তিন মাস পরে একমনে বিয়ে বাড়ির খানা খেয়ে চলেছে কাঞ্চন। সামনে এসে দাঁড়ালেন বর-বউ।
আর কিছু চাই?
মুখ তুলল কাঞ্চন, হ্যাঁ স্যার, চাই।
কি বলো? ফ্রাই না বিরিয়ানি।
একটা প্রশ্নের জবাব।
বটে! চোখ ছোট হয়ে গেল ডক্টর অবনীশ বোসের।
কী প্রশ্ন?
প্রতিবিম্ব স্মৃতি কী ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ঘটায়?
শাট আপ!
গভীর চোখে তাকিয়ে জবাব দিলে নতুন বউ, ঘটায়।
* সুকন্যা পত্রিকায় প্রকাশিত। শারদীয়া সংখ্যা, ১৩৯৩।
প্রবঞ্চক সম্রাট
যে কোনও ব্যাঙ্কে চলে আমার নোট? দেখবেন হাজার টাকার নোট কীভাবে ডবল করি।
রোমাঞ্চর প্রিয় সম্পাদক মহাশয়,
আমার নাম ইন্দ্রনাথ রুদ্র। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আমার সঙ্গে আপনার পরিচয় আমার অসাহিত্যিক বন্ধু মৃগাঙ্কর সৌজন্যে। আমার ডাইরি থেকে দু-চারটে ছেঁড়া কাহিনি মাঝে-মাঝে ও উদ্ধার করে এবং তাই নিয়ে ফুলিয়ে ফঁপিয়ে গল্প নামক যে বস্তুগুলি রচনা করে, আমার মতে তা শুধু অপাঠ্যই নয়–আগাগোড়া ভুল। আমার কানে আসে সেসব গল্পে নাকি আমাকে ও অতিমানব সাজায়। ম্যাজিশিয়ান আর ডিটেকটিভ যে একই জীব, এইটা প্রমাণ করবার চেষ্টা করে। আমার আপত্তি সেইখানেই। আমি ম্যাজিশিয়ান নই। অলৌকিক শক্তিধরও নই। আমি সাধারণ মানুষ। পরাজয়ের গ্লানি আমার ললাটেও জোটে। কিন্তু মৃগাঙ্ক কি কোনওদিন আপনাদের শুনিয়েছে আমার পরাজয়ের কাহিনি? শুনিয়েছে কি দুরন্ত এক প্রবঞ্চক-সম্রাটের কাছে কীভাবে আমি বারংবার হার স্বীকার করেছি? শুনিয়েছে কি রাজা কঙ্কর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর দুর্জয় সাহসের আশ্চর্য উপাখ্যান?
জানি কী বলবেন। বলবেন, শুনিয়েছে বইকী। রাজা কঙ্কর প্রতারণা কাহিনি রোমাঞ্চতেই প্রকাশ পেয়েছে এই সেদিন। আরে মশাই, সে কাহিনিতে আমার পরাজয়ের বর্ণনা কতখানি ছিল, তা কি তলিয়ে দেখেছেন? দেখেননি। এটা ঠিক, রাজা কঙ্কর টিকি একবারই আমি স্পর্শ করতে পেরেছিলাম। হিমাচল থেকে সিন্ধু অঞ্চল পর্যন্ত সুপুরুষ যে মানুষটি যাদুকরেরই মতো লোক ঠকিয়েছে মাসের পর মাস যার নাম শুনলেই এখনও শিহরিত হয় পুলিশ মহল, ধুরন্ধর শিরোমণি সেই রাজা কঙ্ককে একবারই আমি বাগে আনতে পেরেছিলাম।
রাজা কঙ্কর সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র পাঁকাল মাছের। একাধিকবার গো-হারান হারিয়েছে সে আমায়, বলতে গেলে কাছে এসেও গালে ঠোনা মেরে চম্পট দিয়েছে। সে শঠ, সে প্রতারক, সে কপট; কিন্তু সে মহা ওস্তাদ, মহা ধড়িবাজ, মহা শক্তিমান। রূপে সে কার্তিক, বাকল্লায় সেলসম্যান। তার টাক উঁচুমহলের রাঘববোয়ালের ট্যাকের দিকে; ডাগর মেয়েদের প্রয়োজন কেবল ফঁদ পাতার খাতিরে শিকারকে ডেড়েমুষে নেওয়ার পর ডাকসাইটে সুন্দরীকেও হেলায় পরিত্যাগ করতে দ্বিধা করে না বিন্দুমাত্র। সে যখন আসরে অবতীর্ণ হয়, তখন আসে সবার সামনে দিয়ে– পাঁদাড় দিয়ে নয়। মহা ধুমধাড়াক্কা সহকারে শুরু হয় তার দাঁও মারার কারবার। সোমত্ত মেয়েরা পাগল হয়ে যায় তার রূপে, তার চাল-চলনে। ধূর্ত ধনীরা মোহিত হয় তার বনেদিয়ানায়, রাজার মতো খানদানি পট্টি মারায়। তারপর শুরু হয় ধোঁকাবাজ-শিরোমণির শেষ খেলা। অতি বড় সেয়ানাকেও পটকে দিয়ে পিট্টান দেয় রাজা কঙ্ক। উধাও হয়ে যায় রাতারাতি।
রাজা কঙ্ক! রাজা কঙ্ক! রাজা কঙ্ক! রাজা সে কোনোকালেই ছিল না। কিন্তু তার নেকনজর রাজারাজড়ার দিকেই। ভাড়াভাড়ির মস্ত আর্টে সে কুশলী আর্টিস্ট। ভড়ং দিয়ে ভাওতা মারার মহাবিদ্যায় সে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। সে জানে, বারফট্টাইয়ের প্রয়োজন ঠিক কখন এবং ভেড়া বানাবার মুহূর্ত আসে কোন সময়ে। রূপচাঁদ তার একমাত্র সাধনা, লোচ্চামো নয়। নারী তার সাধনা-সহচরী– অঙ্কে শোয়ানোর জন্য নয়।
রাজা কঙ্ক তাই একটা বিস্ময়। অন্তত আমার কাছে। রাজা কঙ্কর কাহিনি অলীক নয়, রাজা কঙ্কর কাহিনি কপোলকল্পিত নয়–এ কাহিনি সূর্যের মতো সত্য, ঈশানী ঝড়ের মতো নিষ্ঠুর। কিন্তু এমন আশ্চর্য উপাখ্যানকেও হরেকরমবা কাহিনি বানিয়ে ছেড়েছে আমার বন্ধু মৃগাঙ্ক।
রাজা কঙ্ককে একবারই আমি বাগে এনেছিলাম। কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি। উধাও হয়ে গিয়েছিল রাজা। কোনও হদিশ আর পাইনি। পেলাম যখন-তখন আর একজনের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। গল্পটা শুনলাম, তারই মুখে।
গোয়ার সাগর সৈকত। ঝিকঝিকে সাদা বালির ওপর যেন চাঁদের হাট বসেছে। রূপ আর যৌবনের সেই মেলায় অনভ্যস্ত চক্ষু বিস্ফারিত হয় বইকী।
কিন্তু রাজা কঙ্কর দৃষ্টি নেই কোন দিকে। গোঁয়ার কোলভা বিচ তার কাছে নতুন কিছু নয়। সাগর, জমি আর আকাশ যেখানে একাকার হয়ে গিয়েছে, যেখানকার নিসর্গশ্রী নেহাত অকবিকেও কবি হতে বাধ্য করে, আশ্চর্য সুন্দর সেই কোলভা সৈকতে রূপ আর রুপো নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আসে কেবল ধনীর দুলালরা। তারা আসে বোম্বাইয়ের রুপোলি পরদার জগৎ থেকে, আসে কোটিপতিদের কুবের মহল থেকে।
রাজা কঙ্ক এদের নাড়িনক্ষত্র জানে। বোম্বাইয়ে তার লীলাখেলা ঘটেছে একাধিকবার। তার মুখশ্রীর সঙ্গে পরিচয় অনেকেরই। রাজা কঙ্ক তবুও রাজা কঙ্ক। অকুতোভয়, নির্ভীক, দুর্মদ।
তাই কোলভা সৈকতে আবার দেখা গেল রাজা কঙ্ককে। রাজার মতোই তার আর্বিভাব। সাড়া পড়ে গেল প্রথম আবির্ভাবেই। প্রকাণ্ড রোলসরয়েস গাড়ি এসে দাঁড়াল সব চাইতে বিলাসবহুল হোটেলের সামনে। ঝলমলে রোলসরয়েসের সোফারটিও রীতিমতো ঝলমলে। যেমনি সাজের বাহার, তেমনি চেহারা। লোকটা জাপানি।
