায় তো বটেই। তা ছাড়া আরকের গুণও আছে। হাজার টাকার নোট এদিক দিয়ে ঢুকিয়ে দিন-ওদিক দিয়ে বেরিয়ে আসবে পরপর দুটো নোট হুবহু একরকম।
নির্বাণকুমার নির্বোধ নয়। তাই অবিশ্বাসের মেঘ ঘনায় কুতকুতে দুই চোখে। শুধোয় সন্দিগ্ধ কণ্ঠে, ঠাট্টা করছেন?
যেন বিষম আহত হল রাজা কঙ্ক। আরক্ত মুখে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। অবশেষে বলল অতি মৃদু কণ্ঠে, আমি ঠাট্টা করি না। আমি মিথ্যে বলি না। ও দোষ আমার রক্তে নেই।
কিছুক্ষণ বিরতি। তাইতেই কাজ হল। এমন সাংঘাতিক ধাক্কা খেল নির্বাণকুমার যে কথাই বলতে পারল না কিছুক্ষণ। রাজা কঙ্ক নিজেই কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললে, এ মেশিন পৃথিবীতে আর দুটি নেই। সাধকের সাক্ষাত পাওয়াও এখন মুশকিল। আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন। কিন্তু তাতে আমার কী?
ঢোক গিলে তাড়াতাড়ি বলে নির্বাণকুমার, না..না..অবিশ্বাসের কথা বলিনি। বলছিলাম কি, নোটজালের কারবারে ঝুঁকি তো অনেক
কথাটা শেষ করতে পারল না নির্বাণকুমার। বাকি শব্দগুলো স্রেফ গিলে ফেলল রাজা কঙ্কর চোখ দেখে।
সেকী চোখ! বাঘের চোখেও এত তেজ থাকে কি না সন্দেহ। সেই সঙ্গে নিঃসীম অপমানের ধিকধিক বহ্নি।
অনেকক্ষণ পরে সামলে নিল রাজা। বলল অবরুদ্ধ কণ্ঠে, আমি জালিয়াত নই। নোট জাল করা আমার পেশা নয়। মন্ত্রের কৃপায়, আরক আর জড়িবুটির মাহাত্ম্যে, তান্ত্রিক সাধকের দৌলতে আমি যা বানাই, তা জালনোট নয়–আসল নোট। নকল নয় কেননা, কোনও তফাত থাকে না আসলের সঙ্গে। তাই যে-কোনও ব্যাঙ্কে চলে আমার নোট। দেখবেন হাজার টাকার নোট কীভাবে ডবল করি?
নির্বাণকুমার তো তাই চায়। সঙ্গে-সঙ্গে গেল রাজা কঙ্কর ঘরে। বাক্সটা কাছেই ছিল। রোজউড টেবিলের ওপর রাখা হল কদাকার বস্তুটা। দু-দিকে দুটো ফুটো। ঝকমকে তামা পিতল-ইস্পাতের নাট, বল্ট, চাকা আর টেলিফোন ডায়ালের মতো ডায়াল। দেখতে কিম্ভুতকিমাকার সন্দেহ নেই। কিন্তু কারিগরির বাহাদুরিতে, বিশেষ করে তান্ত্রিক সাধুর কপোল কাহিনি শোনার পর, কিম্ভুত বাক্সটাই অদ্ভুত শক্তিশালী মনে হল নির্বাণকুমারের চোখে।
হাজার টাকার একটা নোট বার করল রাজা কঙ্ক। পরখ করতে দিল নির্বাণকুমারকে। তারপর রোল করে পাকিয়ে ঢুকিয়ে দিল একদিকের ফুটো দিয়ে। অন্যদিকের ফুটো দিয়ে ঢোকাল আর একটা কাগজের রোল। কাগজের সাইজ হাজার টাকার নোটের মতোই। একটুও ছোট নয়, বা বড় নয়। ডায়াল ঘোরাল খুব হিসেব করে। কতকগুলো চাকা নাড়াল খুব সন্তর্পণে। টিপল বোতাম, আলগা করল নাট, খটাস করে তুলে দিল একটা সুইচ।
বলল, এখন আরকে ডুবে রয়েছে সাদা কাগজ আর নোট। আরক আর জড়িবুটির কাজ শুরু হয়ে গেছে। রোল করা অবস্থাতেই নোটটার হুবহু কপি উঠে যাবে রোল করা সাদা কাগজে। সময় লাগবে ছঘণ্টা। ছঘণ্টা পরে দেখবেন আসল নোট আসলই রয়ে গেছে–কোথাও আঁচড় পড়েনি। পাশাপাশি থাকবে আরও একটা আসল নোট।
বাকতাল্লার তুফানে নির্বাণকুমারের মাথায় তখন চর্কিপাক লেগেছে। কাজেই ছটি ঘণ্টা যে কীভাবে উড়ে গেল, তা টের পেল না ভদ্রলোক। ছঘণ্টা পর অসীম উৎকণ্ঠা নিয়ে দুজনে এল রাজার ঘরে। অতি সন্তর্পণে আবার ডায়াল ঘোরাল রাজা, চাকা নাড়াল হিসেব করে, বোতাম টিপল পটাপট শব্দে, সবশেষে হাতলে চাপ দিতেই ফুটো দিয়ে পরপর বেরিয়ে এল দু-দুটো নোট।
