বাতায়নে বারান্দায় ভিড় জমে গেল আরোহীর দর্শনলাভের প্রত্যাশায়। জাঁকালো মূর্তি। চোখে মনোবল। খানদানি রূপ বটে।
কিন্তু আশ্চর্য মানুষ তো রাজা কঙ্ক! সেই যে নিজের ঘরে ঢুকল, আর দেখা নেই। ঝাড়া দুটো দিন যেন ধ্যানস্থ হয়ে রইল ভদ্রলোক নিজের স্যুটে।
বিদ্যুৎচমকের মতো একবারমাত্র দেখা দিয়েই অন্তর্ধান করাটা রাজার একটা মস্ত কায়দা। চোখ ঝলসে দিয়েই উধাও হওয়ায় কৌতূহল বৃদ্ধি পেতে থাকে উত্তরোত্তর। না জানি কত বড় যক্ষপতি! ধার ধারে না কারও।
পুরো দুটো দিন গেল এইভাবে। কৌতূহলে যেন ফেটে পড়তে লাগল আশপাশের সবাই। দুদিন পরে সৈকতে দেখা গেল রাজা কঙ্ককে। মাথার ওপর রঙিন ছাতা। হাতে ভোলা বই। ভিড় যেখানে, সেখান থেকে বেশ খানিকটা তফাতে বসে মৌনি বুদ্ধের মতো ধ্যানস্থ অলীক কাহিনির পৃষ্ঠায়।
কিছুক্ষণ পরেই সৈকতের বালি মাড়িয়ে হনহন করে প্রায় দৌড়ে এল জাপানি সোফার। হাতে একটা টেলিগ্রাম।
ধ্যান ভাঙল রাজার। উদাসীন দুই চোখে ঈষৎ বিরক্তি। সেইসঙ্গে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস, কী জ্বালা! দু-দণ্ড শান্তিও কি নেই?
টেলিগ্রামে চোখ বুলিয়েই ফিরিয়ে দিল রাজা। মাথা নেড়ে জানাল জবাব দেবার কোনও সদিচ্ছাই তার নেই।
এক ঘণ্টাও গেল না। আবার দ্রুতছন্দে আবির্ভাব ঘটল জাপানি সোফারের। হাতে আর একটা টেলিগ্রাম। না, এবারও জবাব দেবে না রাজা। কিছুক্ষণ যেতে-না-যেতেই এল আবার একটা টেলিগ্রাম। এবারও বিষম বিরক্তিতে মাথা নাড়ল রাজা। একই দৃশ্যের পুনরাভিনয় হয়ে চলল বারংবার।
সারাদিন গেল। পরের দিন গেল। তার পরের দিনও ঘটল তাই। পরপর তিন দিন একই দৃশ্য ঘটে চলল ঘণ্টায়-ঘণ্টায়। রাজা কঙ্ক উদাসীন। কিন্তু বিরাম নেই টেলিগ্রাম আসার। উদগ্র কৌতূহলে থমথম করতে লাগল সারা সমুদ্র-সৈকত।
সাহস করে কেউ যদি একখানা টেলিগ্রামেও চোখ বুলোত, থ হয়ে যেত সঙ্গে-সঙ্গে।
কেন না, প্রতিটি টেলিগ্রামই ফাঁকা–একটি শব্দও লেখা নেই তাতে।
এতবড় ধোঁকাবাজি অনুমান করার ক্ষমতাও এল না কারও মাথায়। তাই পুরো একটা সপ্তাহ গেল শুধু এই খেল দেখেই। রহস্য যখন তুঙ্গে পৌঁছল, আসর যখন গমগমে হয়ে উঠল, রাজার নামে টেলিগ্রাম আসা নিয়ে যখন সমুদ্র-সৈকতের ফিসফিসানি সমুদ্র গর্জনের সঙ্গে একাকার হয়ে গেল, তখন খানদানি খোলস খুলে ঈষৎ আত্মপ্রকাশ করল রাজা। তাও সোফারের মুখ দিয়ে।
টেলিগ্রাম কীসের? আরে ছোঃ! দেশ বিদেশের বহু কারবারি চাইছে তার উপদেশ, চাইছে তার সাহায্য, সহযোগিতা। বড়-বড় কারবারে রাজা কঙ্কর টাকা চাই। রাজা কঙ্ক থাকলেই চলবে সেসব কারবার, নইলে নয়। কিন্তু নাম-মাহাত্ম্যর বিড়ম্বনায় রাজা বিলক্ষণ বিড়ম্বিত। কারণ, রাজা কঙ্কর আর টাকার দরকার নেই। এত টাকা জমেছে তার ভঁড়ারে যে নতুন অর্থের কোনও লালসাই আর নেই। তাই রাজা উদাসীন। তাই টেলিগ্রামের পর টেলিগ্রাম আসছে, কিন্তু জবাব যাচ্ছে না কোনওটারই।
সাড়া পড়ে গেল কোলভা বিচে। সাক্ষাৎ কুবের নাকি? এত টাকাও মানুষের থাকে?
সফল হল রাজার প্রথম চাল। খানদানি মহলে কায়েমি হয়ে গেল রাজার মৌরসী পাট্টা। তবুও রাজার প্রাণে সুখ নেই। কেন না, উঁচু মহলকে নিয়ে তো তার দরকার নয়। দরকার এমন একজনকে যে উঁচু মহলের বাসিন্দা নয়, অথচ নজর সেই দিকেই। প্রাণে শখ অনেক, কিন্তু সাধ্য নেই। কারণ, তার অর্থ চাই–আরও অর্থ।
রাজা খুঁজছে এমনি এক শিকারকে। কোন হতভাগ্যের ওপর শ্যেন দৃষ্টি পড়বে রাজার, তা এখনও জানা যায়নি বটে, তবে জমি প্রস্তুত। এখন শুধু প্রতীক্ষা।
পুরো তিনটে দিনও গেল না সার্থক হল প্রতীক্ষা। কোলভা বিচে আবির্ভাব ঘটল এক আজব জীবের। ঝলমলে ইমপালা গাড়ি থেকে নামলেও সাগর স্নান সম্বন্ধে বিলক্ষণ শঙ্কিত লোকটা। তেল-চুকচুকে মুখ। কিন্তু টাই স্যুট পরে কী হনু একটা ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা সর্বক্ষণ। কয়েকবার দেখেই জীবটিকে পছন্দ হয়ে গেল রাজা কঙ্কর।
কী হনু প্রাণীটির নাম নাকি নির্বাণকুমার। ফিল্মস্টারদের নামের অনুকরণে নামগ্রহণের মধ্যেও উঁচু মহলে ওঠার প্রয়াস। চডুকে হাসি সবসময়েই অট্টহাসির সামিল। বিচে যারা কেষ্টবিষ্টু, তাদের গায়ে গা ঘষবার চেষ্টা অষ্টপ্রহর। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। দেখেশুনে পুলকিত হল রাজা কঙ্কর চিত্ত। যাক, এতদিনে পাওয়া গেছে আসল মালকে! এবার টোপ ফেলা, তারপর খেলিয়ে তোলা।
নির্বাণকুমারের চডুকে হাসি আর গায়ে পড়ে আলাপ করার ব্যর্থ চেষ্টায় সবারই ভুরু যখন উত্থিত, এবং কোথাও কল্কে না পেয়ে নির্বাণকুমার নিজেও যখন দমিত, ঠিক তখনি সিগার-স্ট্যান্ডে যেচে কথা বলল রাজা কঙ্ক। আকাশের চাঁদ হাতে পেল নির্বাণকুমার। গোটা বিচের কাউকে যে মানুষটা পাত্তা দেয় না, সেই রাজা কঙ্ক স্বয়ং আলাপ করতে চাইছে তার সঙ্গে? কৃতার্থ হয়ে গেল নির্বাণকুমার।
সুতরাং আলাপ জমতে দেরি হল না। দু-দিন যেতে-না-যেতেই নিবিড় সখ্যতা গড়ে উঠল দুজনের মধ্যে। কাজের কথা এল তারপরে।
নির্বাণকুমার অবাক হয়েছিল রাজার হাতে একটি বাক্স দেখে। চৌকোণা বাক্স। তাতে কয়েকটা ছিদ্র, চাকা, বোতাম ইত্যাদি। কাঠের বাক্স। কিন্তু বাক্সের উদ্দেশ্য বোঝা ভার। রাজকীয় চালচলনের মধ্যেও কেন যে বাক্সটাকে অষ্টপ্রহর সঙ্গে রাখে রাজা, সেই হেঁয়ালির রহস্য উদ্ধার করতেই কালঘাম ছুটে গেল নির্বাণকুমারের।
