পাইপটা হাতে নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু আত্মনিমগ্ন চোখে কাঞ্চনের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। ডক্টর বোস। কতই বা আর বয়স। বড় জোর চল্লিশ। সে তুলনায় অনেক ভারিক্কি, আবার যখন হাসেন, প্রাণখোলা হাসিতে ঘর ফাটিয়ে দেন। জবাব নেই সেই হাসির–দমকে দমকে অট্টহাস্য যেন আর থামতেই চায় না।
ডক্টর বোসকে তাই ভয় করে, শ্রদ্ধাও করে কাঞ্চন। ওঁর কথার মধ্যে, চাহনির মধ্যে, আচরণের মধ্যে নাটকীয়তা আছে, আছে জাদুশক্তি–অ্যানিম্যাল ম্যাগনেটিজম। যেকোনো মানুষকে নিজের মতে নিয়ে আসতে পারেন অল্পসময়ের মধ্যে–কখনো ধমকে, কখনো ধারালো যুক্তি দিয়ে, কখনো হেসে, কখনো আশ্চর্য বচনমালা দিয়ে।
টক থেরাপিস্ট! ইন্ডিয়ায় ইনিই একমাত্র টক থেরাপিস্ট। সনাতনী মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের তাই বিদ্বেষ এঁর ওপর। আড়ালে বলেন, ও তো বড়লোকদের দোহন করে চলেছে ম্যাজিক দেখিয়ে–যেমন মেসমার করত মেসমেরিজম দিয়ে, কিন্তু টিকেছিল কী?
ডক্টর বোসের ভেতরের যন্ত্রণা সেইখানেই। বিয়েও করলেন না। সুস্থ মস্তিষ্কদের সুস্থ করে তোলার সমাজসেবায় ব্রতী হয়েছেন ইন্ডিয়ায় ফিরেই। বাঁধাধরা চাকরির অফার পেয়েও যাননি– রুগিদের মধ্যে একটা টোটালিটি খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বা সময় তো সেখানে নেই। নারী মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাই তাকে অ্যাডভাইস দিয়েছেন, কি ছেলেমানুষি করছ? চেম্বারে কনসাল্টেশন ফি নিয়ে রোজ দশ-বারোটা রুগি দেখো। অর্ধেক ভালো হবে, অর্ধেক রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। মাসে দশ-বারো হাজার টাকা তোমার এসে যাবে।
কর্ণপাত করেননি ডক্টর বোস। এও যেন তাঁর এক পাগলামি। প্রতিভাধরদের ম্যাডনেস। কাঞ্চন তাই এত ভক্ত এই অদ্ভুত মানুষটির। অনেক মাসে পুরো মাইনে পায় না–নতুন জামা প্যান্ট কিনতে পারে না–তবুও শেখবার, জানবার উদগ্র বাসনা তাকে ধরে রেখে দিয়েছে ডক্টর বোসের কাছে। যে মাটিতে গাছ বাড়ে, সেই মাটিই তো গাছকে নিজের কাছে ধরে রাখে।
চেয়ে আছেন ডক্টর বোস। মনে মনে প্ল্যান করছেন নিশ্চয়। দু-চোখের কোণ কুঁচকে গেছে। এক-একটা পেশেন্টকে তো এক-একরকমভাবে হ্যান্ডল করতে হয়।
শুধোলেন হঠাৎ, মেয়েটা কোথায়?
সেলে।
কেন? ভায়োলেন্ট? এখনও?
ভীষণভাবে।
চলো তো দেখি।
খাটের সঙ্গে চার হাত-পা বাঁধা মেয়েটির চুল ছড়িয়ে পড়েছে মুখে বুকে চারপাশে। বিস্বস্ত বেশ। ভারী গড়ন। খুব ফর্সা, কটমট করে তাকাচ্ছে এদিকে সেদিকে আর বাঁধন খোলার চেষ্টা করছে প্রাণপণে।
পাইপ টানতে টানতে লম্বা পদক্ষেপে ঠিক তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ডক্টর বোস। কাঞ্চন রইল বাইরে। প্রথম অবজার্ভেশন ডাক্তারবাবু একাই করেন।
পলকহীন চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছেন ডক্টর বোস। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া উঠছে সরু ফিতের মতো।
বছর পঁচিশ বয়স হবে মেয়েটির। সুন্দরী নিঃসন্দেহে। অতিরিক্ত মেদ জমায় ভোতা হয়ে গেছে বরতনুর ধারালো অংশগুলো।
কটমট করে ডাক্তারের দিকে চেয়ে প্রথমে হিসহিসিয়ে গর্জন করে উঠেছিল সুন্দরী পেশেন্ট। পরক্ষণেই স্থির চোখে চেয়ে রইল। চোখের পাতা আর পড়ে না। দুই তারারন্ধ্রের গহনে জ্বলছে দুটি নিষ্কম্প প্রদীপশিখা।
চোখ কুঁচকে চেয়ে রইলেন ডক্টর বোসও। কী দেখছেন তিনি? অসম্ভব স্মৃতিশক্তির অধিকারী ডক্টর বোস কেন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছেন?
মেয়েটির কনীনিকা আরও ছোট হয়ে এসেছে। বেড়েছে দৃষ্টির সুচাগ্রতা। করোটির মধ্যে মগজের কোষে কোষে যেন প্রচণ্ড আলোড়ন চলছে, এনার্জির বিস্ফোরণ ঘটেছে। অনিমেষ তারারন্ধ্রে তারই কেন্দ্রীভূত প্রকাশন ঘটছে…
কিন্তু এ তো চেতনার স্ফুলিঙ্গ…স্বাভাবিকতার উন্মেষ!
পরক্ষণেই অতিশয় স্মার্ট ডক্টর বোসকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে চাপা বর্জনাদের মতো শুধু কটি কথা বলল মেয়েটি–গোলপার্ক… রাত…পালিয়েছিলে…ট্যাক্সিতে..আমি নোংরা? তাই না? বড় নোংরা? হাঃ হাঃ হাঃ! হাঃ হাঃ হাঃ!
বসবার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর বোস। মাথার পাতলা চুলে আঙুল চালাচ্ছেন। আঙুল কাঁপছে।
কাঞ্চন দাঁড়িয়ে ছিল পেছনে। বিমূঢ় অবস্থা। ডাক্তারবাবুকে এরকম বিচলিত কখনো সে দেখেনি।
কাঞ্চন, খোলা জানলা দিয়ে শুধু মাঠ আর দূরের দিগন্তের দিকে চেয়ে বললেন ডক্টর বোস।
স্যার।
মেয়েটিকে আমি একা ট্রিট করব। বুঝেছ?
হ্যাঁ, স্যার। আর কী বুঝেছ?
সবেগে ঘুরে দাঁড়ালেন ডক্টর বোস। থিরথির করে কাঁপছে মুখের পেশী। পেশেন্টের সামনে, তাদের গার্জেনদের সামনে ডক্টর বোসকে নাটক করতে আর আগেও দেখেছে কাঞ্চন। কিন্তু এখন তো ঠিক নাটক বলে মনে হচ্ছে না।
কাঞ্চন, বজ্রগর্ভ কণ্ঠস্বর ডক্টর বোসের–এর আগে তোমাদের ফটোগ্রাফিক মেমারির কথা বলেছিলাম মনে আছে?
প্রতিবিম্ব স্মৃতি?
হ্যাঁ। সোনার গয়নাভর্তি সুটকেস সমেত চলে গেছিল ট্যাক্সি পরে খেয়াল হতেই বাড়িময় কান্নাকাটি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির দিকে চেয়েছিল যে বাচ্চা মেয়েটি, সে এসে বলেছিল–মা, কাঁদছ কেন? ট্যাক্সির নাম্বার তো আমার মনে আছে। ট্যাক্সি পাওয়া গিয়েছিল। প্রতিবিম্ব স্মৃতি… প্রতিবিম্ব স্মৃতি! চোখে যা দেখে, ব্রেনে তার পারমানেন্ট ইমপ্রিন্ট পড়ে। কাঞ্চন, আজকের এই মেয়েটির আছে সেই বিশেষ ক্ষমতা।
কীভাবে বুঝলেন?
কী ভাবে বুঝলাম? হাঃ হাঃ হাঃ…হাঃ হাঃ হাঃ…হাঃ হাঃ হাঃ…সেটা না হয় তোমার কাছে সিক্রেটই থাক কাঞ্চন, ডক্টর অবনীশ বোসের অতীত আর নাই বা জানলে? হাঃ হাঃ হাঃ…হাঃ হাঃ হাঃ…হাঃ হাঃ হাঃ!
